ইমাম বুখারী (রহঃ) এর কাঠগড়ায় কথিত আহলে হাদীস সম্প্রদায়

বিতির, তাহাজ্জুদ, নফল ইত্যাদি প্রতিটি নামাযই আলাদা

ইমাম বুখারী রহঃ এর নিকট বিতির নামায, তাহাজ্জুদ নামায এবং নফল নামায স্বতন্ত্র বিষয়।

বুখারী রহঃ বুখারী শরীফের ১ম খন্ডের ১৩৫ নং পৃষ্ঠায় একটি বাব কায়েম করেছেন। যার শিরোনাম হল, ابواب الوتر তথা বিতরের অধ্যায়সমূহ।

উক্ত বাবের উপর বুখারী শরীফের বিখ্যাতা ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ লিখেনঃ

ولم يتعرض البخارى لحكمه لكن افراده بترجمة عن ابواب التهجد والتطوع يقتضى انه غير ملحق بها عنده

ইমাম বুখারী রহঃ বিতিরের হুকুম বর্ণনা করেননি [যে এটি সুন্নত না ওয়াজিব না ফরজ?]। কিন্তু তিনি যে, তাহাজ্জুদ এবং নফল না বলে আলাদাভাবে যে বিতিরের শিরোনাম কায়েম করলেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তার নিকট বিতির নামায তাহাজ্জদ ও নফল নামাযের অন্তুর্ভূক্ত নয়। [বরং এটি একটি আলাদা নামায] {ফাতহুল বারী-২/৪৭৮}

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ এর উক্ত বক্তব্য দ্বারা একথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত যে, ইমাম বুখারী রহঃ এর নিকট তাহাজ্জুদ ও নফল নামায থেকে সম্পূর্ণ ্আলাদা এক প্রকার নামায হল বিতির নামায।

কিন্তু ইমাম বুখারী রহঃ এর উক্ত মতামতের উল্টো গায়রে মুকাল্লিদদের বক্তব্য হল যে, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ এবং বিতির নামায এক প্রকার নামাযই। {তাইসীরুল বারী-২/৭৭}

বিতির নামাযে দুআয়ে কুনুত পড়া প্রসঙ্গে

ইমাম বুখারী রহঃ এর মত হল, বিতির নামাযে দুআয়ে কুনুত রুকুতে যাওয়ার আগে পড়া উচিত।

সহীহ বুখারীর ১ম খন্ডের ১৩৬ নং পৃষ্ঠায় এমন একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেনঃ

عَاصِمٌ، قَالَ: سَأَلْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ عَنِ القُنُوتِ، فَقَالَ: قَدْ كَانَ القُنُوتُ قُلْتُ: قَبْلَ الرُّكُوعِ أَوْ بَعْدَهُ؟ قَالَ: قَبْلَهُ، قَالَ: فَإِنَّ فُلاَنًا أَخْبَرَنِي عَنْكَ أَنَّكَ قُلْتَ بَعْدَ الرُّكُوعِ، فَقَالَ: «كَذَبَ إِنَّمَاقَنَتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ الرُّكُوعِ شَهْرًا، أُرَاهُ كَانَ بَعَثَ قَوْمًا يُقَالُ لَهُمْ القُرَّاءُ، زُهَاءَ سَبْعِينَ رَجُلًا، إِلَى قَوْمٍ مِنَ المُشْرِكِينَ دُونَ أُولَئِكَ، وَكَانَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَهْدٌ، فَقَنَتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَهْرًا يَدْعُو عَلَيْهِمْ»

হযরত আসেম বলেন, আমি হযরত আনাস বিন মালিক রাঃ এর কাছে বিতির নামাযের কুনুতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেনঃ অবশ্যই পড়া হতো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রুকু আগে না পরে? তিনি বললেন, রুকুর আগে। আসিম রহঃ বললেন, অমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার বরাত দিয়ে বলেছেন যে, আপনি বলেছেন, রুকুর পরে। তখন আনাস রাঃ বলেন, সে ভুল বলেছে। রাসূল সাঃ রুকুর পর এক মাস ব্যাপী কুনূত পাঠ করেছেন। আমার জানা মতে, তিনি সত্তর জন সাহাবীর একটি দল, যাদের কুররা তথা অভিজ্ঞ কারী বলা হতো তাদেরকে মুশরিকদের কোন এক কওমের উদ্দেশ্যে পাঠান। এরা সেই কওম নয়, যাদের বিরুদ্ধে রাসূল সাঃ বদ দুআ করেছিলেন। বরং তিনি এক মাস ব্যাপি কুনুতে সে সব কাফিরদের জন্য বদ দুআ করেছিলেন, যাদের সাথে তাঁর চুক্তি ছিল। [এবং তারা চুক্তি ভঙ্গ করে কারীগণকে হত্যা করেছিল।] {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১০০২}

একই হাদীস ইমাম বুখারী রহঃ সংক্ষিপ্তকারে বুখারী শরীফের ২য় খন্ডের ৫৮৬ নং পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত করেছেন। যার শব্দ হল এমন-

قَالَ عَبْدُ العَزِيزِ وَسَأَلَ رَجُلٌ أَنَسًا عَنِ القُنُوتِ أَبَعْدَ الرُّكُوعِ أَوْ عِنْدَ فَرَاغٍ مِنَ القِرَاءَةِ؟ قَالَ: «لاَ بَلْ عِنْدَ فَرَاغٍ مِنَ القِرَاءَةِ»

হযরত আব্দুল আজীজ রহঃ বলেন, এক ব্যক্তি আনাস বিন মালিক রাঃ কে কুনুতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করল, তা কি রুকুর পর না কিরাত থেকে ফারিগ হওয়ার পর পড়া হবে? তখন তিনি জবাবে বলেন, কিরাত শেষ করার পর পড়া হবে। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪০৮৮}

বুখারী শরীফের উক্ত দুটি হাদীস প্রমাণ করছে যে, বিতির নামাযে দুআয়ে কুনুত রুকু আগেই আদায় করা হবে। কিন্তু বুখারীর উক্ত বর্ণনার বিপরীত গায়রে মুকাল্লিদদের নিকট বিতর নামাযে রুকুর পর দুআয়ে কুনুত পড়া মুস্তাহাব। {ফাতাওয়া উলামায়ে হাদীস-৩/২০৫, তুহফাতুল আহওয়াজী-১/২৪৩, ফাতাওয়া আহলে হাদীস-১/৬৩২}

গায়রে মুকাল্লিদদের মিথ্যাচার

ফাতাওয়া উলামায়ে হাদীসে লিখা হয়েছে যে, বুখারী শরীফে নাকি রুকুর পর দুআয়ে কুনুত পড়ার কথা এসেছে। একথা স্পষ্ট মিথ্যা কথা। যদি থেকে থাকে, তাহলে আরবী ইবারতসহ প্রমাণ পেশ করুন।

সাদেক শিয়ালকুটির ধোঁকা এবং খেয়ানত প্রসঙ্গে

হাকীম সাদেক শিয়ালকুটি সাহেব রুকুর পর দ্আুয়ে কুনুত প্রমাণ করার জন্য নিকৃষ্টতর ধোঁকা ও খেয়ানতপূর্ণ আচরণ করেছেন। যেমন-

স্বীয় কিতার সালাতুর রাসূলের ৩৫৭-৩৬০ পৃষ্ঠার টিকায় নাসায়ী ও আবু দাউদের বরাতে দু’টি হাদীস উল্লেখ করেছেন। যার দ্বারা সাধারণ পাঠকগণ এটা মনে করবে যে, উক্ত হাদীসদ্বয়ে যেহেতু রুকুর পর কুনুতের কথা উল্লেখ আছে, সুতরাং বিতির নামাযে দুআয়ে কুনুত রুকুর পরই আদায় করা উচিত।

অথচ হাদীস সম্পর্কে অভিজ্ঞ যে কেউ উক্ত হাদীস দেখলেই বুঝতে পারবেন যে, উক্ত হাদীস দু’টির সম্পর্ক বিতিরের দুআয়ে কুনুতের সাথে নয়। বরং তা কুনুতে নাজিলার সাথে সম্পর্কিত। যা ফজরের নামাযের দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর পর দাঁড়িয়ে জোরে জোরে পড়া হয়ে থাকে। অথচ এটাকে উল্লেখ করা হলো বিতির নামাযের দ্আুয়ে কুনুতের দলীল হিসেবে।

এরকম ধোঁকাবাজীর নাম হাদীসের অনুসরন না শয়তানের অনুসরন?

উক্ত কিতাবে সাদেক শিয়ালকুটি সাহেব মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ শরহে নববী এর একটি বাবের উল্লেখ করে এর দ্বারা একথা প্রমাণ করতে চাইলেন যে, বিতির নামাযে দুআয়ে কুনুত রুকুর পরই পড়া উচিত।

ইমাম নববী রহঃ বিতির নামাযে দুআয়ে কুনুত রুকুর পর পড়ার বিষয়ে লিখেছেনঃ

ومحل القنوت بعد رفع الرأس فى الركوع فى الركعة الآخرة

আর কুনূত পড়ার স্থান হল, শেষ রাকাতে রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর। {সহীহ মুসলিম, সালাতুর রাসূল-৩৬০}

এ উদ্ধৃতিতে হাকীম শিয়ালকুটি সাহেব যে খেয়ানত করেছেন, তাহলো, এ ইবারতের শুরুতে উল্লেখিত সমস্ত অংশকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। যাতে উল্লেখিত রয়েছে যে, উক্ত কুনুতের সম্পর্ক কুনুতে নাজেলার সাথে। বিতির নামাযের দুআয়ে কুনুতের সাথে নয়।

পাঠকদের জন্য শরহে মুসলিমের পূর্ণ ইবারতটি উল্লেখ করে দিচ্ছি, যাতে করে পাঠকগণ নিজেরাই শিয়ালকুটি সাহেবের খিয়ানত বুঝতে পারেন।

باب استحباب القنوت فى جميع الصلوات اذا نزلت بالمسلمين نازلة والعياذ بالله واستحباب فى الصبح دائما وبيان ان محله بعد رفع الرأس من الركوع فى الركعة الآخرة واستحباب الجهر به (مسلم-1-237)

গায়রে মুকাল্লিদ নওয়াব ওয়াহীদুজ্জামান সাহেব উক্ত ইবারতের অনুবাদ এভাবে করেছেন যে, “বাব, যখন মুসলমানদের উপর কোন বিপদ আপতিত হয়, তখন নামাযের মাঝে উঁচু আওয়াজে কুনূত পড়া, এবং আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাওয়া মুস্তাহাব। আর এটা পড়ার স্থান হল, শেষ রাকাতের রুকুর পর মাথা উঠানোর পর। আর সকালের নামাযে সর্বদা কুনূত পড়া মুস্তাহাব। {সহীহ মুসলিমের উর্দু অনুবাদ-২/২০১}

ইমাম নববী রহঃ উক্ত ইবারত দ্বারা একথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, এ কুনুতের সম্পর্ক কুনুতে নাজেলার সাথে। বিতির নামাযের কুনুতের সাথে এর কোন ন্যুনতম সম্পর্ক নেই। কিন্তু সাদেক শিয়ালকুটি সাহেব পূর্ণ ইবারত এ কারণে উদ্ধৃত করেননি, যাতে তার ধোঁকাবাজির মুখোশ উন্মোচিত না হয়ে পরে।

আল্লাহ তাআলা কথিত আহলে হাদীসদের এরকম জঘন্য মিথ্যাচার থেকে জাতিকে হিফাযত করুন।

সফরের দূরত্ব ৪৮ মাইল

ইমাম বুখারী রহঃ এর নিকট সফরের দূরত্ব হল ৪৮ মাইল।

ইমাম বুখারী রহঃ বুখারী শরীফের ১ম খন্ডের ১৪৭ নং পৃষ্ঠায় একটি বাব কায়েম করেছেন। যার শিরোনাম হল, بَابٌ: فِي كَمْ يَقْصُرُ الصَّلاَةَ তথা কতটুকু দূরত্বে কসর করা উচিত? এর অধ্যায়।

এ বাবের অধীনে ইমাম বুখারী রহঃ উল্লেখ করেনঃ

وَسَمَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَوْمًا وَلَيْلَةً سَفَرًا» وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ، وَابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ، يَقْصُرَانِ، وَيُفْطِرَانِ فِي أَرْبَعَةِ بُرُدٍ وَهِيَ سِتَّةَ عَشَرَ فَرْسَخًا

আর রাসূল সাঃ এক দিন আর এক রাতের দূরত্বকেও সফর বলেছেন। হযরত ইবনে ওমর রাঃ এবং হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ চার বারীদ সফরের সময় কসর পড়ার কথা বলেছেন। আর সেটি হল, ১৬ ফরসখ তথা ৪৮ মাইল হয়। {গায়রে মুকাল্লিদ ওহীদুজ্জামান সাহেবের অনুবাদ}

ইমাম বুখারী রহঃ এর কায়েম করা উক্ত বাব দ্বারা একথা সুস্পষ্টরূপে প্রমানিত হচ্ছে যে, সফরের দূরত্ব হল ৪৮ মাইল। কেননা, চার বুরদ দ্বারা ১৬ ফরসখ হয়, আর এক ফরসখ তিন মাইল হয়ে থাকে। সেই হিসেবে ষোলকে তিন দিয়ে গুণ দিলে হচ্ছে ৪৮। সুতরাং ইমাম বুখারী রহঃ এর নিকট সফরের দূরত্ব দাঁড়াচ্ছে ৪৮ মাইল।

কিন্তু ইমাম বুখারী রহঃ এর কায়েম করা উক্ত বাবের উল্টো কতিপয় গায়রে মুকাল্লিদ বলে থাকে যে, সফরের জন্য কোন নির্ধারিত কোন সীমাই নেই। আর কতিপয় গায়রে মুকাল্লিদ বলে থাকে যে, ৯ মাইল হল সফরের দূরত্ব। আর কেউ কেউ বলে থাকে ৩ মাইল। {তাইসীরুল বারী-২/১৩৬, ফাতাওয়া নজিরীয়া-১/৬৩০, ফাতাওয়া উলামায়ে হাদীস-৩/৮}

মাগরিব নামাযের পূর্বে নফল পড়া প্রসঙ্গে

ইমাম বুখারী রহঃ এর মতে মাগরিব নামাযের পূর্বে নফল নামায পড়া সুন্নত নয়।

ইমাম বুখারী রহঃ বুখারী শরীফের ১ম খন্ডের ১৫৭ নং পৃষ্ঠায় একটি বাব কায়েম করেছেন। যার শিরোনাম হল, بَابُ الصَّلاَةِ قَبْلَ المَغْرِبِ তথা মাগরিবের আগের নফল নামাযের অধ্যায়।

উক্ত বাবের অধীনে ইমাম বুখারী রহঃ দু’টি হাদীস উল্লেখ করেছেন। যথা-

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ، قَالَ: حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ المُزَنِيُّ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «صَلُّوا قَبْلَ صَلاَةِ المَغْرِبِ»، قَالَ: «فِي الثَّالِثَةِ لِمَنْ شَاءَ كَرَاهِيَةَ أَنْ يَتَّخِذَهَا النَّاسُ سُنَّةً»

হযরত আব্দুল্লাহ বিন বারিদা বলেন, আমাকে আব্দুল্লাহ বিন মুগাফফাল রাঃ রাসূল সাঃ থেকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন যে, মাগরিবের পূর্বে নামায পড়, তৃতীয়বার রাসূল সাঃ বললেন যে ব্যক্তি চায় [ সে যেন পড়ে]। এ বিষয়কে অপছন্দ করে যে, লোকেরা এটাকে [মাগরিবের আগের নামাযকে] সুন্নত মনে করে বসবে। [অথচ এটি সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত নয়]{সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১১৮৩}

مَرْثَدَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ اليَزَنِيَّ، قَالَ: أَتَيْتُ عُقْبَةَ بْنَ عَامِرٍ الجُهَنِيَّ، فَقُلْتُ: أَلاَ أُعْجِبُكَ مِنْ أَبِي تَمِيمٍ يَرْكَعُ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ صَلاَةِ المَغْرِبِ؟ فَقَالَ عُقْبَةُ: «إِنَّا كُنَّا نَفْعَلُهُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»، قُلْتُ: فَمَا يَمْنَعُكَ الآنَ؟ قَالَ: «الشُّغْلُ»

হযরত মারসাদ বিন আব্দুল্লাহ ইয়াজানী রাঃ বর্ণনা করেন। আমি উকবা বিন আমের রাঃ এর কাছে আসলাম। আমি তাকে বললামঃ আমি কি আপনাকে আবূ তামীমের আশ্চর্যজনক কর্মকান্ড সম্পর্কে বলবো? তারা মাগরিবের নামাযে আগে দুই রাকাত নামায পড়ে থাকে। হযরত উকবা বিন আমের রাঃ বললেন, রাসূল সাঃ এর সময়কালে আমরাও পড়তাম। আমি বললাম, এখন কি প্রতিবন্ধকতা এসে গেল? তিনি বললেন, ব্যস্ততা। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১১৮৪}

বুখারী শরীফের উক্ত দু’টি হাদীস দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, মাগরিবের আগের দুই রাকাত নামায সুন্নত নয়। কেননা, রাসূল সাঃ নিজেই এটাকে সুন্নত মনে করে পড়াকে মাকরূহ মনে করতেন। যা প্রথমোক্ত হাদীসের শব্দে স্পষ্ট। তাই এর মর্যাদা সর্বোচ্চ দাঁড়াচ্ছে নফল নামাযের স্তরে।

আর দ্বিতীয় বিষয় হল, প্রথম প্রথম সাহাবায়ে কেরাম উক্ত আমলটি করতেন। পরে তা সাহাবাগণ একেবারেই ছেড়ে দেন। যা দ্বিতীয় হাদীস দ্বারা স্পষ্ট।

এর দ্বারাও বুঝা যাচ্ছে যে, এটি পড়া নফল সুন্নত নয়। যদি সুন্নত হতো, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম তা এভাবে ছেড়ে দিতেন না। এটি অসম্ভব বিষয় যে, সাহাবাগণ রাসূল সাঃ এর কোন সুন্নত বিষয়কে দুনিয়াবী কোন ব্যস্ততার কারণে একদম ছেড়ে দিবেন।

সুতরাং বুখারী শরীফের উক্ত দু’টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, মাগরিবের আগের দুই রাকাত নামায সুন্নত নয়। বরং নফল।

অথচ গায়রে মুকাল্লিদদের নিকট মাগরিবের আগের দুই রাকাত নামায সুন্নত। শুধু তাই নয়, যারা একে সুন্নত মনে করে না, তারা তাদের ভাষায় জালেম এবং বেদআতি। {ফাতাওয়া উলামায়ে হাদীস-৪/২৩২, ফাতাওয়া উলামায়ে হাদীস-৪/২৩৫}

আট রাকাতওয়ালী হাদীস এবং গায়রে মুকাল্লিদীন

হযরত ইমাম বুখারী রহঃ বুখারী শরীফের ১ম খন্ডের ১৫৪ পৃষ্ঠায় একটি বাব কায়েম করেছেন। যার শিরোনাম হল, بَابُ قِيَامِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِاللَّيْلِ فِي رَمَضَانَ وَغَيْرِهِ তথা রাসূল সাঃ এর রমজানের রাতে এবং অন্য সময় রাতে কিয়াম করা [ নামায পড়া] প্রসঙ্গে।

উক্ত বাবের অধীনে ইমাম বুখারী রহঃ হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাঃ থেকে বর্ণিত এ হাদীস উল্লেখ করেন-

عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَنَّهُ أَخْبَرَهُ: أَنَّهُ سَأَلَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، كَيْفَ كَانَتْ صَلاَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي رَمَضَانَ؟ فَقَالَتْ: «مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يُصَلِّي أَرْبَعًا، فَلاَ تَسَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي أَرْبَعًا، فَلاَ تَسَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي ثَلاَثًا»

قَالَتْ عَائِشَةُ: فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ: أَتَنَامُ قَبْلَ أَنْ تُوتِرَ؟ فَقَالَ: «يَا عَائِشَةُ إِنَّ عَيْنَيَّ تَنَامَانِ وَلاَ يَنَامُ قَلْبِي»

হযরত আবু সালামা বিন আব্দুর রহমান রহঃ থেকে বর্ণিত। তিনি হযরত আয়শা রাঃ এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন যে, রাসূল সাঃ এর নামায রমজান মাসে কেমন হতো? তিনি জবাবে বললেন, রাসূল সাঃ এর নামায রমজান ও গায়রে রমজানে এগার রাকাত থেকে বেশি পড়তেন না। তিনি চার রাকাত পড়তেন। তুমি এর সৌন্দর্যতা আর দীর্ঘতা আর জিজ্ঞেস করো না। তারপর আবার চার রাকাত পড়তেন, আর বলো না, সে যে কত সুন্দর আর দীর্ঘ হতো। তারপর তিনি তিন রাকাত পড়তেন। হযরত আয়শা রাঃ বলেন, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতির নামায পড়ার আগেই শুয়ে যান? তিনি বললেনঃ হে আয়শা! আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু অন্তর ঘুমায় না। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১১৪৭}

গায়রে মুকাল্লিদ তথা কথিত আহলে হাদীসরা এ হাদীসকে বিশ রাকাত তারাবীহের বিরুদ্ধে খুব জোর দিয়ে প্রচার করে থাকে। আর বিশ রাকাত তারাবীহের পক্ষে সকল হাদীস ও আসারে সাহাবাকে অস্বিকার করে দেয়।

অথচ এ হাদীসের সম্পর্ক হল তাহাজ্জুদ নামাযের সাথে। তারাবীহ নামাযেরর সাথে নয়। যার অনেক প্রমান বিদ্যমান।

এছাড়া ইনসাফের দৃষ্টিতে দেখলে স্পষ্ট হবে যে, কথিত আহলে হাদীসরা উক্ত হাদীসের উপর নিজেরাই আমল করে না। আমল করাতো দূরে থাক, উক্ত হাদীসের বিরোধীতাও করে থাকে জোরে শোরে।

কয়েকটি প্রমান নিচে উপস্থাপন করা হল-

এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূল সাঃ চার রাকাত করে নামায পড়তেন। অথচ কথিত আহলে হাদীসরা তারাবীহ পড়ে দুই রাকাত করে।

এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূল সাঃ এ নামায একাকী পড়তেন। পড়ানোর কথা নেই। নেই জামাতের কথাও। অথচ কথিত আহলে হাদীসরা সারা রমজান মাস এ নামায জামাতের সাথেই পড়ে থাকে।

হযরত আয়শা রাঃ ও রাসূল সাঃ এর কথোপকথন তথা-

হযরত আয়শা রাঃ বলেন, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতির নামায পড়ার আগেই শুয়ে যান? তিনি বললেনঃ হে আয়শা! আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু অন্তর ঘুমায় না। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১১৪৭}

এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে রাসূল সাঃ এ নামায ঘরেই পড়তেন। মসজিদে নয়। কারণ বিতির পড়ে ঘুমানোর কথা জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, আর রাসূল সাঃ সফরে না থাকলে ঘরেই সুন্নত পড়েন, এবং ঘুমান।

অথচ গায়রে মুকাল্লিদরা এ নামায মসজিদে পড়ে থাকে। ঘরে নয়।

এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূল সাঃ নামায পড়ে শুয়ে যেতেন। তারপর ঘুম থেকে উঠে বিতির নামায পড়তেন।

অথচ গায়রে মুকাল্লিদরা নামায শেষ করার পরই শুয়ার আগেই বিতির নামায পড়ে ফেলে।

এ হাদীস প্রমাণ করছে যে, রাসূল সাঃ বিতির নামায একাকী আদায় করতেন। অথচ গায়রে মুকাল্লিদরা রমজান মাসে বিতির নামায জামাতের সাথে আদায় করে থাকে।

এ হাদীস প্রমাণ করছে যে, রাসূল সাঃ সারা বছর বিতির নামায এক সালামে তিন রাকাত পড়তেন। অথচ গায়রে মুকাল্লিদরা অধিকাংশই এক রাকাত বিতির পড়ে থাকে। আর যদি কখনো তিন রাকাত পড়েও থাকে, তাহলে দুই সালামে পড়ে, এক সালামে নয়।

এক হাদীসের এতগুলো বিষয়ে বিরোধীতা করার পরও তারা এ হাদীস দিয়ে কি করে দলীল দেয়। তাদের লজ্জা থাকা উচিত।

চলবে ইনশাআল্লাহ !……

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.