আল-আকসা!

(১) পুরো চৌহদ্দিকেই ‘আলমাসজিদুল আকসা’ বলা হয়। চৌহদ্দির মধ্যে সালাত আদায় করলেই ফযীলত অর্জন হয়ে যাবে।
(২) সোনালি গম্বুজের দিকটা হল উত্তর। কালোমত গম্বুজের দিকটা হল দক্ষিণল। সোনালি গম্বুজকে কুব্বাতুস সাখরা বলে। এখানেই একটা পাথরখণ্ড আছে। সেদিকে ফিরেই ইহুদিরা সালাত আদায় করত। মুসলমানরাও মদীনায় এসে প্রথম ১৬মাস সাখরার দিকে ফিরে সালাত আদায় করেছে।
(৩) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও জুমার সালাত হয় মূলত দক্ষিণে দিকস্থ মসজিদে কিবালিতে।

(১) আলমাসজিদুল আকসা মানে, চার দেয়ালের ভেতরের অংশ ও চৌহদ্দির বাইরে দক্ষিণ দিকের কিছু অংশ। পুরোটা মিলেই ‘হারাম’ বা পবিত্র এলাকা। এই চৌহদ্দীর যে কোনও স্থানে সালাত আদায় করলেই ‘আলআকাসায়’ সালাতের ফযীলত মিলবে। এর আয়তন ১৪৪০০০ বর্গমিটার।

(২) আলমাসজিদুল আকসা মানে শুধু ‘আলজামেউল কিবালি’ বা শুধু ‘কুব্বাতুস সাখরা’ নয়। পুরো কমপ্লেক্সটাকেই আলমাসজিদুল আকসা বলা হয়।

(৩) চার দেয়ালের অভ্যন্তরে, পুরো কমপ্লেক্সে অনেক স্থাপনা আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হল দু’টি।

(ক). আলজামেউল কিবালি। দক্ষিণ দিকের পুরনো মসজিদটা। এটাই মূল মসজিদে আকসা। উমার রা. এটাকে নির্মাণ করেছিলেন। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে। পৃথিবীর প্রথম মসজিদ মক্কার বায়তুল্লাহ। তার চল্লিশ বছর পর নির্মিত হয়েছে বায়তুল মুকাদ্দাস।
(খ). কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অব দি রক। সোনালি গম্বুজওয়ালা মসজিদটা। কমপ্লেক্সের উত্তর দিকের প্রায় মাঝামাঝিতে অবস্থিত। গম্বুজটা খেলাফতে রাশেদার যুগে ছিল না। মুয়াবিয়া রা. ইয়াযিদ, মারওয়ানের যুগেও ছিল না। এটা নির্মিত হয়েছে পঞ্চম উমাইয়া খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ান (৬৮৫-৭০৫)-এর শাসনামলে। ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে।

(৪). সাখরা (الصخرة) অর্থ পাথরখণ্ড বা ‘রক’। কুব্বাতুন (قبة) অর্থ গম্বুজ বা ‘ডোম’। পুরো কমপ্লেক্সের মধ্যে, এই পাথরখণ্ডটা ছিল উঁচু ভূমিতে। এই পাথরখণ্ডটাই ছিল পূর্বেকার নবীগনের কিবলার কেন্দ্রবিন্দুতে। অর্থাৎ এই পাথরখণ্ডকে কিবলার মূলবিন্দু ধরে সবাই সালাত আদায় করত। মদীনায় আসার পর, মুসলমানরা এই ‘সাখরার’ দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছিল প্রায় ষোল মাস।
ইহুদিরাও এই পাথরখণ্ডকে মূল কেন্দ্রবিন্দু ধরে তাদের উপাসনা করত। কিছু খ্রিস্টান উপদলও এটাকে কিবলা মানত। উমার রা. বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করার পর দেখলেন, পাথরখণ্ডটা ময়লা-অবর্জনার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। খ্রিস্টানরা পরিকল্পিতভাবেই ‘সাখরার’ উপর তাদের সমস্ত ময়লা-নোংরা ফেলত। তারা এটা করত ইহুদেরকে অপমান করার জন্যে। উমার রা. দেখামাত্র ময়লা সরানোর নির্দেশ দেন। নিজেও ময়লা সরানোর কাজে লেগে পড়েন।

(৫). সাখরার আশপাশ পরিষ্কার করার পর, উমার রা. একটা মসজিদ নির্মাণ করার প্রস্তুতি নিলেন। মসজিদটা কোথায় কিভাবে নির্মাণ করবেন, সে ব্যপারে পরামর্শ করলেন। একপর্যায়ে কথা বললেন, কা‘বে আহবারের সাথে। তিনি একজরন তাবেয়ী। ইহুদি থেকে মুসলমান হয়েছেন। মুসলমান হওয়ার আগে তিনি একজন ইহুদি প-তি ছিলেন। এজন্য তাকে ‘আহবার’ বলা হয়। উমার রা.-এর প্রশ্নের উত্তরে কা‘ব বললেন,
মসজিদটা সাখরার পেছনে মানে পূর্বপাশে নির্মাণ করতে পারেন।
উমার রা. তার কথা শুনে বললেন,
يا ابن اليهودية! خالطتك اليهودية ، بل أبنيه أمامها فإنّ لنا صدورَ المساجد ،
“হে ইহুদি মায়ের বেটা, তোমার মধ্যে এখনো ইহুদিবাদ মিশে আছে। আমি বরং মসজিদটা সাখরার সামনে নির্মাণ করব।”

(৬). কা‘বের কথামত সাখরার পেছনে মানে পূর্বপাশে মসজিদটা নির্মাণ করলে, সাখরা থাকবে সমজিদের সামনে। মানে মুসলমানরা যদিও ‘কা‘বার’ দিকেই মুখ করে দাঁড়াবে, কিন্তু পাশাপাশি আগের কিবলা ও ইহুদিদের কিবলা ‘সাখরা’ও মুসলমানদের সামনে পড়ে যাবে। এটা একপ্রকার ইহুদিদের কিবলার অনুসরণ হয়ে যাবে। দূরদর্শী উমার রা. চট করেই ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলেন। তিনি মন্তব্য করলেন, তোমার মধ্যে এখনো আগের ইহুদিবাদের গন্ধ রয়ে গেছে। পুরনো কিবলার প্রতি দুর্বলতা রয়ে গেছে।

(৭). সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীনগনের কেউ সাখরার কাছে সালাত আদায় করেননি। এখানে কোনও স্থাপনাও ছিল না। সাখরা একসময় মুসলমানদের কিবলা ছিল। পরে মানুসুখ বা রহিত হয়ে গেছে। এখন মুসলমানদের কাছে সাখরার বাড়তি কোনও মূল্য নেই। সালাফের কেউ আলআকসায় গেলে, মসজিদে কিবালি মানে উমার রা. কর্তৃক নির্মিত মসজিদে। সালাফের কাছে সাখরা কোনও গুরুত্ব পেত না।
(মাজমুয়া রাসায়েলে ইবনে তাইমিয়া রাহ.)

(৮). ইহুদিদের কাছেও এই কমপ্লেক্সটা গুরুত্বপূর্ণ। দু’টি কারণে,
ক. কারণ তাদের প্রাচীন কিবলা এই কমপ্লেক্সের ভেতরে। ডোম অব দি রক বা কুব্বাতুস সাখরার নিচে। পাশাপাশি মুসলমানরাও মনে করে, এই সাখরা থেকেই নবীজি সা. মেরাজের রাতে উর্দ্ধাকাশে আরোহণ করেছিলেন। যদিও এটা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। কিন্তু এটাই মুসলিম ঐতিহাসিকদের কাছে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
খ. সাখরার নিচে একটা গুহা আছে। সেখানে সালাত আদায় করার মতো একটা মেহরাব আছে। সেটাকে বলা হয় (مُصلى الأنبياء) নবীগনের সালাতের স্থান।
গ. হায়েতুল বুরাক। এখানে নবীজি সা. মেরাজের রাতে তার বোরাক বেঁধেছিলেন। ইহুদিরা এই দেয়ালকে বলে, ওয়েলিং ওয়াল বা ওয়েস্টার্ণ ওয়াল। এটার অবস্থান, কুব্বাতুস সাখরা ও মসজিদে কিবালির মাঝামাঝিতে। পশ্চিম দিকস্থ সীমানা প্রাচীর। ইহুদিরা মনে করে, এই প্রাচীর সুলাইমান আ. যে মসজিদ বা হায়কাল নির্মাণ করেছিলেন, তার অবশিষ্টাংশ।

(৯) পুরো কমপ্লেক্সের দিকটাও ঠিক করে নেয়া জরুরী। কমপ্লেক্সটাকে লম্বালম্বিভাবে আমরা উত্তরী-দক্ষিণী ধরে নিতে পারি। এই হিশেবে, কুব্বাতুস সাখরা আছে কমপ্লেক্সের উত্তর দিকের মাঝামাঝিতে। জামে কিবালি বা পুরনো গম্বুজের মসজিদটি আছে কমপ্লেক্সের দক্ষিণ দিক ঘেঁষে।

দৃষ্টি আকর্ষণ:
১: তথ্যগত কোনও বিভ্রাট থাকলে ধরিয়ে দেয়ার বিনীত অনুরোধ থাকল।
২: আরও কোনও তথ্য যোগ করার প্রয়োজন বোধ করলে, জানানোর অনুরোধ থাকল। একটা পোস্টে যেন সবার খটকাগুলো দূর করার মতো উপকরণ জমা হয়ে থাকে।
৩: ছবিগুলো সম্পর্কে আলাদা করে বিবরণ আস্তে আস্তে যোগ করে দেব ইনশাআল্লাহ।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.