ইসলামী শরীয়তে টুপির বিধানঃ পর্ব (১)

টুপি মুসলিম উম্মাহর জাতীয় নিদর্শন বাইসলামের অন্যতম ‘শিআর’। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদগণ সহ সর্ব যুগে টুপি পরিধান করার প্রচলন মুসলিম সমাজে ছিল এবং অদ্যাবধি আছে। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টুপিকে মুসলিম এবং কাফিরদের মধ্যে পার্থক্যকারী নির্ধারণ করেছেন। কাফিররা পাগড়ি পরিধান করে কিন্তু টুপি পরিধান করে না। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের পাগড়ির নিচে টুপি পরিধান করে বিধর্মীদের বিরোধিতা করার নির্দেশ দিতেন। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টুপি কিংবা পাগড়ি ব্যতীত খোলা মাথায় কখনও নামায আদায় করেছেন বলে কোন বিশুদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায় না।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ইদানিং কিছু মুসলমান টুপির ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন এমনকি একে অবজ্ঞা করার ও দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। নামাযের বাইরে তো দূরের কথা, নামাযের সময় ও তারা টুপি পরিধান করেন না এবং এ ব্যাপারে কোন দলীল প্রমাণ নেই বলে প্রচারণা চালান। কিছু প্রবাসী ভাই যারা আরব দেশগুলোতে থাকেন তারা এসে বলেন, আরবে নাকি টুপির রেওয়াজ বা গুরুত্ব নেই। খালি মাথায়ই তারা নামায পড়ে। তারাও একটি কারণ দর্শান, টুপির ব্যাপারে হাদীস শরীফে কোন বর্ণনা নাকি পাওয়া যায় না।
এই খানে আমরা টুপি প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস ও সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আছার এবং কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করব যা টুপির ব্যাপারে সব ধরণের সন্দেহ ও দ্বিধা অপনোদনে সহায়ক হবে। পাশাপাশি ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র অনুসৃত মাযহাব চতুষ্টয়ের ফতওয়া উল্লেখ করব।এবং বৈজ্ঞানিকদের দৃষ্টিতে টুপি ব্যাবহারের উপকারীতাও রয়েছে। সাধ্যানুযায়ী তার কিছু অলোচনা করার প্রয়াস চালাবো। সাথে সাথে টুপির ব্যাপারে অনীহা প্রদর্শনকারী মহল যাকে তাদের ইমাম মানে এবং যার তাহকীককে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করে সেই নাসিরুদ্দীন আলবানীর মতামতও আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশা আল্লাহ।
টুপির সংঙ্গাঃ
টুপি শব্দটি উর্দূ। হাদিস শরীফে টুপির জন্য তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
১. কালানসুয়াহঃ শাব্দিক অর্থ- লুকায়িত, ঢেকে দেওয়া বস্তু, এক প্রকারের মাথার পোশাক, সুপরিচিত। ইংরেজী অভিধানে’কালানসুয়াহ’ এর অর্থ-Tall headgear,Tiara, Cidaris, Hood, Cowl, Capuche, Cap.
পারিভাষিক অর্থঃ”কালানসুয়াহ বলা হয়,যা মাথার উপর পরিধান করা হয় এবং তার ওপর পাগড়ি পরিধান করা হয়।” (রদ্দুল মুহতার)
২. বুরনুসঃ এর অর্থ- এমন কাপড়, যার অংশ
বিষেশ মাথার সঙ্গে লেগে থাকে।(আর রায়েদ) ভাষাবিদ আল্লামা জাওহারীর মতে, বুরনুস বলা হয় লম্বা টুপিকে।হযরতমুতামের (রহ.)বলেন,আমি আনাস(রাঃ)-এর মাথায় লম্বা টুপি দেখেছি।(বোখারী শরীফ)
৩. কিমাম বা কুম্মাহঃ এর অর্থ গোল টুপি।(মিরকাত শরহে মিশকাত) প্রখ্যাত অভিধানবিদ আল্লামা মাজদুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনু ইয়াকুব
ফাইরোজাবাদী প্রনীত ‘আল কামুসুল মুহীত’ গ্রন্হে এবং বিখ্যাত আধুনিক অভিধান ‘আলমুজামুল ওয়াসীত’-এও কুম্মাহ অর্থ গোল টুপি লেখা
হয়েছে। হাদীস শরীফে আছে, রাসূল (সাঃ) -এর টুপি এ ধরনের ছিলো যে তা মাথার সাথে লেগে থাকতো। (তিরমিযী শরীফ)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর টুপিঃ
টুপি পরিধান এবং পাগড়ি বাঁধা রাসূলের সুন্নত। রাসূলে আকরাম (সাঃ) মস্তকাবরন হিসেবে তিন প্রকারের পোশাক- টুপি,পাগড়ি ও রুমাল ব্যবহার করেছেন।নামায ছাড়াও সর্বাবস্হায় রাসূল(সাঃ), সাহাবায়ে কেরামগন টুপি ব্যবহারের আমল ছিলো। হযরত হাফিয আবু শাইখ ইসফাহানী (রহ.) তাঁর ‘আখলাকুন নবী’ গ্রন্থে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর টুপির বর্ণনা নামক আলাদা একটি অধ্যায় সংযোজন করেছেন।এবং সেখানে তিনি অনেক গুলো হাদীস উল্লেখ করেছেন।সকলের স্মৃতিপটে বদ্ধমূল হওয়ার জন্যে নিম্নে তার থেকে ক টি হাদীস পেশ করা হলোঃ
১.হাসান বিন মেহরান থেকে বর্ণিত-
عن رجل من الصحابة : قال : أكلت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم، ورأيت عليه قلنسوة بيضاء فى وسط رأسه.
একজন সাহাবী বলেছেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তাঁর দস্তরখানে খেয়েছি এবং তাঁর মাথায় সাদা টুপি দেখেছি’ (আল ইসাবাহ ৪/৩৩৯)
এ হাদীসটি ইমাম ইবনুস সাকান তার কিতাবুস সাহাবায় সনদসহ বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর এ বর্ণনায় সাহাবীর নাম আসেনি। তা এসেছে তাঁর অন্য বর্ণনায় এবং ইমাম বুখারী ও ইমাম আবু হাতেমের বর্ণনায়। তাঁর নাম ফারকাদ। ( আততারীখুল কাবীর ৭/১৩১; কিতাবুল জারহি ওয়াত তা’দীল ৭/৮১)
উল্লেখ্য, ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. ইমাম ইবনুস সাকানের উপরোক্ত বর্ণনার দ্বারা আবু নুআইম আল আসবাহানী রহ.এর এ দাবি খন্ডন করেছেন যে, ফারকাদ সাহাবী আল্লাহর নবীর দস্তরখানে খাবার খাননি। বরং হাসান ইবনে মেহরান খাবার খেয়েছেন সাহাবী ফারকাদের সাথে। (মারিফাতুস সাহাবা ৪/১০৪)
হাফেজ ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ বলেন, এ ক্ষেত্রে আবু নুআইমই ভুলের শিকার হয়েছেন। প্রমাণ হিসেবে তিনি ইমাম ইবনুস সাকানের উপরোক্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করেন। এতে প্রমাণিত হয় এ বর্ণনা সহীহ। অন্যথায় প্রমাণ-গ্রহণ শুদ্ধ হতো না। এবং আবু নুআইম এর মত ইমাম এর কথাকে খন্ডন করা যেত না।
তাছাড়া সাহাবী ফারকাদ রা.এর আল্লাহর নবীর দস্তরখানে খাবার খাওয়ার কথা ইমাম বুখারী, ইমাম আবু হাতেম ও ইবনু আবদিল বারও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
২. রাসূল(সাঃ)এর সহধর্মিনী,উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত—
أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يلبس من القلانس في السفر ذوات الآذان، وفي الحضر المشمرة يعني الشامية.
সফরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন টুপি পরিধান করতেন যা দ্বারা কান ঢাকা যায় এবং বাড়িতে অবস্থানকালে শামে তৈরি (সাধারণ) টুপি পরিধান করতেন।(আল জামে লিআখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে পৃঃ২০২,
তারিখে দামেশক লিইবনিল আসাকিরঃ ৪/১৯৩,
আল জামিউস সগীর, হাদিসঃ১০০৯৩)
এ হাদীসের সকল রাবী ‘ছিকা’ তথা নির্ভরযোগ্য।উরওয়া ও হিশাম তো প্রসিদ্ধ ইমাম। আর মুফাদদাল ইবনে ফাদালা নামে দুইজন রাবী আছেন। একজন মিসরী, তিনি অনেক বড় ইমাম ছিলেন।মিসরের কাযী ছিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে তিনি ‘ছিকা’।
আসমাউর রিজালের কিতাবাদি থেকে প্রতীয়মান হয় সনদে উল্লেখিত ব্যক্তি ইনিই। কারণ তিনিই হিশাম ইবনে উরওয়া ও ইবনে জুরাইজ থেকে রেওয়ায়েত করেন যা আল্লামা ইবনে আদী ও আল্লামা মুহাম্মাদ বিন হাসান বিন কুতায়বা তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন। (আল-কামিল ৭/৪০৯ ইকমালু তাহযীবিল কামাল ১১/৩৩৮) অপর জন বসরী। তাঁর স্মৃতিশক্তির বিষয়ে কিছু আপত্তি থাকলেও ইবনে হিববান তাকে ছিকা রাবীদের মধ্যে গণ্য করেছেন। আবু হাতেম বলেছেন يكتب حديثهআর ইমাম ইবনে আদী তার একটি বর্ণনাকে‘মুনকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাকিগুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন-তার অন্য বর্ণনাগুলো সঠিক।’ সুতরাং সনদে উল্লেখিত রাবী যদি বসরীও হন তবুও তার এ বর্ণনা সঠিক।
৩. উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-
الشهداء أربـعـة: رجل مؤمن جيد الايمان، لقى العدو ، فصدق الله حتى قتل ،فذلك الذى يرفع الناس اليه أعينهم يوم القيامة هكذا ، ورفع رأسه حتى وقعت قلنسوته، قال فما ادرى أقلنسوة عمر أراد أم قلنسوة النبى صلى الله عليه وسىلم ؟
শহীদ হল চার শ্রেণির লোক। এমন মুমীন যে তার বিশ্বাসে স্থির এবং দৃঢ়। শত্রুদের মুকাবেলায় সে শহীদ হয় এমন অবস্থায় যে সে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উপর পূর্ণ আস্থাবান ও বিশ্বাসী।
কিয়ামতের দিন তার মর্যাদা এত উচ্চ হবে যে মানুষ তার দিকে এভাবে তাকাবে-এই বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মাথা তুললেন। তখন তাঁর টুপি পড়ে গেল। অথবা বলেছেন উমরের টুপি পড়ে গেল। বর্ণনাকারি বলেন, আমি জানি না কার টুপির কথা বলা হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের না উমর (রা.)-এর। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ১৪৬, জামে তিরমিযী, হাদীস : ১৬৪৪)।
হাদীসটির ক্ষেত্রে ইমাম তিরমিযী বলেছেন, ‘হাসানুন গারীবুন।’অর্থাৎ হাদিসটির সনদ গ্রহনযোগ্য। যদিও হাদীসে টুপি কার সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে তথাপি বলা যায়, যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের টুপি হয় তবে তো বিষয়টি প্রমাণিতই। আর যদি হযরত উমর (রা.)-এর টুপি হয় তাহলেও তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপস্থিতিতে খুলাফায়ে রাশেদীনের একজনের টুপি পরা প্রমাণিত হচ্ছে। আর খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ তো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহরই অংশ।
৪.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসা ছিলাম। ইতিমধ্যে একজন আনসারী সাহাবী তাঁর কাছে এলেন। এবং তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি ফিরে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আনসারী! আমার ভাই সাদ ইবনে উবাদাহ কেমন আছে? আনসারী বললেন, ভাল আছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের কে কে তাকে দেখতে যাবে? অতপর তিনি দাঁড়ালেন আমরাও দাঁড়ালাম। আমরা সংখ্যায় দশের অধিক হব। আমাদের পায়ে মোজাও ছিল না। চপ্পলও না। গায়ে জামাও ছিল না, টুপিও না। ঐ কংকরময় ভূমিতে আমরা চলছিলাম। অবশেষে আমরা সাদ এর নিকট পৌঁছলাম তখন তার পাশ থেকে মানুষজন সরে গেল। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীরা প্রবেশ করলেন।
এখানে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর বাক্য ‘‘আমাদের পায়ে মোজাও ছিল না, চপ্পলও না। গায়ে জামাও ছিল না টুপিও না’’ থেকে বোঝা যায়, ঐ যুগে টুপিও ছিল লিবাসের অংশ।এবং কোথাও যাওয়ার জন্য সেগুলো রীতিমত আবশ্যকীয় এর ন্যয় ছিল। তাই এখানে এগুলো না থাকায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর তা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি ঠিক এরকম যেমন ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে বুরনুস প্রমাণ করেছেন। সহীহ বুখারীতে কিতাবুল লিবাসে ﺑﺎﺏ ﺍﻟﺒﺮﺍﻧﺲ নামে শিরোনাম দাঁড় করেছেন আর দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন হজের একটি হাদীস।
ﻻ ﻳﻠﺒﺲ ﺍﻟﻤﺤﺮﻡ ﺍﻟﻘﻤﻴﺺ ﻭﻻ ﺍﻟﻌﻤﺎﺋﻢ ﻭﻻ ﺍﻟﺒﺮﺍﻧﺲ
‘‘ইহরাম গ্রহণকারী জামাও পরবে না, পাগড়ীও না, বুরনুস (এক প্রকার টুপি)ও না।’’
আল্লামা আবু বকর ইবনুল আরাবী এ হাদীস থেকে পাগড়ী প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে, তৎকালে পাগড়ী পরিধানের রীতি ছিল। এ কারণে ইহরাম অবস্থায় তা পরিধান করা নিষেধ করেছেন।
৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
كان رسول الله صلى الله عليه وسىلم ،
يلبس قلنسوة بيضاء.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদা টুপি পরিধান করতেন।(তাবরানী কাবীরঃ১৩/২০৪, আল জামিউস সাগীর, হাদিস নং১০০৯২)
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী(রহ.)ও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাবারানী হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন আর ইমাম সুয়ুতী তাঁর ‘সিরাজুল মুনীর’ গ্রন্থের ৪র্থ খ-, ১১২ নং পৃষ্ঠায় হাদীসটিকে ‘সহীহ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
৬. হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
رأيت رسول الله صلى الله عليه وسىلم ،
وعليه قلنسوة بيضاء شامية .
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শামে (সিরিয়ার) তৈরি সাদা টুপি পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।(শরহু মুসনাদি আবী হানীফা, পৃঃ ১৪২)
৭. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিন প্রকার টুপি ছিলো। সাদা তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপি, ডোরাদার ইয়ামানী চাদর দ্বারা নির্মিত টুপি এবং কান ঢাকা যায় এমন টুপি যা তিনি সফরকালে পরতেন এবং কখনো কখনো সালাত আদায়ের সময় সেটিকে সামনে রেখে দিতেন।(আখলাকুননবীঃ২/২২১-৩১৫)
ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন রকম টুপি ব্যবহার করেছেন। বর্তমানেও পবিত্র মক্কায় তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপির প্রচলন আছে এবং সেখানকার মানুষ সাধারণত এই টুপি ব্যবহার করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো ইয়ামানের তৈরি ডোরাদার কাপড়ের টুপিও ব্যবহার করেছেন। তাছাড়া কান ঢাকা যায় এমন টুপিও তিনি ব্যবহার করেছেন। এ বিষয়ে এর আগের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। শেষোক্ত ধরণের টুপি যেহেতু তিনি সফরের প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন তাই সালাতের সময় তা খুলে সামনে রেখে দিতেন।
সীরাত প্রণেতা ইমামগণও আল্লাহর নবীর পোষাকের অধ্যায়ে তাঁর টুপির জন্যও আলাদা পরিচ্ছেদ লিপিবদ্ধ করেছেন। ইবনে হাইয়্যান বর্ণিত হাদীসগুলো তো আমরা এখানে উল্লেখ করলাম। এছাড়াও ইবনুল কায়্যিম,ইবনে আসাকির, ইবনুল জাওযী, শায়খ ইউসুফ সালেহী, আল্লামা দিময়াতী, বালাযুরীসহ আরো অনেক ইমাম তাদের সীরাত গ্রন্থে এ সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ সংযুক্ত করেছেন। কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় আমরা এখানে শুধু ইবনুল কায়্যিম (র.)-এর বক্তব্য তুলে ধরছি। তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘যাদুল মাআদ’-এ লেখেন, তাঁর একটি পাগড়ি ছিল, যা তিনি আলী (রা.) কে পরিয়েছিলেন। তিনি পাগড়ি পরতেন এবং পাগড়ির নিচে টুপি পরতেন। তিনি কখনো পাগড়ি ছাড়া টুপি পরতেন। কখনো টুপি ছাড়াও পাগড়ি পরতেন। (যাদুল মাআদ ১/১৩৫)
আলোচিত হাদীসগুলো দ্বারা টুপি ও তার প্রচলন প্রমাণে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.