রোগীর সেবাশুশ্রূষা উত্তম ইবাদত

পাড়া-প্রতিবেশী , আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে , তাকে দেখতে যাওয়া ও তার অবস্থা জিজ্ঞেস করা মুস্তাহাব । যদি রুগ্ণ ব্যক্তির দেখাশোনা করার মতো তার কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকে , তাহলে সর্বসাধারণের মধ্যে তার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের ওপর তার সেবাশুশ্রূষা করা ফরজে কেফায়া ।
রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন , এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের হক পাঁচটি- সালামের জবাব দেয়া , রোগীকে দেখতে যাওয়া , জানাজায় শরিক হওয়া ,
দাওয়াত কবুল করা , হাঁচির জবাব দেয়া । ( বুখারি , মুসলিম ও মিশকাত শরিফ : হাদিস নম্বর ১৫২৪) ।
হজরত বারা ইবনে আজিব রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: আমাদের সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন- প্রথম , রোগীর শুশ্রূষা করা ; দ্বিতীয় , জানাজার পশ্চাতে চলা। তৃতীয়, হাঁচিদাতার জবাবে
‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা ; চতুর্থ, দুর্বল মানুষের সাহায্য করা । পঞ্চম , নিপীড়িত ব্যক্তিদের সাহায্য করা ; ষষ্ঠ , সালামের প্রচার-প্রসার ঘটানো ; সপ্তম , কসমকারীর কসমকে পুরা করতে সাহায্য করা । ( বুখারি শরিফ ৭/১১৩ : হাদিস নম্বর ৫৬৩৫) ।
সর্বপ্রথম রাসূল সা: যা বলেছেন তা হচ্ছে ,
রোগীর সেবাযত œ করা । অসুস্থ ব্যক্তির অসুস্থতার কথা জিজ্ঞেস করা । রাসূলুল্লাহ সা: নিজেও রোগীর সেবাশুশ্রূষা করতেন।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা: এক অসুস্থ ইহুদি গোলামকে দেখতে গিয়ে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন ।
এই আমলটি সাধারণত আমরা সবাই করি ।
তবে বর্তমানে রোগীর সেবাশুশ্রূষা শুধু একটি প্রচলন হয়ে গেছে । আমরা অসুস্থ ব্যক্তির শুশ্রূষা করতে যাই লোকলজ্জার ভয়ে । লোকলজ্জার মানসিক চাপ নিয়ে রোগীর শুশ্রূষা করলে আখেরাতের নেক সাওয়াবের আশা করা যায় না। সাওয়াব লাভ করার জন্য ইখলাস বা আন্তরিকতা ও আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার মানসিকতা থাকা জরুরি । এক হাদিসে কুদসিতে বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাষায় উল্লেখিত হয়েছে। হাদিসটি এই-
‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন,
হে আমার বান্দা! আমি তোমার প্রভু। আমি অসুস্থ ছিলাম , তুমি আমাকে দেখতে আসনি । বান্দা বলবে , হে প্রভু! আপনি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক, আমি কিভাবে আপনাকে দেখতে যেতে পারি ? আল্লাহ তায়ালা বলবেন , তুমি কি জানতে না যে ,
আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল ? যদি তুমি তাকে দেখতে যেতে তাহলে তুমি সেখানে আমাকে পেতে। আল্লাহ তায়ালা আবার হে আমার বান্দা! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম , কিন্তু তুমি আমাকে খাবার দাওনি । বান্দা বলবে , ইয়া রব! আমি আপনাকে কিভাবে খাবার দিতে পারি ?
আপনি হলেন সারা জাহানের পালনকর্তা ।
আল্লাহ তায়ালা বলবেন , আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল কিন্তু তুমি তাকে খাবার দাওনি । যদি তুমি তাকে খাবার দিতে তাহলে আজ আমাকে কাছে পেতে । পুনরায় আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম , তুমি আমাকে পানি দাওনি ।
বান্দা আগের মতোই উত্তর দেবে । আল্লাহ তায়ালা বলবেন , তোমার কি স্মরণ আছে ,
আমার এক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল; কিন্তু তুমি তাকে পানি দাওনি ? তুমি কি জানো , তুমি যদি সেদিন তাকে পানি দিতে তাহলে তার প্রতিদানে আজ আমাকে কাছে পেতে । ’ ( বুখারি শরিফ : রোগীর সেবা করার ফজিলত , রিয়াদুস সালেহিন) ।
অসুস্থকে দেখতে যাওয়া ,
ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো ,
পিপাসার্তকে পানি পান করানো- এগুলো হলো মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের মাধ্যম । সহানুভূতি এমন এক মহৎ গুণ, যার কারণে মানুষ আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে পারে ।
আরেক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন , ‘ কোনো মুসলমান ব্যক্তি অপর মুসলমান ব্যক্তির সেবাশুশ্রূষা করলে , যতটুকু সময় ধরে সেবা করে ততটুকু সময় সে ধারাবাহিকভাবে জান্নাতের বাগিচায় বিচরণ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে প্রত্যাবর্তন না করে। ’ ( সহি মুসলিম , কিতাবুল বির ওয়াস সেলাহ) ।
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘ কোনো মুসলমান ব্যক্তি অপর মুসলমান ব্যক্তিকে সকালে সেবাশুশ্রূষা করলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে । সন্ধ্যায় সেবাশুশ্রূষা করলে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে তার জন্য একটি বাগান নির্দিষ্ট করেন । ’
এটা কোনো সাধারণ প্রতিদান নয় । মাত্র একটু মেহনতের দ্বারা মেহেরবান খোদা আমাদের কী পরিমাণ সাওয়াব দান করছেন! তার পরও কি আমরা এই চিন্তা করব যে , অমুকে তো আমি অসুস্থ হওয়ার পর আমাকে দেখতে আসিনি । আমি কেন তাকে দেখতে যাবো ? এজাতীয় চিন্তা দ্বারা যে আমার নিজের আখেরাত ধ্বংস হচ্ছে , আশা করি তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই । অমুক যদি সাওয়াব অর্জন না করেন ,
তার যদি ৭০ হাজার ফেরেশতার দোয়ার দরকার না হয় , সে যদি জান্নাতের বাগিচা অর্জন করতে না চায় তাহলে আমিও কি তা অর্জন করব না ? আমি কি অমুকের সাথে হিংসা করে আমার আখেরাত নষ্ট করব ?
আমি কি ৭০ হাজার ফেরেশতার দোয়া থেকে বঞ্চিত হব? আমার কি জান্নাতের বাগিচার দরকার নেই ?
যদি রোগীর পক্ষ থেকে আমি কষ্ট পেয়ে থাকি অথবা তার সাথে আমার আন্তরিকতা না থাকে , তার পরও তার সেবাযতেœ র জন্য আমার যাওয়া উচিত । এতে দ্বিগুণ সাওয়াবের অধিকারী হব ইনশাআল্লাহ ।
একটি হচ্ছে রোগীর সেবাশুশ্রূষা করার সাওয়াব । অপরটি হচ্ছে এ রকম মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার সাওয়াব ,
যার ব্যাপারে আমার অন্তরে সঙ্কোচ রয়েছে। এ সঙ্কোচ ও লজ্জা থাকা সত্ত্বেও তার সাথে বন্ধুত্বসুলভ সহমর্মিতার আচরণ করার ওপর পৃথক প্রতিদান পাবো ইনশাআল্লাহ । সুতরাং রোগীর সেবাশুশ্রূষা ও তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া কোনো মামুলি বিষয় নয় । তাই অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে শুধু আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য রোগীর সেবাশুশ্রূষা করলে ইনশাআল্লাহ অগাধ প্রতিদান পাওয়া যাবে ।
রোগী দেখতে যাওয়ার আদব :
১. সাক্ষাতের সাধারণ আদবগুলো মেনে চলা। যেমন- হালকা শব্দে দরজা নক করা ।
অনুমতি নেয়ার সময় দরজার সামনে না দাঁড়ানো। নিজের স্পষ্ট পরিচয় দেয়া ।
চক্ষুকে অবনত রাখা ইত্যাদি।
২. সাক্ষাতের জন্য উপযুক্ত সময় নির্বাচন করা । খাবারের সময় , বিশ্রামের সময়, ঘুমের সময়, ইবাদতের সময় সাক্ষাৎ করতে না যাওয়া ।
৩. রোগীর মাথার কাছে বসা । তার কপালে হাত দেয়া । তার অবস্থা জিজ্ঞেস করা ।
৪. বারবার সাক্ষাতের জন্য না যাওয়া ।
এতে রোগীর কষ্ট হতে পারে । তবে রোগীর অবস্থা দ্বারা যদি বোঝা যায়,
সাক্ষাৎপ্রার্র্থীর বারবার সাক্ষাতে রোগী তৃপ্তি পায় বা আগ্রহী হয় বা রোগ-যন্ত্রণা কিছুটা হ্রাস পায় , তাহলে বারবার যাওয়া যেতে পারে ।
৫. রোগীর কাছে বেশিক্ষণ অবস্থান না করা । এতে রোগীর নিজের বা পরিবারের লোকদের বিরক্তির কারণ হতে পারে বা তাদের কোনো নিয়মিত কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে ।
৬. রোগীকে বেশি প্রশ্ন না করা । কেননা অসুস্থাবস্থায় বেশি বেশি প্রশ্ন রোগীর জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৭. রোগীর সুস্থতার জন্য দোয়া করা । তার কাছে বসে সূরা নাস, ফালাক ও সূরা ইখলাস পাঠ করা । আরো অনেক দোয়া বর্ণিত আছে । যেমন- আসআলুল্লাহাল আজিম রব্বাল আরশিল আজিম আন ইয়াশফিয়াক । ’ ( সাত বার) ।
৮. অসুস্থ ব্যক্তির সামনে এমন কিছু না বলা ,
যা তাকে চিন্তিত করে তোলে । বরং তাকে সান্ত্বনার বাণী শুনাতে হবে । তার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করতে হবে ।
রোগীকে সান্ত্বনা প্রদান করা নেকির কাজ । রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন , ‘ যে ব্যক্তি তার মুমিন ভাইকে বিপদে সান্ত্বনা দেবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাকে সম্মানের পোশাক পরিধান করাবেন । ( ইবনে মাজাহ : হাদিস নম্বর ১৬০১ ,
সনদ হাসান , ইরওয়াউল গালিল : হাদিস নম্বর ৭৬৪) । তাকে সাহস দিতে হবে । ধৈর্য ধারণ করার উপদেশ দিতে হবে । সম্ভব হলে ধৈর্যের প্রতিদান সম্পর্কে কিছু শোনাতে হবে । এমন কথা বলতে হবে যাতে তার মনোবল শক্তিশালী হয় ।
৯. অসুস্থ ব্যক্তির কাছে নিজের জন্য দোয়া চাইতে হবে। কেননা এটি সুন্নত।
মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব
লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষক, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজিপুর।
সম্পাদক, মাসিক আল হেরা।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It on Pinterest

Hatay masaj salonu Diyarbakır masaj salonu Adana masaj salonu Aydın masaj salonu Kocaeli masaj salonu Muğla masaj salonu Yalova masaj salonu Gaziantep masaj salonu Kütahya masaj salonu Elazığ masaj salonu Bursa masaj salonu Konya masaj salonu Samsun masaj salonu Mersin masaj salonu Manisa masaj salonu Afyon masaj salonu Kütahya masaj salonu Çanakkale masaj salonu Edirne masaj salonu Yozgat masaj salonu Çorum masaj salonu>