সা’দ ইবন ’উবাদা (রা)

আসল নাম সা’দ, ডাকনাম আবু কায়স ও আবু সাবিত। প্রথমটি অধিকতর প্রসিদ্ধ। (উসুদুল গাবা- ২/২৮৩) লকব বা উপাধি সায়্যিদুল খাযরাজ। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের ‘সায়িদাহ’ শাখার সন্তান। পিতার নাম ’উবাদা ইবন দুলাইম এবং মাতার নাম ’উমরা বিন্তু মাস’উদ। ’উমরা সাহাবিয়্যা (মহিলা সাহাবী) ছিলেন এবং হিজরী ৫ম সনে ইন্তিকাল করেন। সা’দ তখন রাসূলুল্লাহর সা. সাথে ‘দুমাতুল জান্দাল’ যুদ্ধে যোগদানের জন্য মদীনার বাইরে। মদীনায় ফিরে রাসূল সা. তাঁর মার কবরে যান এবং তাঁর জন্য দু’আ করেন। (তাবাকাত- ৩/৬১৪; আল-ইসাবা- ২/৩০)

হযরত সা’দের সম্মানিত দাদা ‘দুলাইম’ ছিলেন খাযরাজ গোত্রের সবচেয়ে বড় নেতা। তাছাড়া মদীনার জনকল্যাণমূলক কাজেও তাঁর খ্যাতি ছিল। সায়িদাহ খান্দানের সম্মান ও গৌরব মূলতঃ তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন পৌত্তলিক। দেবী ‘মানাত’- এর পূজা করতেন। এ দেবীর মূর্তি ছিল মক্কার নিকটে ‘মুসালাল্’ নামক স্থানে। তিনি প্রতি বছর সেখানে দশটি উট বলি দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ’উবাদা, তারপর সা’দ ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এ কাজ অব্যাহত রাখেন। ইসলামী যুগে সা’দের ছেলে কায়স পূর্ব পুরুষের ধারা বজায় রেখে উটগুলি কা’বার চত্বরে কুরবানী করতেন। একবার হযরত আবু ’উবাইদা ও হযরত ’উমার রা. কায়সকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করে; কিন্তু কায়স তাঁদের কথার প্রতি মোটেও কর্ণপাত করেননি। তাঁরা কায়সের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট অভিযোগ করেন। তখন রাসূল সা. বলেনঃ কায়স তো দানশীল পরিবারের সন্তান। (আল-ইসতীয়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৭)

সা’দের পিতা ’উবাদা ছিলেন পিতার যোগ্য উত্তরসূরী। পিতার মত একইভাবে জীবন কাটিয়ে ছেলে সা’দের জন্য ক্ষমতা ও নেতৃত্বের আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে যান। ছেলেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলেন। ‘সা’দ’ সেই জাহিলী আরবেই ‘কামিল’ উপাধি লাভ করেন। কারণ, তৎকালীন আরবে হাতে গোনা যে ক’জন লোক আরবী লিখতে জানতো, তিনি ছিলেন তাদের একজন। তাঁর আরবী লেখা ছিল চমৎকার। তাছাড়া তিনি ছিলেন সে সময়ের আরবের একজন শ্রেষ্ঠ সাঁতারু ও দক্ষ তীরন্দাজ। আর এ বিদ্যাগুলি যারা বিশেষভাবে রফ্ত করতো আরববাসী শুধু তাদেরকেই ‘কামিল’ উপাধি দিত। (দ্রঃ তাহজীব আত-তাহজীব- ৩/৪৭৫; আল ইসাবা- ২/৩০; তাবাকাত- ৩/৬১৩)

শেষ ’আকাবার বাই’য়াতের সময় সা’দ ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে বনী সায়িদার ‘নাকীব’ (দায়িত্বশীল) নিয়োগ করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫০; উসুদুল গাবা- ২/২৮৩) তাঁকে উঁচু স্তরের সাহাবী গণ্য করা হতো। বুখারী শরীফে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘ওয়া কানা জা কিদামিন ফিল ইসলাম’- ইসলামে তিনি ছিলেন প্রথম স্তরের মানুষ।

’আকাবার শেষ বাই’য়াত যেভাবে সম্পন্ন হয়, আনসারদের যে সংখ্যক মানুষ তাতে অংশগ্রহণ করেন এবং যে সকল গুরুত্বপূর্ণ শর্তের ওপর তা অনুষ্ঠিত হয় তাতে তা গোপন থাকা সম্ভব ছিল না। যদিও তা রাতের অন্ধকারে গোপনে হয়েছিল। কারণ, রাসূলকে সা. নিয়ে কুরাইশদের চিন্তার অন্ত ছিল না। তারা সর্বক্ষণ তাঁর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতো। সুতরাং রাতের যে লগ্নে রাসূল সা. ’আকাবার মদীনা থেকে আগত লোকদের নিকট থেকে বাই’য়াত গ্রহণ করেন, ঠিক সেই সময়ে; কেউ একজন মক্কার ‘জাবালে আবু কুরাইসের ওপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল; ‘দেখ সা’দ যদি মুসলমান হয়ে যায় তাহলে মুহাম্মাদ একেবারেই নির্ভীক হয়ে যাবে।’ (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; আল ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ২/৩৭)

এ আওয়ায কুরাইশদের কানে পৌঁছালেও প্রথমে তারা বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। তারা সা’দ বলতে ‘কাদায়া’ ও তামীম গোত্রের সা’দ নামের লোকগুলিকে বুঝেছিল। পরের রাতে ঐ পাহাড় থেকে আবার একটি কবিতার কিছু চরণ আবৃত্তি করতে শোনা গেল। তাতে পরিষ্কার ভাবে সা’দের নাম ও পরিচয় ছিল। কুরাইশরা দারুণ বিস্ময়ের মধ্যে পড়ে গেল। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তারা ‘দারুন নাদওয়া’ বা পরামর্শ গৃহে সমবেত হলো। তারা মদীনার আউস গোত্রের সর্দার আবদুল্লাহ ইবন ’উবাই ইবন সুলুলের সাথে কথা বললো, কিন্তু সে বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করলো। কুরাইশরা চারিদিকে গোয়েন্দা নিয়োগ করে যার যার মত বাড়ীতে ফিরে গেল। আর মদীনাবাসী মুসলমানরা ‘ইয়াজজ’- এর পথে স্বদেশ অভিমুখে যাত্রা করলো।

ইবন ইসহাক ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ ‘নাকীবগণ ’আকাবার রাতে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত শেষ করে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। কেউ কেউ মক্কা ছেড়ে স্বদেশের পথ ধরলো। এদিকে বাই’য়াতের কথা লোকমুখে প্রচার হয়ে গেল। খোঁজ-খবর নিয়ে কুরাইশরা বুঝতে পারলো, ব্যাপারটি সত্য। তারা বাই’য়াতকারীদের ধরার জন্য বেরিয়ে পড়লো এবং সু’দ ইবন ’উবাদা ও আল মুনজির ইবন ’উমারকে পেয়ে গেল। তবে সা’দকে ধরতে পারলেও আল মুনজির ইবন ’উমার পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। সা’দের মাথার চুল ছিল লম্বা। তারা সেই চুল ধরে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে চললো। সা’দ বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তাদের হাতে বন্দী। কুরাইশদের কয়েকজন লোক আমার কাছে আসলো। তাদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল সুদর্শন যুবককে দেখে আমি ভাবলাম, যদি এ সম্প্রদায়ের কারও মধ্যে ভালো কিছু থাকে তাহলে হয়তো এর মধ্যেই আছে। সে ছিল সুহাইল ইবন ’আমর। কিন্তু সে আমার আশার মুখে ছাই দিয়ে কাছে এগিয়ে এসে আমার গায়ে জোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল। আমি তখন মনে মনে বললাম; আল্লাহর কসম! এরপর এ সম্প্রদায়ের অন্য কারও কাছে ভালো কিছু আশা করা বৃথা। একজন প্রশ্ন করলো; তুমি কি মুহাম্মাদের দীন কবুল করেছ? আমি বললাম; হাঁ, কবুল করেছি। তখন তাঁরা আমাকে দড়ি দিয়ে কষে বাঁধলো। এসময় একজন আমার উরুতে টোকা মেরে বললোঃ কুরাইশদের কারও সাথে তোমার কি কোন চুক্তি আছে? বললামঃ হাঁ আছে। মুতয়িম ইবন ’আদী ও আল-হারিস ইবন উমায়্যা যখন আমাদের আবাসভূমিতে যায়, আমি তাদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। সে বললোঃ তোমার বাপ নিপাত যাক। শিগগিরই তাদের নাম ধরে জোরে জোরে সাহায্য চাও। আমি তাই করলাম। লোকটি ছুটে তাদের দু’জনের কাছে গিয়ে বললোঃ কুরাইশদের কয়েক ব্যক্তি যে লোকটিকে বন্দী করে মারধোর ও অপমান করছে সে তোমাদের দু’জনের নাম ধরে ডাকছে। সে বলছে, তোমাদের সাথে নাকি তার মৈত্রী চুক্তি আছে। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ লোকটি কে? সে বললোঃ সা’দ ইবন ’উবাদা। তারা বললোঃ সে সত্য বলেছে। তারপর মুতয়িম ইবন ’আদী ও আল হারিস ইবন উমায়্যা ছুটে এসে তাদের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে মদীনার পথ ধরিয়ে দেয়।’

এই মুতয়িম ইবন আদী ছিলেন মক্কার এক অতি ভদ্র ও সম্মানিত ব্যক্তি। ইসলামের সূচনা পর্বে মক্কায় তিনি রাসূলকে সা. নানাভাবে সাহায্য করেছেন। আর যে ব্যক্তি তাকে খবর দিয়েছিল, সে ছিল আবুল বাখতারী ইবন হিশাম।

যাইহোক, সা’দ এভাবে বন্দী হওয়ায় মদীনা অভিমুখী আনসারদের কাফেলায় দারুণ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তারা পরামর্শ বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়, জীবনের ঝুঁকি থাকলেও মক্কায় ফিরে সা’দের সন্ধান নিতে হবে। এর মধ্যে সা’দকে ফিরে আসতে দেখা গেল। তারা তাঁকে সংগে করে সোজা মদীনার পথ ধরলো। (দ্রঃ তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৫, ৮৬; আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪, ২৫৫; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১৫০, ১৫১; তাবাকাত- ১/১৫০)

সা’দের বন্দীর বিষয়টি নিয়ে কুরাইশ পক্ষের কবি দারবার ইবনুল খাত্তাব ইবন মিরদাস একটি কবিতা রচনা করে। কবি হাস্সান ইবন সাবিত তার জবাবে বড় একটি কবিতা লেখেন। তাতে সা’দের প্রশংসা ও কুরাইশদের নিন্দা করা হয়েছে। আনসাবুল আশরাফ ও সীরাতু ইবন হিশামসহ বিভিন্ন গ্রন্থে তার কিছু অংশ সংকলিত হয়েছে। (দ্রঃ আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৫; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১৫০, ১৫১)

উপরোক্ত ঘটনার কয়েক মাস পর রাসূল সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন। এ উপলক্ষে মদীনার প্রতিটি অলি-গলিতে আনন্দ উৎসবের বন্যা বয়ে যায়। তিনি আবু আইউবের বাড়ীতে পৌঁছতেই সেখানে হাদিয়া তোহফা আসা শুরু হয়ে যায়। হযরত সা’দ তাঁর বাড়ী থেকে বড় এক পাত্র সারীদ ও ’উরাক পাঠিয়ে দেন। (তাবাকাত- ১/১৬১)

হিজরাতের কয়েক মাস পর থেকে ইসলামী আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করতে থাকে। হিজরাতের দ্বাদশ মাস সফরে হযরত রাসূলে কারীম সা. কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য ছোট্ট একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে যান। এটাকে ‘ওয়াদ্দান’ অভিযানও বলা হয়। এ বাহিনীতে কোন আনসার মুজাহিদ ছিল না। এ সময় পনেরোটি রাত রাসূল সা. মদীনার বাইরে ছিলেন। তিনি সা’দ ইবন ’উবাদাকে স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে মদীনায় রেখে যান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৮৭; তাবাকাত- ১/৩)

হিজরী দ্বিতীয় সনে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে হযরত সা’দের অংশ গ্রহণের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের দারুণ মতভেদ আছে। ইয়াকুব ইবন সুফইয়ান, মূসা ইবন ’উকবা, খলীফা ইবন খায়্যাত, আল ওয়াকিদী, আল মাদায়িনী, ইবনুল কালবী প্রমুখ সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁকে বদরী যোদ্ধা বলে উল্লেখ করেছেন। আবু আহমাদ তাঁর ‘আল কুনা’ গ্রন্থে বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বদরে অংশগ্রহণ করে। (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৩; আল ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ২/৩৬; তারীখ ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪, ৮৫) পক্ষান্তরে ইবন ইসহাক তাঁকে বদরী যোদ্ধাদের মধ্যে উল্লেখ করেননি। ইবন সা’দ ও বালাজুরী বলেনঃ সা’দ বদরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু যাত্রার প্রাক্কালে তাঁকে কুকুরে কামড়ায়। এ কারণে তিনি যেতে পারেননি। রাসূল সা. তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ যদিও সা’দ বদরে হাজির হয়নি, তবে সে যাওয়ার জন্য আগ্রহী ছিল। কোন কোন বর্ণনা মতে রাসূল সা. তাঁকে বদরের গনীমতের অংশ দিয়েছিলেন। ইবন আসাকির বলেন, এটা সর্বসম্মত ও প্রমাণিত নয়। (দ্রঃ তাকরীবুত তাহজীব- ১/২৮৮; উসুদুল গাবা- ২/২৮৩, আল ইসাবা- ২/৩০; তারীখ ইবন ’আসাকির ৬৮৪, ৮৫) ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম সা’দের বদরে অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। তবে এটাই সঠিক যে, তিনি বদরে শরীক হননি। আল্লামা ইবন হাজার ’আসকিলানীর মতও এটাই। তিনি ইমাম মুসলিমের ভাষা দ্বারা নিজ মতের স্বপক্ষে খুব সূক্ষ্ণভাবে প্রমাণ গ্রহণ করেছেন। (দ্রঃ ফাতহুল বারী- ৫/২২৪)

বদর যুদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের যুদ্ধগুলির মধ্যে প্রথম এবং সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। এর পূর্বে যদিও চারটি গাযওয়া ও চারটি সারিয়্যা সংঘটিত হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোন আনসারী সৈনিক অংশগ্রহণ করেনি। এর নানা কারণ থাকতে পারে। একটি এই হতে পারে যে, ’আকাবার বাই’য়াতের সময় আনসারদের পক্ষ থেকে শুধু এ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, যারা মদীনা আক্রমণ করবে শুধু তাদেরকেই তারা প্রতিরোধ করবে। মদীনার বাইরে কোন সংঘাত হলে সে বিষয়ে তাদের ভূমিকা কী হবে তার কোন উল্লেখ তাতে ছিল না। আরেকটি কারণ এই হতে পারে যে, রাসূল সা. প্রথমত মদীনার মূল বাসিন্দাদেরকে কুরাইশদের শত্রু হিসেবে দাঁড় করাতে চাননি।

অতএব রাসূল সা. যখন বদরে যাত্রার মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন তখন আনসারদের সথে পরামর্শ করা ও তাদের মতামত গ্রহণ প্রয়োজন মনে করেন। মদীনার সকল গোত্রের লোকদের একটি বৈঠকে ডাকা হলো। সেখানে যুদ্ধের বিষয়টি উঠলো। হযরত আবু বকর রা. উঠে তাঁর মতামত পেশ করলেন। হযরত ’উমার রা. কিছু বলার জন্য উঠলেন, কিন্তু রাসূল সা. তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন না। সেই বৈঠকে হযরত সা’দ ইবন ’উবাদাও ছিলেন। তিনি বুঝলেন, রাসূল সা. তাঁদের মতামত চাচ্ছেন। তিনি বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল। যার হাতে আমার জীবন, তাঁর জাতের কসম, আপনি যদি আমাদেরকে সমুদ্র অভিযানের নির্দেশ দেন, আমরা তা দলিত মথিত করে ছাড়বো। আর যদি শুকনো মাটিতে অভিযানের আদেশ দেন তাহলে ইয়ামনের ‘বারকে গিমাদ’ পর্যন্ত উট ছুটিয়ে নিয়ে যাব। (সহীহ মুসলিম- ২/৮৪; আল-বিদায়া- ৩/২৬৩; কানযুল ’উম্মাল- ৫/২৭৩; হায়াতুস সাহাবা- ১/৪২৪)
উল্লেখিত বর্ণনার ভিত্তিতে সীরাত লেখকদের অনেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তিনি বদরে যোগদান করেছিলেন। অথচ সহীহ মুসলিমের এ বর্ণনাতেই উল্লেখ আছে সিরিয়া থেকে আবু সুফইয়ানের বণিজ্য কাফিলা আসার খবর যখন রাসূলুল্লাহ সা. পেলেন তখন তিনি পরামর্শ করেন। মূলতঃ এ বাণিজ্য কাফেলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে রাসূল সা. মদীনা থেকে বের হন; যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নয়। (মুসলিম- ২/৮৪) কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, মক্কা থেকে কুরাইশ বাহিনী বদরের দিকে এগিয়ে আসছে। আর তখনই রাসূল সা. যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ কারণে মদীনাবাসীদের অনেকেই বুঝতে পারেননি যে, রাসূল সা. বদরে একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন। তাই তাদের অনেকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মদীনা থেকে বের হননি। আর তাদেরই একজন সা’দ ইবন ’উবাদা। (আনসাবূল আশরাফ- ১/২৮৮)

বদরের পর উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মক্কার পৌত্তলিক শক্তি এমন তোড়জোড় সহকারে ধেয়ে আসে যে মদীনায় একটি ভীতির সঞ্জার হয়। গোটা মদীনায় সারা রাত পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। মদীনার কয়েকজন শ্রেষ্ঠ সন্তান যথা সা’দ ইবন মু’য়াজ, ’উসাইদ ইবন হুদাইর প্রমুখের সাথে তিনিও অস্ত্র হাতে রাসূলুল্লাহর সা. গৃহের হিফাজত দাঁড়িয়ে যান। তাঁরা সারা রাত মদীনা পাহারা দেন। শাওয়ালের ৬ তারিখ জুম’আর দিন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা. আনসার গোত্র খাযরাজের পতাকাটি সা’দ ইবন ’উবাদার হাতে তুলে দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৪, ৩১৭) প্রস্তুতি শেষ হলে রাসূল সা. ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে বের হন। আউস ও খাযরাজ গোত্রের দুই নেতা সা’দ ইবন মুদয়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদা নিজ নিজ গোত্রের ঝান্ডা হাতে নিয়ে আগে আগে চললেন। মধ্যে রাসূল সা. এবং ডানে বাঁয়ে অন্যান্য আনসার-মুহাজির মুজাহিদগণ। এমন শান শওকাতে হযরত রাসূলে কারীমকে সা. বের হতে দেখে কাফির ও মুনাফিকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়।

শনিবার উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে যুদ্ধ শুরু হলো। সংঘর্ষ এমন তীব্র ছিল যে, এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো। তবে রাসুল সা. ময়দানে অটল থাকলেন। এ সময় মাত্র ১৪ ব্যক্তি নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. সামনে থেকে কাফিরদের হটিয়ে দেন। অনেকের মতে ঐ ১৪ জনের একজন সা’দ ইবন ’উবাদা। (যারকানী- ২/৪০)

হিজরী ৫ম সনে সংঘটিত হয় বনী মুসতালিক বা মুরাইসী’র যুদ্ধ। এতে আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্রের ঝান্ডা তাঁরই হাতে অর্পণ করা হয়। (তাবাকাত, মাগাযী অধ্যায়- ৪৫) এ যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে উম্মুল মুমিনীন হযরত ’আয়িশাকে রা. কেন্দ্র করে একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে। মুনাফিকরা সুযোগ পেয়ে যায়। তারা হযরত ’আয়িশার রা. চরিত্র সম্পর্কে কিছু অশোভন উক্তি করে এবং তাতে কিছু সরল মুসলমানও জড়িয়ে পড়ে। এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় রাসূল সা. ভীষণ কষ্ট পান এবং একটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। ইসলামের ইতিহাসে ঘটনাটি ‘ইফ্ক’ বা বানোয়াট কাহিনী নামে পরিচিত হয়েছে।

এই ‘ইফ্ক’- এর ঘটনার এক পর্যায়ে হযরত রাসূলে কারীম সা. মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেন, আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল আমার পরিবারের প্রতি মিথ্যা কলঙ্ক আরোপ করেছে। এতে আমি দারুণ কষ্ট পেয়েছি। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যে এর প্রতিবিধান করতে পারে? সাথে সাথে আউস গোত্রের নেতা সা’দ ইবন মু’য়াজ বলে ওঠেন; আমি প্রস্তুত। আপনি যে হুকুম দেবেন তা পালন করবো। সে যদি আউস গোত্রের লোক হয় এখনই তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হবে। আর খাযরাজ গোত্রের হলে আপনার নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত আছি। উল্লেখ্য যে প্রাচীন কাল থেকে আউস ও খাযরাজ এই দুই গোত্রের মধ্যে শত্রুতা ও রেষারেষি চলে আসছিল। প্রাক-ইসলামী যুগে তাদের মধ্যে বড় ধরনের অনেক যুদ্ধও হয়েছিল। ইসলাম তাদের সেই বৈরিতা দূর করে দেয়। তা সত্ত্বেও তাদের অন্তরে পূর্ব শত্রুতার কিছুটা রেশ বিদ্যমান ছিল। এ কারণে সা’দ ইবন মু’য়াজের কথায় খাযরাজ গোত্রের নেতা সা’দ ইবন ’উবাদা অপমান বোধ করেন। কথাটি তিনি সহজভাবে নিতে পারলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওহে সা’দ ইবন মু’য়াজ! তুমি ঠিক বলোনি। তোমরা কক্ষনো খাযরাজকে হত্যা করতে পারবে না, তাদেরকে পরাভূত করতেও সক্ষম হবে না। যদি তোমার নিজ গোত্র আবদুল আশহালের ব্যাপারে হতো তাহলে তোমার মুখ থেকে এমন কথা বের হতো না। উসাউদ ইবন হুদাইর ছিলেন সা’দ ইবন মু’য়াজের খালাতো বা মামাতো ভাই। তিনি সা’দ ইবন ’উবাদাকে লক্ষ্য করে বললেন; আপনি এসব কী বলছেন। রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশ পেলে আমরা অবশ্যই তা পালন করবো। তারপর দুই গোত্র উত্তেজিতভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। রাসূল সা. মিম্বরে ছিলেন। তিনি উত্তেজনা দূর করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। (ফাতহুল বারী- ৮/৩২; সহীহুল বুখারী- ৭/৩৩৫; সীয়ারে আনসার- ২/৩৩)

হিজরী ৫ম সনে খন্দক যুদ্ধের সময় মদীনার মুসলমানদের অবস্থা যখন অতি সঙ্কটজনক তখন হযরত রাসূলে কারীম সা. গাত্ফান গোত্রের দুই নেতা ’উয়াইনা ইবন হিস্ন ও আল হারিস ইবন ’আউফের সাথে একটি চুক্তি করার ইচ্ছা করলেন। তিনি তাদের সাথে এই শর্তে চুক্তি করতে চাইলেন যে, মদীনায় উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশের বিনিময়ে তারা কুরাইশদের সাথে যোগ দিয়ে মদীনা আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে। রাসুল সা. পরামর্শের জন্য সা’দ ইবন মু’য়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদাকে ডাকলেন। তাঁরা উপস্থিত হলে রাসূল সা. বললেন; আমি ’উয়াইনা ও আল হারিসকে মদীনায় উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ এই শর্তে দিতে চাই যে, তারা কুরাইশদের পক্ষ ত্যাগ করে ফিরে যাবে; কিন্তু তারা অর্ধেক দাবী করছে। এ ব্যাপারে তোমাদের মত কী?

সা’দ ইবন ’উবাদা বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ যদি ওহীর নির্দেশ হয় তাহলে তো দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই। আর তা যদি না হয় তাহলে তাদের দাবীর জবাব তো শুধু তরবারি। আল্লাহর কসম! আমরা তাদেরকে ফলের পরিবর্তে তরবারির ধার উপহার দেব।

রাসূল সা. বললেনঃ ‘ওহী নয়। ওহী হলে তো তোমাদের সাথে পরামর্শের কোন প্রশ্নই উঠতো না। সা’দ বললেনঃ ‘তাহলে তরবারির মাধ্যমে তাদেরকে জবাব দিতে হবে। জাহিলী যুগেও এমন অপমান আমরা চিন্তা করিনি। আর এখন তো আল্লাহ তা’য়ালা আপনার মাধ্যমে হিদায়াত দান করে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। এখন দেব আমরা আমাদের ফসলের একাংশ তাদেরকে?’ রাসূল সা. তাঁদের দুই জনের সাথে আলোচনা করে খুব খুশী হলেন এবং তাঁদের জন্য দু’আ করলেন। তারপর সা’দ ইবন উবাদা খসড়া চুক্তি পত্রটি হাতে নিয়ে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। (দ্র্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২১-২২৩; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৪৬, ৩৪৭; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৪, ৪৫) এই খন্দক যুদ্ধেও আনসারদের ঝান্ডা সা’দ ’উবাদার হাতে ছিল।

মদীনার ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের অবরোধের সময় সা’দ ইবন উবাদা নিজ খরচে মুসলিম সৈনিকদের মধ্যে খেজুর বন্টন করেন। তেমনিভাবে বনু কুরাইজার অবরোধের সময় তিনি মুসলিম সৈনিকদের রসদপত্র সরবরাহ করেন। (দারিয়া-ই-মা’খারিফ ইসলামিয়্যা- ১১/৩২)

হিজরী ৬ষ্ঠ সনে রাসূল সা. ‘গাবা’ অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি সা’দকে ৩০০ সদস্যের একটি বাহিনীর অফিসার বানিয়ে মদীনার নিরাপত্তহার দায়িত্বে রেখে যান। ওয়াকিদী বর্ণনা করেনঃ গাবা অভিযানের সময় সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর গোত্রের তিন শো লোক নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. না ফেরা পর্যন্ত পাঁচ রাত্রি মদীনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাছাড়া রাসূল সা. যখন ‘জ্বিকারাদ’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন তখন সাহায্যের জন্য মদীনায় খবর পাঠান। হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা দশটি উট বোঝাই করে খেজুর পাঠান। রাসূলুল্লাহর সা. এই বাহিনীতে সা’দের ছেলে কায়সও ছিলেন একজন অশ্বারোহী সৈনিক। তিনি পিতা প্রেরিত উট ও খেজুর যখন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পেশ করলেন তখন তিনি বললেনঃ হে কায়স! তোমার পিতা তোমাকে ঘোড় সওয়ার করে পাঠিয়েছেন, মুজাহিদদের শক্তিশালী করেছেন এবং শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মদীনা পাহারা দিয়েছেন। তারপর তিনি দু’আ করেনঃ হে আল্লাহ! সা’দ ও তার পরিবার-পরিজনের ওপর রহম করুন! সা’দ ইবন ’উবাদা কতই না ভালো মানুষ। তখন খাযরাজ গোত্রের লোকেরা বলে ওঠেঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি আমাদের খান্দানের লোক, আমাদের নেতা এবং নেতার ছেলে। (তারীখে ইবন আসাকির- ৬/৮৮; তাবাকাতঃ মাগাযী- ৫৮)
হিজরী ৭ম সনে খাইবার যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনীতে তিনটি ঝান্ডা ছিল। তার একটি ছিল সা’দ ইবন ’উবাদার হাতে। (তাবাকাতঃ মাগাযী- ৭৭) তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূল সা. সাহাবায়ে কিরামের নিকট বস্তুগত সাহায্যের আবেদন জানালে অন্যদের মত সা’দ ইবন ’উবাদাও তাঁর হাতে বিপুল অর্থ তুলে দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪২১; দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ১১/৩২)

মক্কা বিজয়ের দিন খোদ রাসূলুল্লাহর সা. ঝান্ডাটি হযরত সা’দের হাতে ছিল। মুসলিম সৈনিকদের একটি দল ‘কাদায়া’র দিক দিয়ে শহরে প্রবেশ করছিল। আবু সুফইয়ান হযরত ’আব্বাসের সাথে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি এর আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আনসারদের একটি দলের পুরোভাগে ছিলেন সা’দ ইবন ’উবাদা। তাদের দৃপ্ত ভঙ্গিতে চলা দেখে আবু সুফইয়ানের দু’ চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তিনি ’আব্বাসকে জিজ্ঞেস করেনঃ এ কারা? আব্বাস জবাব দিলেনঃ আনসার। এদের কমান্ডার সা’দ ইবন ’উবাদা। ঝান্ডা তাঁরই হাতে।

সা’দ আবু সুফইয়ানের কাছাকাছি এসে তাঁকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে বলে ওঠেন, ‘দেখবে আজ কেমন তুমুল যুদ্ধ হয়। আজ কা’বা হালাল (রক্তপাত বৈধ) হয়ে যাবে।’ একথা শুনে আবু সুফইয়ানের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়। তিনি ’আব্বাসকে বলেন, ‘আজ তো তুমুল লড়াই হবে।’ সা’দের বাহিনী অতিক্রমের পরই রাসূলুল্লাহর সা. দলটি উপস্থিত হয়। তাঁকে দেখে আবু সুফইয়ান চেঁচিয়ে বলে উঠেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার সম্প্রদায়ের প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ আপনাকে দয়ালু ও সৎকর্মশীল করে সৃষ্টি করেছেন। সা’দ আমাকে ভয় দেখিয়ে গেছে। আজ নাকি ঘোরতর যুদ্ধ হবে, কুরাইশদের বিনাশ ঘটবে। আবু সুফইয়ানের কথা সমর্থন করে আরও কয়েকজন একই কথা বললেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে হযরত ’উমার সা’দের কথা শুনে তা রাসূলকে সা. অবহিত করেন। হযরত ’উসমান ও হযরত ’আবদুর রহমান ইবন ’আউফ বললেনঃ ‘আমাদের ভয় হচ্ছে, সা’দের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে না ওঠে।’ দার্রার ইবন খাত্তাব আল-ফিহ্রী একটি কবিতা আবৃত্তিও করলেন। এক ব্যক্তি তাঁকে বললেন, রাসূলুল্লাহর সা. সামনে গিয়ে কবিতার মাধ্যমে ফরিয়াদ কর। দার্রারের সেই সব কবিতার অংশবিশেষ ‘আল-ইসতী’য়াব’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তাঁর একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি নিম্নরূপঃ
‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট কুরাইশরা এমন সময় আশ্রয় নিয়েছে যখন তাদের আর কোন আশ্রয় স্থল নেই, আর দুনিয়া প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও যখন তাদের জন্য শংকীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং আসমানের আল্লাহ তাদের শত্রু হয়ে গেছে। সা’দ মক্কাবাসীদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছে।’

কবিতা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ ‘সা’দ ঠিক বলেনি। আজ কা’বার সম্মান আরও বৃদ্ধি পাবে। তার গায়ে গিলাফ চড়ানো হবে।’ তিনি আলীকে রা. বললেন, ‘তুমি ছুটে যাও। সা’দের হাত থেকে ঝান্ডাটি নিয়ে তার ছেলে কায়সের হাতে দাও। আলী ছুটে গিয়ে ঝান্ডাটি চাইলেন। সা’দ তা দিতে অস্বীকার করে বললেন, সত্যিই যে রাসূল সা. তোমাকে পাঠিয়েছেন তার প্রমাণ কি? রাসূল সা. তাঁর পাগড়ীটি পাঠালেন। তখন সা’দ ঝান্ডাটি নিজের ছেলের হাতে তুলে দিলেন। কিন্তু যে আশঙ্কা সা’দকে নিয়ে ছিল, একই আশঙ্কা তাঁর ছেলেকে নিয়েও দেখা দিল। আবেদন জানানো হলোঃ সা’দের ছেলে কায়সের হাত থেকে ঝান্ডাটি অন্য কারও হাতে দেওয়া হোক। তখন রাসূল সা. ঝান্ডাটি নিয়ে যুবাইর ইবনুল ’আওয়ামের হাতে তুলে দেন। সহীহ বুখারীতে যে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহর সা. ঝান্ডা হযরত যুবাইর ইবনুল ’আওয়ামের হাতে ছিল, তার তাৎপর্য এটাই। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪০৬, ৪০৭; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; হায়াতুস সাহাবা- ১/১৬৯; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৩৯; বুখারী- ২/৬১৩; ফাতহুল বারী- ৮/৭)

মক্কা বিজয়ের পর হুনাইন অভিযান পরিচালিত হয়। এতে খাযরাজ গোত্রের ঝান্ডা সা’দের হাতে ছিল। (তাবাকাতঃ মাগাযী- ১০৮) উল্লেখিত যুদ্ধগুলি ছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় উপস্থিতির পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ছোট-বড় যত যুদ্ধ হয়েছে তার সবগুলিতে সা’দ অংশ গ্রহণ করেছিলেন, প্রতিটি অভিযানেই তিনি ছিলেন আনসারদের পতাকাবাহী।

হিজরী ১১ সনে হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাত হয়। প্রাচীন কাল থেকে মদীনার মালিকানা ছিল আনসারদের। ইসলামের সূচনা পর্ব থেকেই তারা রাসূলকে সা. সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছিল। যে সময় ইসলামের কোন আবাসভূমি ছিল না, রাসূল সা. ব্যাকুল হয়ে একটি আশ্রয় খুঁজছিলেন, কুরাইশদের ভয়ে যখন আরবের কোন একটি গোত্র তাঁকে আশ্রয় দিতে দুঃসাহস করেনি তখন আনসারদের ৭২/৭৫ জনের একটি দল মক্কায় এসে আরব-আজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শর্তে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’যাত (শপথ) করেন এবং সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে রাসূলকে সা. মদীনায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবনকালে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তাতে জীবন ও সম্পদ কুরবানীর দিক দিয়ে আনসাররা ছিল সকলের অগ্রগামী। হযরত কাতাদা বলতেন, আরব গোত্রসমূহের মধ্যে কোন একটি গোত্র আনসারদের সমসংখ্যক শহীদ উপস্থাপন করতে পারবে না। আমি আনাসের নিকট শুনেছি, উহুদে সত্তর জন, বীরে মা’উনায় সত্তর জন এবং ইয়ামামায় সত্তর জন আনসার শাহাদাত বরণ করেন। (বুখারী- ২/৫৮৪; সীয়ারে আনসার- ২/২৭) তাছাড়া কুরআনের বহু আয়াত এবং রাসূলুল্লাহর সা. বহু হাদীসে আনসারদের অনেক ফজীলাত ও মর্যাদা ঘোষিত হয়েছে। এসব কারণে তাদের অন্তরে খিলাফতের নেতৃত্বলাভ করার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হওয়া ছিল অতি স্বাভাবিক।

মদীনার আনসারগণ সেই প্রাচীনকাল থেকে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি গোত্রে বিভক্ত ছিল। গোত্র দু’টি আউস ও খাযরাজ। লোকসংখ্যা ও নেতৃত্বের দিক দিয়ে খাযরাজ গোত্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে একটু বেশী বরেণ্য। এর নেতা সা’দ ইবন ’উবাদা। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা. মনোনীত দ্বাদশ নাকীবের অন্যতম। অপর দিকে সা’দ ইবন মু’য়াজ ছিলেন আউস গোত্রের নেতা। তবে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জীবনকালে উহুদ যুদ্ধের পর মদীনায় ইনতিকাল করেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের সময় সা’দ ইবন ’উবাদা মদীনার আনসার সম্প্রদায়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা।

সা’দ ইবন ’উবাদার বাড়ীটি ছিল মদীনার বাজার সংলগ্ন। তাঁর ঘরের সাথেই ছিল একটি ছাউনী। এর মালিকানা ছিল খাযরাজ গোত্রের বনী সায়িদা শাখার লোকদের। এ জন্য তা ‘সাকীফা বনী সায়িদা’ নামে প্রসিদ্ধ। এটাকে আনসাররা মক্কার ‘দারুন নাদওয়ার’ মত পরামর্শ গৃহ হিসাবে ব্যবহার করতো।
হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে আউস ও খাযরাজ গোত্রের বিশিষ্ট আনসারগণ উক্ত সাকীফায় সমবেত হলেন। সা’দ উবন ’উবাদা তখন ভীষণ অসুস্থ। রোকেরা তাঁকেও ধরাধরি করে মঞ্চে এনে বসিয়ে দিল। তিনি বালিশে হেলান ও কাপড় মুড়ি দিয়ে বসলেন। তাদের এই সমাবেশের উদ্দেশ্য, আনসারদের মধ্য থেকেই রাসূলুল্লাহর সা. একজন খলীফা নির্বাচন। সা’দ ইবন ’উবাদা সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দিতে চাইলেন। তিনি নিকটতম লোকদের বললেন, আমার আওয়াজ হয়তো সবার কানে পৌঁছবে না। আমি যা বলবো তোমরা তা জোর গলায় সবার কানে পৌঁছে দেবে। তারপর তিনি আনসারদের মর্যাদা, কার্যাবলী, রাসূলুল্লাহর সা. সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদি দিক তুলে ধরে একটি ভাষণ দান করেন। ভাষণটির সারকথা ছিল এরূপঃ

‘আনসারদের যে সম্মান এবং দীনের ক্ষেত্রে যে অগ্রগামিতা তা আরবের আর কোন গোত্রের নেই। রাসূল সা. দশ বছরের বেশী সময় ধরে নিজ গোত্রে ছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনেনি। যাঁরা শুনেছিলেন তাঁদের সংখ্যাও অতি নগণ্য। তাঁদের না ছিল রাসূলকে সা. নিরাপত্তা দানের শক্তি, আর না ছিল তাঁদের দীনের আওয়াজ বুলন্দ করার ক্ষমতা। তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা বিধানেই ছিল অক্ষম।

আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের সম্মানিত করতে চাইলেন। তাই তিনি তোমাদেরকে এক সাথে দু’টি উপাদান সরবরাহ করলেন। তোমরা ঈমান আনলে, রাসূল সা. ও তাঁর সাহাবাদের আশ্রয় দিলে এবং নিজেদের থেকেও আল্লাহর রাসূলকে সা. প্রিয় মনে করলেও তাঁর বিরুদ্ধেবাদীদের সাথে জিহাদ করলে। শেষ পর্যন্ত গোটা আরব ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে নেয় এবং নিকট ও দূরের সকলেই মস্তক অবনত করে দেয়। সুতরাং এই বিজিত অঞ্চলের সবটুকু তোমাদের তলোয়ারের নিকট দায়বদ্ধ।

রাসূলুল্লাহ সা. আজীবন তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন এবং ওফাতের সময় সন্তুষ্ট চিত্তে বিদায় নিয়েছেন। এ সকল কারণে এ খিলাফতের একমাত্র হকদার তোমরা এবং এ ব্যাপারে আর কেউ তোমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেনা।’

তাঁর ভাষণ শেষ হলে উপস্থিত আনসারমন্ডলী সমবেত কণ্ঠে বলে উঠলো, আপনার কথা খুবই যুক্তিসম্মত। আমাদের মতে এ পদের জন্য আপনার চেয়ে অধিকতর যোগ্য আর কেউ নেই। আমরা আপনাকেই খলীফা বানাতে চাই। তারপর নিজেদের মধ্যে আলোচনা চললো। একজন বললো, যদি মুহাজিররা মানতে অস্বীকার করে তাহলে তাদের কি জবাব দেওয়া যাবে? অন্য একজন তাকে বললো, আমরা তখন তাদেরকে বলবো, তাহলে আমীর দু’জন হবে- একজন আমাদের আর একজন তোমাদের। এছাড়া আর কিছুতেই আমরা রাজী হবো না। তার একথা শুনে সা’দ মন্তব্য করেনঃ এ হলো প্রথম দুর্বলতা। এদিকে আনসারদের এ সমাবেশের কথা হযরত ’উমারের রা. কানে পৌঁছে গেল। তিনি হযরত আবু বকরকে রা. সংগে নিয়ে সাকীফা বনী সায়িদার সমাবেশে উপস্থিত হলেন। হযরত ’উমারের রা. কঠোর প্রকৃতি আনসারদের উত্তেজিত করে তুললো। আনসারী বক্তারাও বারবাপর উত্তেজনামূলক বক্তৃতা করছিল। হযরত ’উমার রা. এবং তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি, এমন কি তরবারির ভয়-ভীতি দেখানো পর্যন্ত পৌঁছে। অবস্থা বেগতিক দেখে ধীর স্থির প্রকৃতির মানুষ হযরত আবু বকর রা. ’উমারকে রা. নিবৃত করেন এবং নিজেই এক আবেগময় ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সেই বিখ্যাত বাণী- ‘আল আয়িমম্মাতু মিন কুরাইশ’- ইমাম হবে কুরাইশদের ভিতর থেকে- উল্লেখ করেন। ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সমাবেশের রূপ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তারপর হযরত ’উমার রা. দাঁড়িয়ে আবু বকরের রা. ফজীলাত ও মর্যাদা বর্ণনা করেন। সেই বর্ণনা শুনে আনসাররা চেঁচেয়ে বলতে থাকে- ‘না’উযুবিল্লাহ আন নাতাকাদ্দামা আবা বকর’- আবু বকরের আগে যাওয়ার ব্যাপারে আমরা আল্লাহর পানাহ চাই।

’উমারের ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে মুহাজিরদের মধ্য থেকে যথাক্রমে ’উমার, আবু ’উবাইদা এবং আনসারদের মধ্য থেকে খাযরাজ গোত্রের বাশীর ইবন সা’দ সর্বপ্রথম প্রথম আবু বকরের হাত স্পর্শ করে বা’ইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন। তারপর সমবেত জনতা বা’ইয়াতের উদ্দেশ্যে একযোগে দাঁড়িয়ে গেলে লোকেরা এই বলে চেঁচাতে শুরু করে যে, সাবধান! সা’দ যেন পায়ে পিষে না যায়। একথা শুনে ’উমার রা. বললেনঃ আল্লাহ তাকে পিষে ফেলুক। এমনিতেই সা’দ নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনায় জর্জরিত হচ্ছিলেন। ’উমারের একথায় তিনি দারুণ ক্ষুব্ধ হয়ে লোকদের বললেনঃ তোমরা আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। (দ্রঃ মুসনাদ- ১/২১; তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যা- ১/১৬৮, ১৬৯; তাবারীঃ হিজরী ১১ সনের ঘটনাবলী- ১৮৪৩; বুখারী- ২/১০১০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১২-১৮)

আল্লামা যিরিক্লী ‘ফিল বুদয়ি ওয়াত তারীখ’ (৫/১৩২) গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলমানরা যখন আবু বকর রা. উদ্ধৃত হাদীস ‘আল-আয়িম্মাতু মিন কুরাইশ’ মেনে নিয়ে তাঁকেই খলীফা নির্বাচন করে তখন সা’দ বলেনঃ ‘লা ওয়াল্লাহ্! লা উবায়ি’উ কুরাশিয়্যাম আবাদা’- আল্লাহর কসম, না। আমি কক্ষণো কোন কুরাইশীর হাতে বা’ইয়াত করবো না। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৫)

বেশ কিছু দিন খলীফা হযরত আবু বকর রা. তাঁকে কোন রকম ঘাঁটাঘাঁটি করলেন না। শেষে একদিন এক ব্যক্তিকে বলে পাঠালেন যে, সা’দ যেন এসে বাই’য়াত করে যান। সা’দ বাই’য়াত করতে সরাসরি অস্বীকার করলেন। হযরত ’উমার রা. খলীফাকে বললেন, তাঁর থেকে আপনি অবশ্যই বাই’য়াত নিন। সেখানে হযরত বাশীর ইবন সা’দ আল-আনসারীও ছিলেন। তিনি বললেন, একবার যখন তিনি বাই’য়াত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তখন আর কোন ভাবেই তাঁর থেকে বাই’য়াত নেওয়া যাবেনা। চাপাচাপি করলে রক্তারক্তির পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। তিনি রুখে দাঁড়ালে তাঁর পরিবার ও বংশের লোকেরাও তাঁর পাশে এসে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত গোটা খাযরাজ গোত্রই তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে যাবে। এভাবে একটি ঘুমন্ত ফিত্না জাগিয়ে তোলা উচিত হবে না। আমার মতে তাঁকে থাকতে দিন, একটি লোক কী আর করবে? বাশীরের এ মত সবাই পছন্দ করলেন। হযরত সা’দ রা. খলীফা হযরত আবু বকরের রা. খিলাফতের শেষ পর্যন্ত মদীনায় ছিলেন। অবশেষে মদীনা ছেড়ে শামে চলে যান এবং দিমাশ্কের নিকটবর্তী- ‘হাওরান’ নামক একটি উর্বর ও সবুজ স্থান বসবাসের জন্য নির্বাচন করেন। আমরণ সেখানেই বসবাস করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮৪; আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৮৯; তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৯০)

হযরত সা’দের মদীনা ত্যাগের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, হযরত ’উমার রা. খলীফা হওয়ার পর বাই’য়াত থেকে দূরে থাকার জন্য একবার তাঁকে তিরস্কার করেন। জবাবে সা’দ বলেনঃ আপনার বন্ধু আবু বকর আমার কাছে আপনার চেয়ে বেশী পছন্দনীয় ছিলেন। আল্লাহর কসম! আপনার প্রতিবেশীত্ব আমাকে অতিষ্ট করে তুলেছে। ’উমার বলেনঃ কেউ তার প্রতিবেশীকে পছন্দ না করলে দূরে সরে যেতে পারে। এরপর সা’দ কালবিলম্ব না করে শামে চলে যান। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৫; তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪)

হযরত সা’দ ইবন ’উবাদার মৃত্যু সন নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। বিভিন্ন গ্রন্থে হিজরী ১১, ১৪ ও ১৫ সনের কথা উল্লেখ আছে। ইবন আসাকির হিজরী ১৪ সনটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন। (তারীখ- ৬/৯১) আবু ’উবাইদ কাসেম ইবন সাল্লামের মথে তিনি ‘হাওরানে’ মারা যান। এবং সেখানেই দাফন করা হয়। আর দিমাশ্কের ‘আল-মুনীহা’ নামক স্থানে তাঁর যে কবরের কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে ইবন আসাকির তা সঠিক বলে মনে করেননি। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৯১; আল-ইসতী’য়াব; টীকা আল-ইসাবা- ২/৪০; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪)

হযরত সা’দ ইবন ’উবাদার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। এ হত্যা সম্পর্কে নানা রকম বর্ণনা ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। বালাজুরী বলেনঃ সা’দ ইবন ’উবাদা শামে হিজরাত করেন এবং সেখানে নিহত হন। তিনি আবু বকরের হাতে বাই’য়াত করেননি। ’উমার রা. তাঁর কাছে একজন লোক পাঠান। তাঁকে বলে দেন তাঁকে বাই’য়াত করতে বলবে। যদি অস্বীকার করে তাহলে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। লোকটি শামে গেল এবং সা’দকে ‘হাওরানের’ একটি প্রাচীর বেষ্টিত উদ্যানে পেল। সে তাঁকে বাই’য়াত করতে বললো। তিনি বললেনঃ আমি কোন কুরাইশর হাতে বাই’য়াত করবো না। লোকটি বললোঃ তাহলে আমি আপনাকে হত্যা করবো। তিনি বললেনঃ আমাকে হত্যা করলেও আমি বাই’য়াত করবো না। লোকটি তখন বললোঃ তাহলে গোটা উম্মাত যাতে ঢুকেছে আপনি কি তার বাইরে? বললেন’ বাই’য়াতের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি তাদের বাইরে।
লোকটি তখন তীর নিক্ষেপ করে তাঁকে হত্যা করে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৮৯) ডঃ হামীদুল্লাহ বলেন, এটা চরমপন্থী শিয়াদের একটি মনগড়া কথা। (আনসাবুল আশরাফঃ টীকা- ১/২৫০) অন্য একটি বর্ণনা মতে, কেউ তাঁকে হত্যা করে গোসল খানায় ফেলে রাখে। বাড়ীর লোকেরা যখন দেখতে পায় তখন তাঁর প্রাণ স্পন্দন থেমে গেছে। তাঁর সারা দেহ নীল হয়ে যায়। ঘাতকের সন্ধান করেও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। শুধু দূর থেকে ভেসে আসা কবিতার একটি চরণ আবৃত্তির শব্দ শোনা যায়, যার অর্থ এরূপঃ ‘আমরা খাযরাজ নেতা সা’দ ইবন ’উবাদাকে হত্যা করেছি। আমরা দুইটি তীর নিক্ষেপ করেছি এবং তাঁর কলিজা ভেদ করতে ভুল করিনি।’ যেহেতু ঘাতকের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি এবং শব্দ শোনা গেছে, এজন্য অনেকের ধারণা হয়েছিল যে, তাঁকে জ্বীনে হত্যা করেছে। (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৫; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৪০; আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫০)
হযরত সা’দের দুই স্ত্রী ছিল- গাযিয়্যা বিনতু সা’দ ইবন খলীফা ও ফুকাইহা বিনতু ’উবায়েদ ইবন দুলাইম। ফুকাইহা ছিলেন সা’দের চাচাতো বোন। তিনি সাহাবিয়্যাও ছিলেন। গাযিয়্যার গর্ভে সা’দের তিন ছেলে সা’ঈদ, মুহাম্মাদ ও আবদুর রহমান এবং ফুকাইহার গর্ভে দুই ছেলে কায়স, সাদুস ও এক মেয়ে উমামা জন্মগ্রহণ করেন। (তাবাকাত- ৩/৬১৩; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৫৩৮)

হযরত সা’দের প্রচুর বিষয় সম্পত্তি ছিল, মদীনা ত্যাগের পর সবই ছেলে মেয়েদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেন। এক ছেলে তখন পেটে। তিনি তার অংশ দিয়ে যাননি। সে ভূমিষ্ট হওয়ার পর ’উমার রা. কায়সকে ডেকে বলেন, তুমি তোমার পিতার ভাগ বাতিল করে দাও। কারণ, মৃত্যুর পর তাঁর একটি ছেলে হয়েছে। কায়েস বললেন, আমার পিতার ভাগ ঠিক থাকবে। তবে ইচ্ছা করলে সে আমার অংশটি নিতে পারে। (আল-ইসতীয়াব- ২/৫৩৯)
হযরত সা’দের বাড়ীটি ছিল মদীনার বাজারের শেষ প্রান্তে। সেখানে একটি মসজিদ ও কয়েকটি দুর্গও ছিল। বনু হারিস পল্লীতে তাঁর আর একটি বাড়ী ছিল। (খুলাসাতুল ওফা’- ৮৮)

হযরত রাসূলে কারীমের রা. হাদীসের প্রতি সা’দ অসাধারণ গুরুত্ব দিতেন। সাহাবীদের যুগে ব্যাপকভাবে লেখালেখি শুরু হয়ে যায়। কুরআন ও লেখা হয়েছিল। তাসত্ত্বেও হাদীস লেখার ব্যাপক প্রচলন তখন হয়নি। তবে সা’দ হাদীস লিখেছিলেন। মুসনাদে ইমাম আহমাদে এ রকম একটি বর্ণনা এসেছেঃ ‘কায়স ইবন সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর পিতা সা’দ থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা এ হাদীসটি সা’দ ইবন ’উবাদার পুস্তক বা পুস্তকসমূহে পেয়েছেন।’ (মুসনাদ- ৫/২৮৫) হযরত সা’দ হাদীস লেখার সাথে সাথে তা শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রচারও করেন। একারণে তাঁর ছেলে কায়স ও সাঈদ, পৌত্র শুরাহবীল, প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস আবু ’উমামা ইবন সাহ্ল, তাবে’ঈ ইবন মুসায়্যিব প্রমুখ ব্যক্তিগণ তাঁর থেকে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪)

হযরত সা’দের চরিত্রে দানশীলতার গুণটির চরম বিকাশ ঘটেছিল। ‘আসমাউর রিজাল’ শাস্ত্রকারদের প্রায় প্রত্যেকে তাঁর চরিত্র রূপায়ণ করতে গিয়ে বলেছেনঃ ‘তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল’। শুধু তিনি নন, পুরুষানুক্রমে তাঁরা ছিলেন আরবের বিখ্যাত দানশীল। তাঁর চার পুরুষ বদান্যতার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিল। এমন গৌরব সে যুগে খুব কম লোকেরই ছিল। তার দাদা দুলাইম, পিতা ’উবাদা, পুত্র কায়স এবং তিনি নিজে- প্রত্যেকেই ছিলেন আপন আপন সময়ের বিখ্যাত জনহিতৈষী ও অতিথি সেবক। (আল-ইসতীয়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৬)

তাঁর দাদার সময় আতিথেয়তা এত ব্যাপক ছিল যে, একজন ঘোষক দূর্গের চূড়ায় উঠে চিৎকার করে আহ্বান জানাতো, যারা গোশ্ত, চর্বি ও উপাদেয় খাবার খেতে চায় তারা যেন আমাদের অতিথি হয়। হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. একবার সা’দের দুর্গের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নাফে’কে ডেকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলেন, এ হচ্ছে সা’দের দাদার দুর্গ। একজন ঘোষক এ দূর্গের চূড়ায় উঠে ঘোষণা করতোঃ কেউ চর্বি-গোশ্ত খেতে চাইলে দুলাইমের বাড়ীতে এসো। দুলাইম মারা গেলে তাঁর ছেলে ’উবাদার সময়েও একই রকম ঘোষনা দেওয়া হতো। সা’দের সময়ও এ ধারা অব্যাহত থাকে। আমি সা’দের ছেলে কায়সকেও একই রকম করতে দেখেছি। কায়স ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল। (আল-ইসতী’য়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৬-৩৭)

প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত ’উরওয়া ইবন যুবাইর বলেনঃ আমি সা’দ ইবন ’উবাদাকে তাঁর দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দিতে দেখেছিঃ কেউ চর্বি ও গোশ্ত পছন্দ করলে সা’দ ইবন ’উবাদার বাড়ীতে এসো। তারপর তাঁর ছেলেকেও আমি একই রকম করতে দেখেছি। যৌবনে একদিন আমি মদীনার রাস্তায় হাঁটছি। এমন সময় ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার আমার পাশ দিয়ে ’আওয়ালীতে তাঁর ক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছিলেন। আমাকে বললেনঃ বালক, দেখতো সা’দ ইবন ’উবাদার দুর্গের ওপর থেকে কেউ আহ্বান জানাচ্ছে কিনা। আমি তাকিয়ে দেখে বললামঃ না। তিনি বললেনঃ তুমি ঠিকই বলেছ। (তাবাকাত- ৩/৬১৩; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯) এমন ব্যাপক আতিথেয়তা ও দানশীলতা বনী সা’য়িদাকে মদীনার ‘হাতেম’ বানিয়ে দিয়েছিল।
ইসলাম ও হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি সা’দের বদান্যতার অনেক মুখরোচক কাহিনী বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানে দু’একটি সত্য কাহিনী সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন হিজরাত করে মদীনায় আসলেন তখন সা’দের বাড়ী থেকে রাসূল সা. ও তাঁর পরিবারের জন্য প্রতিদিন নিয়মিত খাবার আসতো। প্রতিদিন বড় এক গামলা গোশ্ত অথবা দুধের সারীদ অথবা সিরকা ও তেল বা ঘিয়ের সালীদ আসতো, এই পাত্রটি রাসূল সা. ও তাঁর সহধর্মিনীদের গৃহে চক্কর দিত। (আল-ইসাবা- ২/৩০; তাবাকাত- ৩/৬১৪; হায়াতুস সাহাবা- ২/৭০০)

একবার সা’দ ইবন ’উবাদা হযরত রাসূলে কারীমের সা. জন্য বরতন ভর্তি রান্না করা মগজ নিয়ে আসলেন। রাসূল সা. বললেনঃ এটা কি? সা’দ বললেনঃ যিনি সত্য সহকারে আপনাকে পাঠিয়েছেন সে সত্তার নামে শপথ, আমি আজ ৪০টি তাজা-মোটা উট নহর (জবেহ) করেছি। আমার ইচ্ছা হলো আপনাকে একটু পেট ভরে মগজ খাওয়াই। রাসূল সা. খেলেন এবং তাঁর কল্যাণ কামনা করে দু’আ করলেন। (কানযুল ’উম্মাহ- ৭/৪০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯)
সাহাবীদের ‘আসহাবে সুফ্ফা’ নামে একটি দল ছিল। যাঁরা বহু দূর-দূরান্ত থেকে ঘর-বাড়ী ছেড়ে মদীনায় এসেছিলেন। তাদের এখান আসা ও অবস্থানের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ’উলম হাসিল এবং দীনের প্রশিক্ষণ লাভ করা। রাসূল সা. তাদেরকে সচ্ছল সাহাবীদের সাথে সম্পৃক্ত করে দিতেন। অন্যরা যেখানে দুই একজন করে সাথে নিয়ে যেতেন, সেখানে হযরত সা’দ প্রতিদিন সন্ধ্যায় ৮০ জনকে আহার করানো জন্য নিয়ে যেতেন। (আল-ইসাবা- ২/৩০; কানযুল ’উম্মাল- ৫/১৯০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৯৬)

ইয়াহইয়া ইবন ’আবদুল ’আযীয থেকে বর্ণিত আছে। সা’দ ইবন ’উবাদা ও তাঁর ছেলে কায়স ইবন সা’দ পালাক্রমে জিহাদে যেতেন। একবার সা’দ লোকদের সাথে জিহাদে গেলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট বাইরের অনেক অতিথি এলো। সেনা শিবিরে বসে সা’দ একথা জানতে পেয়ে বললেনঃ কায়স যদি আমার ছেলে হয় তাহলে আমার দাস নিস্তাসকে ডেকে বলবে, চাবি দাও, আমি রাসূলুল্লাহর সা. প্রয়োজন মেটানোর জন্য খাবার বের করে নিই। তখন হযতো নিস্তাস বলবেঃ তোমার আব্বা চিঠি নিয়ে এসো। এতে কায়স হয়তো ক্ষেপে গিয়ে তার নামে ঘুষি মেরে চাবিটি ছিনিয়ে নেবে এবং রাসূলুল্লাহর সা. প্রয়োজন মত খাদ্য বের করে নেবে। আসলে ব্যাপারটিও তাই হয়েছে। সেবার কায়স রাসূলুল্লাহর সা. জন্য এক শো ওয়াসক খাদ্য নিয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২০০)

ওয়াকিদী বলেনঃ বিদায় হজ্জের সময় একদিন হযরত রাসূলে কারীমের সা. ভারবাহী পশুটি হারিয়ে গেল। সা’দ ও কায়স সাথে সাথে একটি পশু নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে। আল্লাহ তাঁর পশুটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সা’দ আরজ করলেন। ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা জেনেছি, আপনার পশুটি হারিয়ে গেছে। তাই এ পশুটি নিয়ে এসেছি। রাসুল সা. বললেনঃ আল্লাহ আমার বাহনটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তোমরা এটি নিয়ে যাও। আল্লাহ তোমাদের বরকত দিন। ওহে আবু সাবিত! আমি মদীনায় আসার পর থেকে তোমরা যে সমাদর করেছ তাকি যথেষ্ট নয়? সা’দ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের সম্পদ থেকে যা আপনি গ্রহণ করেন না তার চেয়ে যা কিছু আপনি গ্রহণ করেন তাই আমাদের নিকট অধিকতর প্রিয়। রাসুল সা. তাঁর কথা সমর্থন করে বলেনঃ আবু সাবিত! সত্য বলেছ। সুসংবাদ লও। তুমি সফলকাম হয়েছ। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৮৮)

হযরত ইবন ’আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। সা’দ ইবন ’উবাদা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট জানতে চান যে, তাঁর মা একটি মান্নত মেনেছিলেন; কিন্তু তা পূরণ না করেই মারা গেছেন। এখন তিনি কি তা পূরণ করে দেবেন? রাসূল সা. তাঁকে পুরণ করে দিতে বলেন। এমনিভাবে তাঁর মা’র পক্ষ থেকে সাদাকা করার কথা জিজ্ঞেস করলে রাসূল সা. তাঁকে বলেনঃ হাঁ তুমি তা করতে পার। তখন সা’দ রাসূলকে সা. সাক্ষী রেখে তাঁর ‘আল-মিখরাফ’ বাগিচাটি দান করার কথা ঘোষণা করেন। সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণিত হয়েছে। সা’দ তাঁর মা’র মৃত্যুর পর একবার রাসূলকে সা. জিজ্ঞেস করেনঃ কোন সাদাকা সবচেয়ে ভালো? তিনি বলেনঃ তুমি মানুষকে পানি পান করাও।

সা’দ মদীনার মসজিদে তাঁর মায়ের নামে পানি পানের ব্যবস্থা করেন। যা বহু দিন যাবত ‘সিকায়া আলে সা’দ’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। একবার এক ব্যক্তি হযরত হাসানের রা. নিকট জানতে চায় যে, সা’দের মায়ের নামে যে পানির ব্যবস্থা তাতো সাদাকা। সে পানি কি আমি পান করতে পারি? হাসান রা. জবাব দিলেনঃ আবু বকর ও ’উমার যখন পান করেছেন তখন তোমার আপত্তি কিসে? (তাবাকাত- ৩/৬১৪, ৬১৫; মুসনাদে ইমাম আহমাদ- ৫/২৮৫)
‘জাতুল ফুদুল’ নামে সা’দ ইবন ’উবাদার একটি বর্ম ছিল। রাসূল সা. যে দিন বদরের উদ্দেশ্যে বের হন, সা’দ বর্মটি তাঁকে দান করেন। সেই সাথে ‘আল-আদব’ নামে একখানি তরবারিও দান করেন। এ দু’টি যুদ্ধাস্ত্র রাসূল সা. বদরে ব্যবহার করেন। এই বদরে রাসূল সা. ‘জুল-ফিকার’ তরবারিটি গনীমাত হিসাবে লাভ করেন। ওয়াকিদীর মতে ঐ তরবারিটি ছিল কাফির সৈনিক মুনাব্বিহ অথবা নাবীহ্ ইবন হাজ্জাজের। কালবীর মতে আল-আ’স ইবন মুনাব্বিহ্ ইবন হাজ্জাজের। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫২১)

ইবন ’আসাকির হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার সা’দ ইবন ’উবাদা নবী কারীমকে সা. আহারের দা’ওয়াত দিলেন। তিনি উপস্থিত হলে সা’দ খেজুর ও হাড়সহ গোশ্ত হাজির করলেন। রাসুল সা. তা খেলেন এবং এক পেয়ালা দুধও পান করলেন। শেষে বললেনঃ নেক্কার লোকেরা তোমার খাবার খেয়েছে, রোযাদাররা ইফ্তার করেছেন এবং ফিরিশ্তারা তোমাদের জন্য দু’আ করেছেন। হে আল্লাহ! সা’দ ইবন ’উবাদার পরিবার-পরিচনের ওপর রহমত বর্ষন করুন। (কানযুল ’উম্মাহ- ৫/৬৬; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯, ৩৬৪)

এভাবে হযরত সা’দের আতিথেয়তা, দানশীলতা, উদারতা ও বদান্যতার বহু কথা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়।

রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি হযরত সা’দের ভালোবাসার রূপ এমন ছিল যে, রাসুল সা. সম্পর্কে তাঁর গোত্রের অতি গোপন কথাটিও তিনি তাঁর নিকট পৌঁছে দিতেন। হাওয়াযিন যুদ্ধের সময় রাসুল সা. ‘তালীফে কুলুবের’ জন্য কুরাইশ বংশের নও মুসলিমদেরকে গনীমতের বড় বড় অংশ দিলেন এবং আনসারদেরকে কিছুই দিলেন না। এতে অনেক আনসার যুবক ক্ষুব্ধ হয়ে বললোঃ রাসূল সা. স্বগোত্রীয় লোকদের দিলেন এবং আমাদেরকে মাহরূম করলেন। অথচঃ আমাদের তরবারি হতে এখনো কুরাইশদের রক্ত ঝরছে। সা’দ ইবন ’উবাদা সাথে সাথে বিষয়টি জানিয়ে দিলেন। তিনি সা’দকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার মত কি? বললেনঃ আমিও আমার সম্প্রদায়ের একজন। তবে এমন কথা বলিনা। রাসুল সা. তাঁকে বললেনঃ যাও, লোকদের অমুক তাঁবুতে সমবেত কর। ঘোষণা শুনে মুহাজির ও আনসার উভয় সম্প্রদায়ের লোক উপস্থিত হলো। সা’দ শুধু আনসারদের থাকতে বলে মুহাজিরদের চলে যেতে বললেন। তারপর রাসুল সা. এসে এক আবেগময় ভাষণ দান করলেন। সে ভাষয়ের কিছু অংশ ছিল এরূপঃ তোমরা কি এতে খুশী নও যে, অন্যরা ধন-সম্পদ নিয়ে ফিরে যাক, আর তোমরা আমাকে নিয়ে ফিরবে? রাসূলুল্লাহর সা. এমন প্রশ্নে সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সমস্বরে তারা জবাব দেয়, আপনার পরিবর্তে গোটা দুনিয়া কিছুই না। (বুখারী- ২/৬২০; মুসনাদ- ৩/৭২০; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৯৮, ৪৯৯; হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৯৮)
উহুদ যুদ্ধের সময় গোটা মদীনা একটা মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ে। এ সময় সা’দ ইবন ’উবাদা নিজের বাড়ী ছেড়ে রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ী পাহারা দিয়েছিলেন। হযরত রাসুলে কারীমও তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। প্রায়ই তাঁর বাড়ীতে যেতেন। সা’দের ছেলে কায়স বলেনঃ একবার রাসূল সা. আমাদের বাড়ীতে আসলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি সালাম দিলেন। সা’দ সালাম শুনে খুব নিচু স্বরে জবাব দিলেন। কায়স বললেনঃ আপনি কি রাসুলকে সা. ভিতরে আসার অনুমতি দেবেন না? সা’দ বললেনঃ দেরী কর। তাঁকে আমাদের ওপর একটু বেশী করে সালাম দেওয়ার সুযোগ দাও। রাসুল সা. তিনবার সালাম দিয়ে কোন জবাব না পেয়ে ফিরে চললেন। সা’দ তখন দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে ডাক দিয়ে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার সালাম শুনেছি। জবাবও দিয়েছি একটু আস্তে আস্তে। আমি চেয়েছি, আপনি আমাদের ওপর একটু বেশী সালাম দিন। রাসূল সা. সা’দের সাথে আবার ফিরে আসলেন। সেদিন তিনি সা’দের বাড়ীতে আহার করে তাঁর পরিবারের সকলের জন্য দু’আ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/২৮৩; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৯১, ৫১৫; ৩/৩১৪)

একবার রাসুল সা. এক দু’আয় বলেনঃ হে আল্লাহ! আনসারদের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন। বিশেষ করে ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবন হারাম ও সা’দ ইবন ’উবাদাকে।

একবার হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ী গেলেন। তিনি সোজা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইছেন। রাসুল সা. তাঁকে ইশারায় দূরে সরে যেতে বললেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার দরজার সামনে গিয়ে অনুমতি চাইলেন। তখন রাসূল সা. বললেনঃ যখন দরজার সামনেই থাকবে, অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫১৬)

একবার রাসূলুল্লাহ সা. যাকাত আদায়কারী হিসাবে সা’দকে নিয়োগ করলেন। একদিন রাসুল সা. তাঁর কাছে গিয়ে বললেনঃ কিয়ামতের দিন যাতে তোমাকে উট কাঁধে করে উঠতে না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। সা’দ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি তেমন কিছু করি তাহলে সত্যি এমন হবে? তিনি বললেনঃ হাঁ। সা’দ আরজ করলেনঃ আমাকে অব্যাহতি দিন। রাসূল সা. তাঁর আবদেন মঞ্জুর করে অব্যাহতি দান করেন। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৮৯; মুসনাদ- ৫/২৮৫)

একবার হযরত সা’দ অসুস্থ হলে রাসূল সা. সাহাবীদের সংগে করে তাঁকে দেখতে যান। সা’দ অচেতন ছিলেন। সাহাবীদের মধ্য থেকে নানাজনে নানারকম মন্তব্য করলেন। কেউ বললেন, শেষ হয়ে গেছে! কেউ বললেন, না এখনো দম আছে। একথা শুনে রাসুল সা. কেঁদে ফেলেন। সাথে সাথে গোটা মজলিসে কান্না শুরু হয়ে যায। (বুখারী- ২/১৭৪)

আর একবার রাসূল সা. যায়িদ ইবন সাবিতকে বাহনের পিছনে বসিয়ে অসুস্থ সা’দকে দেখতে তাঁর বাড়ী গিয়েছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৬৯)
একবার রাসুল সা. সা’দকে দেখতে যাচ্ছেন। পথে মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল বসে ছিল। সে রাসূলকে সা. কিছু কটু কথা বললো। উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই শুরু হয় হয় অবস্থা। রাসূল সা. সকলকে নিবৃত্ত করলেন এবং সা’দের বাড়ী উপস্থিত হলেন। তিনি বললেনঃ সা’দ! আজ আমাকে আবু হুবাব (ইবন উবাই) যে সব কথা বলেছে তাকি শুনেছ? সা’দ আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! তার অপরাধ ক্ষমা করে দিন। আসল কথা হলো, ইসলাম আসার পূর্বে মানুষ ধারণা করেছিল সে মদীনার বাদশাহ হবে। কিন্তু যখন আল্লাহ আপনাকে সত্য সহকারে পাঠালেন তখন তাদের সে ধারণা চুরমার হয়ে গেল। এটা হলো সেই বেদনার বহিঃপ্রকাশ। এবার রাসুল সা. তাঁর অনুরোধে ইবন উবাইকে ক্ষমা করে দেন। (বুখারী- ২/৬৫৬; হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৯) হযরত সা’দ যে নরম প্রকৃতির ও শান্তিপ্রিয় স্বভাবের ছিলেন উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা তা বুঝা যায়।

ইবন ’আসাকির হযরত যায়িদ ইবন সাবিত থেকে বর্ণনা করেছেন। একদিন সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর ছেলেকে সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট আসলেন। সালাম বিনিময়ের পর রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ এখানে, এখানে। এই বলে তাঁকে ডান পাশে বসালেন। তারপর বললেনঃ মারহাবান বিল আনসার, মারহাবান বিল আনসার- আনসারদের প্রতি স্বাগতম, আনসারদের প্রতি স্বাগতম। ছেলেটি রাসূলুল্লাহর সা. সামনে দাঁড়িয়েছিল। রাসুল সা. বসতে বললেন। সে বসে পড়লো। একটু পরে তিনি তাকে কাছে আসতে বললেন। সে এগিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে ও পায়ে চুমু দিল। রাসূল সা. বললেনঃ আমিও আনসারদের একজন। সা’দ তখন বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন যেমন আপনি আমাদের সম্মান দেখিয়েছেন। রাসূল সা. বললেন, আমার সম্মান দেখানো আগেই আল্লাহ তোমাদের সম্মানিত করেছেন। আমার পরে তোমরা অনেক কষ্ট ভোগ করবে। তখন সবর করবে। অবশেষে হাউজে কাওসারের নিকট আমার সাথে তোমাদের আবার সাক্ষাত হবে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০৪)

হযরত সা’দের একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা মজলিস ছিল। একদিন রাসুল সা. সেখানে গিয়ে কিভাবে রাসূলের সা. ওপর দরূদ ও সালাম পেশ করতে হয় তা শিখিয়েছিলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩১৪)

হযরত সালমান আল-ফারেসী রা. ইসলাম গ্রহণের পর মনিবের হাত থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে তার সাথে একটি চুক্তি করেন। তার একটি শর্ত ছিল, তিনি মনিবকে ৩০০ (তিন শো) খেজুরের চারা লাগিয়ে দেবেন। হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁকে ষাটটি (৬০) চারা দিয়ে সাহায্য করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৮৭)

এক সময় হযরত রাসূলে কারীমের সা. দশটি গর্ভবতী উট ছিল। তার তিনটিই সা’দ তাঁকে দান করেন। তার একটির নাম ছিল ‘মুহরাহ্’। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫১২)

সাফওয়ান ইবন মু’য়াত্তাল বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সা’দ ইবন ’উবাদা পরার জন্য তাঁকে কাপড় দান করেন। সেই কাপড় পরে রাসূলুল্লাহর সা. সামনে গেলে তিনি বলেনঃ যে তাকে কাপড় পরিয়েছে আল্লাহ তাকে জান্নাতের কাপড় পরাবেন। সাফওয়ান তখন বলেনঃ আমাকে সা’দ ইবন ’উবাদা কাপড় দান করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬-৮৯)

হযরত ইবন ’আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। যখন সূরা আন-নূরের ৪ নং আয়াত- ‘যারা সাধ্বী রমনীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি দুর্রা লাগাবে এবং কখনো তাদের সাক্ষী গ্রহণ করবে না। তারাই ফাসিক’- নাযিল হয় তখন সা’দ ইবন ’উবাদা বলে ওঠেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটা এভাবে নাযিল হয়েছেন? তাঁর মধ্যে বিস্ময়ের ভাব দেখে রাসূল সা. বলেনঃ ওহে আনসারগণ! শোন, তোমাদের নেতার কথা শোন। তারা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটা এভাবে নাযিল হয়েছে? তাঁর মধ্যে বিস্ময়ের ভাব দেখে রাসুল সা. বলেনঃ ওহে আনসারগণ! শোন, তোমাদের নেতার কথা শোন। তারা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ তিনি একজন প্রখর আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি। আল্লাহর কসম। তিনি কুমারী ছাড়া কোন মেয়ে বিয়ে করেননি। তেমনিভাবে তাঁর তালাক দেওয়া কোন মহিলাকেও কেউ কখনো বিয়ে করত সাহস করেনি। এর একমাত্র কারণ, তাঁর তীক্ষ্ণ আত্মমর্যাদাবোধ। সা’দ বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি জানি এটি সত্য এবং আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে। কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে, একজন দুরাচারীকে আমার স্ত্রীর সাথে কুকর্ম করতে দেখেও তাকে কিছুই না বলে চারজন সাক্ষীর তালাশে বেরিয়ে যাব এবং তাকে নির্বিঘ্নে তার কুকর্ম শেষ করার সুযোগ করে দেব। আল্লাহর কসম! আমি যখন সাক্ষী নিয়ে ফিরে আসবো তখন তো তার কাজ শেষ হয়ে যাবে।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, সা’দ বলেনঃ কক্ষণো না। সেই সত্তার নামে শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। আমি অবশ্যই তরবারি দিয়ে তাকে হত্যা করবো। তখন রাসূল সা. আনসারদের ডেকে বলেন, শোন তোমাদের নেতার কথা শোন। সে অবশ্যই আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন লোক। তবে তার থেকেও আমি এবং আমার থেকেও আল্লাহ বেশী মর্যাদাবোধের অধিকারী। (দ্রঃ তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৩৮, ৬৩৯)

মালিক থেকে বর্ণিত হয়েছে। যখন আবু ’উবাইদাহ, মু’য়াজ, বিলাল ও সা’দ ইবন ’উবাদার মত প্রথম শ্রেণীর সাহাবীরা শামে গেলেন তখন সেখানে একজন খৃস্টান রাহিব (সাধক) তাদেরকে দেখে মন্তব্য করেনঃ হযরত ’ঈসার যে সকল হাওয়ারীকে (সাথী) শূলীতে চড়ানো হয়েছিল এবং করাত দিয়ে দু’ফালি করে ফেলা হয়েছিল তারাও সংগ্রামে মুহাম্মাদের সা. এ সকল সাহাবীদের সমকক্ষ ছিলেন না। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৯১)

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.