আকাবিরে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য

মাওলানা ড. মুশতাক আহমদ

আমাদের বুর্জুগানে দ্বীনের মৌলিক তিনটি গুণ ছিল। এক. আহলে ইলম। দুই. মুজাহিদ। তিন. আহলে দিল। আহলে ইলম কতটুকু ছিলেন ? এ বিষয়ে আমার কাছে হাজারও দলিল রয়েছে। তবে আমি এ সম্পর্কে লম্বা আলোচনা করবো না। শুধু নগদ একটা রিপোর্ট শুনাব। আমাদের ওস্তাদ হযরত মাওলানা সাইয়িদ আরশাদ আল-মাদানীর দাওয়াতে কিছুদিন আগে মদীনা ইউনিভার্সিটির কয়েকজন প্রফেসর ও সৌদি রাজপ্রতিনিধি দেওবন্দে তাশরীফ আনেন। দারুল উলূম দেওবন্দ সম্পর্কে আগত মেহমানদের অনেক কিছু অজানা ছিল। আসার পর তাদের বিস্তৃতভাবে সব কিছু ঘুরে দেখানো হল। তাঁরা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন যে, এতো কিতাব ! এতো রিজাল ! এতো মাদারেস ! এতো খিদমাত ! যেটা কি না এই এক প্রতিষ্ঠান কায়েম করার মাধ্যমে হয়েছে। সর্বশেষ তাঁরা যে রিপোর্ট করেছেন সেটা ইন্টারনেটেও এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এটা তো এমন প্রতিষ্ঠান যা এমন খিদমাত আঞ্জাম দিয়েছে যা মদিনা ইউনিভার্সিটি তো দূরের কথা, স্বয়ং মিসরের জামিয়া আজহারও দিতে পারেনি। সারা মুসলিম জাহানের মধ্যে এতো বড় খিদমাত আমাদের বুজুর্গরা আঞ্জাম দিয়েছেন একটি হিন্দুপ্রধান দেশের মধ্যে থেকে।

দুই. তাঁরা ছিলেন মুজাহিদ। আমাদের আহলে দেওবন্দের জন্মই হল জিহাদের উপর। আমার মনে পড়ছে পাকিস্তানের হযরত মাওলানা হক নেওয়াজ রহ. এর বয়ানের একটা অংশ। তিনি বলছিলেন, বাতিল যখন নমরুদের আকারে আসল, হক তখন ইবরাহীম আ. এর আকারে আসল। বাতিল যখন ফেরাউনের আকারে আসল, হক তখন মুসা আ. এর আকারে আসল। এভাবে অগ্রসর হয়ে তিনি বলেন, বাতিল যখন কিসরা ও কায়সারের আকারে আসল, হক তখন মুহাম্মদ সা. এর আকারে আসল। বাতিল যখন যাকাত অস্বীকারকারীর আকারে আসল, হক তখন আবু বকর রা. এর আকারে আসল। এভাবে আরো অগ্রসর হয়ে বললেন, বাতিল যখন ইংরেজের আকারে আসল, হক তখন শাহ আব্দুল আজীজের আকারে আসল। বাতিল যখন বিভিন্ন ফিতনার আকারে আসল, হক তখন উলামায়ে দেওবন্দ আকারে আসল। এখানে উলামায়ে দেওবন্দের আরো একটি ঐতিহাসিক পরিচিতি পাচ্ছি। তা হল এদের জন্মটাই হলো সকল ফেতনা ফ্যাসাদকে নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে হক ও হক্কানিয়াতের পতাকা বুলন্দ করার লক্ষ্যে। যেন এ জন্যই তাদেরকে জন্ম দেয়া হয়েছে। এর পিছনে কিছু দলিল তো চাই। দলিল হল, রূহানিয়াতের লাইনের দলিল। মেহনত করেছেন শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. তিনি হিন্দুস্তানকে দারুল হরব ফতোয়া দিলেন। এখন যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একজন সাইয়িদ খান্দানের লোক প্রয়োজন। কারণ হাদীসে এসেছে “আল আইম্মাতু মিন কুরাইশিন।” অর্থাৎ যুদ্ধের নেতা কুরাইশী কেউ হবেন। তো সাইয়িদ খানদানের লোক কোথায় পাওয়া যায়। পেয়ে গেলেন সাইয়িদ আহমদ বেরলবী রহ. কে। তখন তিনি টুংকের নবাবের অধীনে একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে চাকুরী করতেন। তাঁকে খবর দেয়া হল। তিনি আসলেন। শাহ সাহেব তাঁকে বাইয়াত করলেন, খিলাফত দিলেন এবং নিজের আত্মীয় স্বজনকে বললেন, তোমরা সকলে সাইয়িদ সাহেবের হাতে বাইয়াত হয়ে যাও। এরপর সাইয়িদ সাহেবকে বললেন, এখন তুমি ঘর থেকে বের হয়ে যাও যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর ফায়সালা আসে। এর মধ্যে হয় তোমার মৃত্যু হবে অথবা হিন্দুস্তান স্বাধীন হয়ে যাবে। দুটোর একটি অবশ্যই হবে।

সাইয়িদ সাহেব রহ. ঘর থেকে বের হলেন। মেহনত করলেন। বালাকোটের যুদ্ধ হল। বালাকোটের শেষ যুদ্ধ যেদিন ঘটল সেদিনের কথা। ধরুন সকাল ১০ টায় যুদ্ধ শুরু হবে। সকাল ৮ টার দিকে সাইয়িদ সাহেব রহ. তাঁর সাথী-সঙ্গীদের তৈরি করছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি উঁচু গলায় বললেন, মিয়াজী নূর মুহাম্মদ ঝানঝানবী কোথায়? দাঁড়িয়ে যাও। তিনি দাঁড়ালেন। বললেন, সামনে আসো।

তিনি সামনে আসলেন। বললেন, তুমি এখনই হিন্দুস্তান চলে যাও। আদেশ শুনে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করলেন। বললেন, হযরত আমি শহীদ হওয়ার জন্য এসেছি। সাইয়িদ সাহেব বললেন, তুমি হিন্দুস্তান চলে যাও। তিনি বললেন, ঠিক আছে যা হুকুম তাই। তিনি সামানা-পত্র নিয়ে হিন্দুস্তানের দিকে রওয়ানা করলেন। তখন তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। আর বলছেন, আমি তো ফিরে যাওয়ার জন্য এই হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ইয়াগিস্থান এলাকায় আসিনি।

দুদিন পর পদযাত্রীদের থেকে খবর নিলেন। বললেন, আমাকে তো হযরত যুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন কিন্তু পরে যুদ্ধের ফলাফল কি হল ? তারা বলল, ‘সেদিন ১০ টার দিকে যুদ্ধ শুরু হলো। ১২ টার আগেই পুরো কাফেলা শহীদ হয়ে গেল।’ উত্তর শুনে তিনি খুব কাঁদতে থাকলেন। আর বলতে থাকলেন, আমাকে কেন মাহরূম করা হলো। রাতে স্বপ্নে দেখলেন, সাইয়িদ সাহেব রহ. এসেছেন। তিনি সাইয়িদ সাহেব রহ. এর পা জড়িয়ে ধরলেন আর বললেন, হযরত আপনি আমাকে কেন মাহরূম করলেন? সাইয়িদ সাহেব রহ. বললেন, আমি মাহরূম করিনি, আমি হুকুম পালন করেছি মাত্র। আমাকে বলা হয়েছে তোমাকে হিন্দুস্তান ফেরত পাঠাতে। কেন তোমাকে ফেরত পাঠানোর হুকুম দেওয়া হয়েছে, তাও আমি জানি না। এটি তাকবীনের ফায়সালা। হয়তো রহস্য ছিল যে, পুরো কাফেলা আজ এখানে খতম হয়ে যাবে কিন্তু এ আওয়াজকে ধরে রাখার জন্য আগুনের একটা স্ফুলিঙ্গ কোথাও আমানত রাখতে হবে। যাতে সেখান থেকে এটা আবার নতুন করে আরেক দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। আমার উপর এক জিম্মাদারী ছিল সেটা তোমার উপর অর্পণ করা হয়েছে। হযরত ঝানঝানবী রহ. বললেন, হযরত আমার দ্বারা সে কাজ কেমন করে সম্ভব? সাইয়িদ সাহেব বললেন, তুমি বহনকারী মাত্র। সময় মত দায়িত্বশীল আসবে। তোমার কাছ থেকে তা বুঝে নিবে। হযরত নূর মুহাম্মদ ঝানঝানবী রহ. বেচারা ছোট আলেম। মকতবের সামান্য ক্বারী সাহেব ছিলেন মাত্র। হিন্দুস্তানে ফিরে অপেক্ষার প্রহর গুণতে লাগলেন, কখন সেই সময় আসবে আর আমার থেকে জিম্বাদারী বুঝে নিবে।

অপরদিকে আমাদের বুজুর্গ সকল আঁকাবিরে দেওবন্দের যিনি মূল হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. তিনি প্রথম বাইয়াত হলেন নকশবন্দিয়া তরিকায় হযরত শায়খ নাসির উদ্দিন নকশবন্দী রহ. এর হাতে ইজাজত প্রাপ্তও হলেন। বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ দিলের ভিতর ভিন্ন এক জযবা সৃষ্টি হল। চিশতিয়া খান্দানের নূর হাসিল করার জযবা। এমন জযবা যে নিজকে নিবৃত করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন কার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন এ সম্পর্কে ইস্তেখারা করলেন। স্বপ্নে দেখলেন, চারজন মানুষ। প্রথমজন হলেন রাসূল সা., দ্বিতীয়জন হলেন হাজী সাহেবের দাদা, তৃতীয়জন হলেন সাইয়িদ আহমদ শহীদ বেরলবী রহ. এবং চতুর্থজন হলেন এমন একজন লোক যাকে তিনি চিনেন না। স্বপ্নের পূর্ণ ঘটনা হযরত গাঙ্গুহীর ইরশাদুল মূল্ক গ্রন্থের ভূমিকায় হযরত শায়খ যাকারিয়া রহ. বিস্তারিতভাবে রেফারেন্সসহ লিখেছেন। স্বপ্নে হযরত হাজী সাহেব রহ. দেখলেন যে, তাঁর দাদা সাইয়িদ সাহেবের কানে কানে বলছেন, নাতির শখ হয়েছে চিশতিয়া খান্দানের বারাকাত হাসিল করার। আল্লাহর হাবীব সা. এখানে হাজির। আপনি একটু পরামর্শ ও ফয়সালার ব্যবস্থা করে দিন। তখন সাইয়িদ সাহেব রহ. আল্লাহর হাবীবের সা. কানে কানে কি যেন বললেন। আল্লাহর হাবীব সা. হাজী সাহেব রহ. কে ডাকলেন। হাজী সাহেব রহ. আসলেন। আল্লাহর হাবীব হাজী সাহেবের হাত ঐ অপরিচিত ব্যক্তির হাতে তুলে দিয়ে বললেন, একেও তোমার সাথে নিয়ে নাও। এ কথা বলেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।

ইস্তেখারার পর হযরত হাজী সাহেব পাগলের মত হয়ে গেলেন। তাঁর হাত এমন ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়া হলো যাকে তিনি চিনেন না। আর তুলে দিয়েছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা. এখন যেখানেই যান ঐ লোককে তালাশ করেন। এভাবে তালাশ করতে করতে ছয় মাস অতিবাহিত হয়ে গেল তবুও তিনি কোন সন্ধান পেলেন না। আর এ ছয় মাসে তিনি কাষ্ঠ হয়ে গেলেন। দিন যত যায় তাঁর কষ্ট তত বাড়তে থাকে। এটাও আল্লাহ তায়ালার এক কারিশমা যে, আল্লাহকে পেতে হলে যেমন মেহনত করে পেতে হয় তেমনি আল্লাহর মাহবুব বান্দাদেরকে পেতে হলে মেহনত করে পেতে হয়। বিনা তালাশে তাঁদের পাওয়া যায় না। তারা নিজেদেরকে ফেরি করেন না। প্রচারপত্র বিলি করেন না। তবে সন্ধানীরা তাদের খুজে নিয়ে আসে। কারণ আল্লাহ যেভাবে নিজেকে আড়াল করে রাখেন, সেরূপ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকেও আড়াল করে রাখেন। যাই হোক ছয় মাস পর তাঁর এক উস্তাদের সাথে দেখা হল। নাম কালান্দার। তিনি উস্তাদের কাছে নিজের হাল ও অবস্থা ব্যক্ত করলেন। উস্তাদ বললেন, দেখ ইউপি এর লোহারিতে একজন বুজুর্গ আছেন। সেখানে গিয়ে দেখতে পার তাঁর চেহারার সাথে মিলে কিনা।

হাজী সাহেব উন্মুখ হয়ে আছেন কোন ঠিকানা পাওয়া যায় কি না। তিনি লোহারির দিকে ছুটলেন। যেতে যেতে আসরের নামাজ শেষ হয়ে গেল। মুসল্লীরা সব মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেন। শুধু ইমাম সাহেব বসে আছেন। হাজী সাহেব দূর থেকে তাঁকে দেখেই চোখ ছানাবড়া। আরে ! এই তো সেই বুজুর্গ যার হাতে আমাকে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। তিনি একটা দৌড় দিলেন। দৌড় দিয়ে তাঁর পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। আর এই বুজুর্গই হলেন হযরত নূর মুহাম্মদ ঝানঝানবী রহ. যার কথা আমি পূর্বে বলে এসেছিলাম। হযরত নূর মুহাম্মদ ঝানঝানবী রহ. খুব আদরের সাথে হাজী সাহেবের পিঠের উপর হাত রাখলেন। আর পিতৃত্বের মমত্ব নিয়ে বললেন, বেটা ! ছয় মাস পূর্বে নিজের দেখা স্বপ্নের উপর তোমার আজো এতোখানি আস্থা ! হাজী সাহেব রহ. বলেন, এটা ছিল হযরত ঝানঝানবীর প্রথম কারামত যা আমার সামনে ঘটেছিল। কেননা স্বপ্ন তো দেখেছি আমি, তাও ছয় মাস পূর্বে। কিন্তু এ স্বপ্নের খবর তিনি জানলেন কিভাবে! শুরু হলো চিশতিয়া খান্দানের সবক। উস্তাদ শাগিরদ ঘনিষ্ঠ হতে থাকলেন। যখন হাজী সাহেব বেশ ঘনিষ্ঠ হলেন তখন বলেই ফেললেন, হযরত ! স্বপ্ন তো দেখেছি আমি। কিন্তু আপনি এ খবর পেলেন কিভাবে ? তখন নূর মুহাম্মদ ঝানঝানবী একটা চিৎকার দিলেন। এরপর বললেন, তুমি আমাকে তালাশ করেছ মাত্র ছয় মাস। আর আমি তোমাকে তালাশ করেছি আজ বিশ বছর। কারণ আমাকে বলে দেয়া হয়েছে সময় মত লোক আসবে দায়িত্ব বুঝে নিবে। ছয় মাস আগে একটু ইংগিত পেলাম যে, আমার অপেক্ষার রজনী শেষ হবে। আমার কাক্সিক্ষত মানুষ আমার কাছে শীঘ্রই আসছেন। যাই হোক হাজী সাহেব রহ. তাঁর কাছে ছয় মাস থাকলেন। ততদিন চিশতিয়া তরীকার নূর হাসিল করে নিলেন। ছয় মাসের মাথায় হঠাৎ করে একদিন নূর মুহাম্মদ ঝানঝানবী রহ. ইন্তেকাল করলেন। হাজী সাহেবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তিনি এই দুঃখ সহ্য করতে পারলেন না। লোকালয় ছেড়ে বনে বনে ঘুরতে লাগলেন। এভাবে দিন অতিবাহিত হতে লাগল। দশম দিন তিনি মুরাকাবায় বসলেন। সেখানে হুজুর সা. এর যিয়ারত লাভ করলেন। তখন আল্লাহর রাসূল সা. তাঁকে ধমকের সুরে বললেন, ইমদাদ ! তোমার যদি এখানে সহ্য না হয় তাহলে আমার কাছে চলে আসো।

তখন হাজী সাহেবের পকেটে পথখরচ বলতে ছিল মাত্র আট আনা পয়সা। এটা নিয়েই তিনি মক্কা মদীনার দিকে রওয়ানা করলেন। যাই হোক সেখানে পৌছলেন। থাকছেন। খুব ভালো লাগছে। কিছুদিন পর মুওয়াজাহা শরীফে মুরাকাবায় বসলেন। এমন সময় রাসূল সা. এর সাথে দীদার হলো। আরজী পেশ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানে থাকতে চাই। রাসূল সা. বললেন, না, তুমি এখন হিন্দুস্তান চলে যাও। সেখানে অনেক কাজ বাকি আছে। তোমাকে পুনরায় আবার এখানে আসতে হবে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। তখন রাসূল সা. বললেন, তোমাকে তো তৈরি করা হচ্ছে সেখানে কিছু কাজ করার জন্য। তখন মনটা শান্ত হয়ে গেল যে, সেখানে আমি বিশেষ কোন দায়িত্ব পালন করার জন্য যাচ্ছি। পুনরায় আবার এখানে আসবো। তিনি হিন্দুস্তান চলে আসলেন। তখন হিন্দুস্তানে ইংরেজ শাসন। মুসলমানদেরকে রাজত্ব থেকে হটিয়ে ইংরেজ চালিয়ে যাচ্ছে শোষণ-অত্যাচার। পরিস্থিতি দেখে তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। কি করা যায় ? ডাকলেন তখনকার বড় বড় আলেম উলামাদেরকে। পরামর্শ হল হিন্দুস্তানের যে হাল চলছে এ মুহূর্তে আমাদের কী করণীয়? আমরা কি ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পারি? তারা বললেন, হযরত ! আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় যুদ্ধ সরঞ্জাম নেই। আর এ অবস্থায় যুদ্ধ করা আত্মহত্যার শামিল। কাজেই এ মুহূর্তে জিহাদ ফরজ নয়। হাজী সাহেব রহ. এর মন ভরল না। তিনি বললেন, দেওবন্দ থেকে কাসেম এবং রশিদ কে ডাকো। তাদেরকে ডাকা হলো । তখন আবার মাসআলা উঠলো এ মুহূর্তে আমাদের কী করণীয় ? দুই বুজুর্গ বললেন, আমাদের উপর জিহাদ করা ফরজ। তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। কথা উঠলো, আমাদের হাতে তো অস্ত্র নেই। তারা বললেন, আমাদের কি এতটুকু পরিমাণ অস্ত্র নেই যতটুকু পরিমাণ আল্লাহ তায়ালা আহলে বদরকে দিয়েছিলেন। হাজী সাহেব রহ. বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! মোটকথা, জিহাদের ফায়সালা হয়ে গেল। ১৮৫৭ সালে শামেলির যুদ্ধ হলো। হাজী সাহেব রহ. ছিলেন আমিরুল মুমিনীন, কাসেম নানুতবী রহ. ছিলেন সিপাহসালার , আর রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. ছিলেন কাজিউল কুজাত (প্রধান বিচারপতি) যুদ্ধে হিন্দুস্তান বিজিত হয়ে গিয়েছে তা নয়, তবে হকের আওয়াজ তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ কালের জন্য যেন আরেক বীজ বপন করা হয়েছে। ইংরেজদেরও টনক নড়ে উঠেছে।

এক পর্যায়ে হাজী সাহেব রহ. হিজরত করতে বাধ্য হলেন। হযরত নানুতবী রহ. তিনদিন আত্মগোপন করে থাকার সুন্নত আদায় করলেন। হযরত গাঙ্গুহী রহ. ছয় মাস জেলে ছিলেন। এগুলো অনেক লম্বা কাহিনী। প্রতিশোধ হিসাবে ইংরেজরা গাছের ডালে আলেম উলামাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলাল। তাও অনেক লম্বা কাহিনী। পরিস্থিতি এতো জটিল হয়ে গেল যে, শেষ রাতে উঠে দুআর মধ্যে আল্লাহর কাছে মনের আকুতি জানিয়ে শব্দগুলো বলার মত হিম্মত হত না- চতুর্দিকে এরূপ গোয়েন্দা লাগানো ছিল। বর্তমানেও এরূপ। আমাদেরও শব্দগুলো বলার হিম্মত হয় না। আগে বুঝিনি, এখন বুঝে আসছে যে, দুআ করতে গেলেও হিম্মতের প্রয়োজন হয়। পরিস্থিতি যখন আরো জটিল হয়ে গেল তখন এ আওয়াজকে কিভাবে জিন্দা রাখা হবে এ নিয়ে সকলে পেরেশান হয়ে গেলেন। আল্লাহ তায়ালা কাসেম নানুতবী রহ. ও রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. কে ইলহাম দান করলেন যে, এ জিহাদ আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য। এ জযবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য ১৮৬৬ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করা হলো।

দারুল উলূম দেওবন্দকে যে বানানো হবে তার আসবাব কি ছিল? আসবাব কিছুই ছিল না। তাহলে হবে কিভাবে? যেন আল্লাহ পাক সাফ জানিয়ে দিলেন, নুসরত বলতে কিছুই পাবে না তোমরা। একটা গাছ আছে সেখানে বসতে পার। ছাত্র বেশি দেওয়া যাবে না। শিক্ষকও বেশি দেওয়া যাবে না। একজন দেওয়া যাবে। এভাবে ছোট একটা ডালিম গাছের নিচে এক শিক্ষক এক ছাত্র দিয়ে দারুল উলূম দেওবন্দের পদযাত্রা শুরু হলো। এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক প্রমাণ করেছেন যে, যেটাকে আল্লাহ পাক বানান, সেটা গাছতলা থেকে সারা দুনিয়াকে আলোকিত করতে পারে। আর যেটাকে আল্লাহ পাক বানান না, সেটা একটা মহা কিছু হওয়ার পরও তার ফল হয় শূন্য। অনেক ভাই বলেন যে, আমাদের বুজুর্গরা যুদ্ধ-জিহাদ থেকে বিমুখ ছিলেন। তাদের খেদমতে এ আলোচনাটি হাদিয়া স্বরূপ জবাব। আমাদের জন্মই হলো জিহাদের উপর। দেওবন্দ মাদরাসাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে হক ও হক্কানিয়াতের আওয়াজকে টিকিয়ে রাখার জন্য। আর কতকাল সামনে আল্লাহ পাকের এ প্লান-প্রোগাম তা জানি না। কিন্তু বর্তমানে আপনারা সকলে মিলে এসব মাদরাসাগুলোকে সরকারী করার যে পাঁয়তারা করছেন এতে করে মনে হচ্ছে, যে সময়ের জন্য আল্লাহ তায়ালা প্লান-প্রোগ্রাম করেছেন তা হয়তো শেষ হয়ে আসছে। খোদার কসম করে বলছি, সব মাদরাসা যদি সরকারী মঞ্জুরি পেয়ে যায় তাহলে এসব মাদরাসা আর কওমী মাদরাসা থাকবে না। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। আমি কারো সাথে ঝগড়া করতে চাচ্ছি না। হযরত নানুতবী রহ. উসূলে হাসতেগানার মধ্যে বলেছেন, এ মাদরাসা কোন সরকার কিংবা কোন একক ব্যক্তির সহযোগিতায় পরিচালিত হবে না। এটা সাধারণ মুসলমানদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাঁদার উপর পরিচালিত হবে। এরূপ ক্ষুদ্র চাঁদা যা আদায় করে চাঁদাদাতা নিজেকে গর্বিত মনে করবে। তাহলে অন্যদের কোন প্রভাব মাদরাসার উপর পড়বে না। মাদরাসাওয়ালা আযাদীর সাথে দ্বীনের খিদমত করে যেতে পারবে।

যাই হোক, এরপর থেকে যত যুদ্ধ, যত আন্দোলন, যত খিদমত হল সব এই একটি স্থান থেকেই শুরু হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এ দারুল উলূম দেওবন্দকে এভাবেই কবুল করেছেন। আমাদের আহলে দেওবন্দের জন্মই হলো জিহাদের উপর। সকল ফেতনা ফ্যাসাদকে প্রতিহত করে হক ও হক্কানিয়াতের পতাকাকে বুলন্দ করাই হলো আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। আমাদের কাজ করতে হবে, শক্তি অর্জন করতে হবে। এগুলো কিভাবে সম্ভব? আল্লামা ইকবাল বলেন, “মুসাল্লা হ্যায় হামারে তাখতে শাহী, খোদা কী ইয়াদ হ্যায় তাক্বাত হামারী।” অর্থ: জায়নামাজ হলো আমাদের সিংহাসন, আল্লাহর যিকির হলো আমাদের অস্ত্র¿ যত শক্তি, অস্ত্র ও সামর্থ্য লাগবে সব আল্লাহ পাকের সাথে সম্পর্ক বানিয়ে নিতে হবে। কারণ হকপন্থীরা এভাবেই দ্বীনের কাজ করেছেন। যেহেতু এখন একটি পরিস্থিতি চলছে তাই মাঝখানের একটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম। মোটকথা, আমাদের বুজুর্গানে দ্বীনের মৌলিক, প্রধান, অন্যতম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিল ১. তাঁরা আহলে ইলম ছিলেন, ২. মুজাহিদ ছিলেন, ৩. আহলে দিল ছিলেন। এই তিন বৈশিষ্ট্যের উপর আমরা নিজেদেরকে যদি প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে আমরা তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরি। অন্যথায় তাঁদের উত্তরসূরি হিসাবে পরিচয় দেওয়া আমাদের ঠিক হবে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বুঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: শাইখুল হাদীস, জামিয়া ইসলামিয়া তেজগাঁও ঢাকা