সিরিয়া প্রসঙ্গ : কিছু নির্মম কথা

সিরিয়া। আরবিতে বলে সুরিয়া। সুরিয়া বেশি শ্রুতিমধুর। পুরনো আরবে শাম বলা হয়। আড়াই হাজার বছরের পুরনো শহর দামাস্ক। সিরিয়ার রাজধানী।

আরব বিশ্বের মধ্যবিত্ত একটি দেশ সিরিয়া। তবে, সামরিক, চিকিৎসা ও শিক্ষায় তারা বেশ প্রাগ্রসর ছিল। সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে সিরিয়া মিসরের পরে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ছিল।

সিরিয়া দীর্ঘতম সময় মুসলিম সলতনতের প্রাণকেন্দ্র ছিল। দামাস্ক-অভিমুখী ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক প্রোজ্জ্বল ধারাবাহিকতা ছিল। এখনো ইলমি দুনিয়া ও দানিশমন্দের নক্ষত্রাদির এক উর্বর মহাবিশ্ব সিরিয়ার জমিন।

আরব বসন্ত এসে সিরিয়ায় দোজখের অর্গল খুলে দিয়েছে। আরব বসন্ত আসলেই বসন্ত নাকি বসন্তের ব্যানারে অবাসন্তি মুসিবত?

আমার অনুমান, আরব বসন্ত শুরুতে বসন্ত হয়ে জন্মেছিল। পরে, বসন্ত ছিনতাই হয়ে যায়।

সিরিয়ায় ছয় বছর আগে শুরু হওয়া আগুনের হল্কা সিরিয়ানদের সব কিছু পুড়ে ছাই করে দিয়েছে।

ভিটেমাটি, আশা আকাঙ্ক্ষা, বাঁচার সুযোগ সুবিধা ও ন্যূনতম নিরাপত্তা ও স্বস্তি কিছুই সিরিয়ার মাটিতে অবিশিষ্ট নেই।

পুড়োমাটি ও রক্তাক্ত লাশ ও ধ্বংসস্তুপের হাড়মজ্জার ঢিবিই সিরিয়ার মানচিত্র।

সিরিয়া বর্তমান পৃথিবীর এক নাম্বার সংকট। এমনকি ফিলিস্তিন ইস্যুর চেয়ে আরো অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা সিরিয়া। মিয়ানমার সমস্যার চেয়ে ভয়ানক সমস্যা সিরিয়া।

সিরিয়ার বর্তমান জাহান্নামীয় দজ্জালপনর জন্য দায়ী কারা? এককথায় বললে, আমরা সকলে। জ্বি, আপনি নিষ্পাপও দায়ী।

যারা ইজরাইলের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তারা মাটির সাথে মিশে গেছে। তাদের রাষ্ট্র মিসমার হয়ে গেছে।

ইজরাইল যুদ্ধ করা ছাড়া ইরাক ও সাদ্দামকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। আরো আগে, আফগান চুরমার করেছে। লিবিয়া ও গাদ্দাফিকে সম্পদে বলীয়ান হওয়া সত্ত্বেও নাকানিচোবানি খাইয়ে হাজার বছর পিছিয়ে দিয়েছে।

সিরিয়ার শাসকবংশ আলভি শিয়া। প্রকৃতপ্রস্তাবে তারা মুসলমান নয়। সিরিয়া যে কারণেই হোক, ইজরাইলের বিরোধিতা করত, ফিলিস্তিনকে সহায়তা করত। লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে জায়গা দিয়েছিল।

আজ সেই সিরিয়ানদের শরণার্থী সারা পৃথিবীর বেদুইন!

আমি জানোয়ার আসাদকে সমর্থন করছি না। তবে, অপরিকল্পিত, অপরিণামদর্শী ও অদক্ষ-অবিমিশ্র আরব বসন্তকে সমর্থন করতে পারছি না।

আরব বসন্ত হাইজ্যাক হয়ে ইহুদিদের স্বার্থে অবচেতনে হলেও কাজ করেছে। তাই সিরিয়া আজ পাথরযুগে চলে গেছে।

মিসরে আরব বসন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে চেয়েছিল। ইজরাইল তাতে রক্তপিপাসু সিসিকে দিয়ে বানচাল করে দেয়। সিরিয়া ও ইরাকে সঠিকতর আন্দোলন নষ্ট ও ভ্রষ্ট করার জন্য আইসিসের উত্থান করা হল। এটা আসাদকে টিকাতে সহায়তা করলেও আসাদ টিকবে না।

আবার বিকল্প নেতৃত্বের শূন্যতা স্থায়িত্ব পেল।

কাতার ইজরাইল বিরোধিতা করছে না, করবে না। নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছে। তাতেই ইজরাইল অবরোধ দিয়েছে। প্রকৃত কথা হল, সৌদিআরব ইজরাইলের টেলিফোনে নীতিরীতি তৈরি করে। এমনকি সৌদিআরবের ইমামগণের লিস্ট ইজরাইল হতে ঠিক করা হয়। কাতার যদি ইজরাইল লবির সাথে আঁতাত না করে, যুদ্ধের কবলে পড়বে।

তুরস্কের এরদোয়ান অভ্যুত্থান হতে বেঁচে গেছেন। আল্লাহ তাঁর হায়াত বরকতময় করুন।

তিনি সম্ভবত শহিদ হবেন। অথবা আফরিন ইস্যুতে ক্ষমতা হারাবেন।

এসব বুঝেশুঝে সৌদি যুবরাজ এমবিএস ইজরাইলের সকল চুক্তিনামায় টিপসই দিয়ে চলেছেন। এটা গাদ্দারি তো বেশক। বুদ্ধিমত্তার কিছু আছে কিনা ভবিষ্যৎ বলবে। পাকিস্তান নিজের জ্বালায় পাগলা প্রায়। ইজরাইল নিয়ে মাথা ঘামালে ভারতের সাথে যুদ্ধ বাধবে। অথবা যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ইসলামাবাদে শুরু করবে।

ইরানের সাথে ইজরাইলে বাগড়া পেশিশক্তির প্রদর্শনী। দুই ষাঁড়ের লড়াই। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নয়, হবে না।

বাংলাদেশ নিয়ে ইজরাইলের প্লান কী? কিছুটা রহস্যময়। তবে, ভারতের নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ কিছুদিন নিরাপদ থাকতে পারে। তাও দেশীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে, মোসাদ এখানে আগুন ও ঘি ঢালবে। এমনকি ভারতের কথায় কান দিবে না।

অপ্রাসঙ্গিক কথা বললাম? না। ইজরাইল ও ইহুদিদের গালমন্দ করার মাঝে আসলে নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু নেই।

ইজরাইলের কাজ ইজরাইল করেছে, করবে। তাদের নীলনকশা তারা বাস্তবায়ন করবে।

আমাদের করণীয় কী? আমাদের সেসব চিন্তা করার ফুরসত নেই। আসলে আমরা এখনো জানিই না, আমাদের এখনকার করণীয়।

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ভাবালুতা। আমার অবাক লাগে, এরকম আবেগপ্রবণ জাতি হাজার বছর বৈশ্বিক নেতৃত্ব কী করে দিয়েছে!?

সব কিছু দুআ করে আল্লাহর সোপর্দ করার আলসে রোগ হতে বের না হলে, মুসলমান জাতি নিঃশেষ হয়ে যাবে। যাবে কি? বাকি আছে কী?

আল্লাহ স্রেফ দুআর উপর নির্ভরশীল জাতির জন্য কোন সৌভাগ্য রাখেন নি। দুনিয়া ও আখিরাতে দুআয় সন্তুষ্ট কওমের কপালে জিল্লতি ও মাহরুমি বরাদ্দ।

দুআর আগে ও পরে পরিকল্পিত কাজ, চিন্তা ও উদ্ভাবন করতে হবে। তখনি দুআয় ফুল আসবে, ফল ধরবে।

পৃথিবীর প্রতি ফিল্ডে মুসলমানরা পরাজিত। জয়ী হওয়ার অবকাশ হলে, মুসলমানরা হয় প্রতারিত।

ইলম ও শাস্ত্রের সব খাতে মুসলমানরা হয়তো অনুপস্থিত, নয়তো মূলস্রোতের বাইরে। আর অতি আবেগপরায়ণ হওয়ায় ফালতো চোখের জল ফেলে, ও বেকার রক্ত ঝরায়।

আবেগ মূল্যবান। তবে, মস্তিষ্কহীন আবেগ কচুপাতার পানি। মুসলিম মিল্লাতের মাঝে বিশুদ্ধ পরিস্থিতি অনুধাবক হয়তো নেই। থাকলে, তাদের চিন্তাকে বাতিল করার ফতোয়া বেশুমার।

মুসলমানের সবচেয়ে বড় শত্রু অবশ্যি ইহুদিরা। এখন মুসলমানদের জাতশত্রু মুসলমানরা নিজেরা। ইহুদিরা সুযোগ নিচ্ছে জাস্ট।

লিবিয়া ও সিরিয়ায় ইহুদিরা ফায়দা লুটেছে। সুযোগ কারা তৈরি করেছে? আমরা।

আইসিসের উত্থান কারা করেছে? আমরা। মোসাদ শুধু ঠাণ্ডা মাথায় দাবা উল্টো করে দিয়েছে।

সারা পৃথিবীতে রক্তের যে জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে, কারা করছে? মুসলমানরা। বাকিরা তালি বাজাচ্ছে। মজা লুটছে।

গৌতায় পৈশাচিক বোম্বিং হচ্ছে। রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। এসব আসাদ করছে। তার সাথে রাশিয়া যোগ দিয়েছে। সুবিধার জন্য পুতিন এসব করছে।

আসাদকে ইরান সহায়তা করছে। তারাও তো নামকা ওয়াস্তে মুসলমান!

এসব করার পেছনের কারণে যারা যুক্ত, তারাও তো মুসলমান।

পুরো আফ্রিকায় মুসলমানদের মুসলমান হত্যা করছে।

ইয়েমেনে সৌদিআরব ও আমিরাত কী পরিমাণ অপরাধ করছে? জানেন ত!

এজন্য ইহুদি নাসারাদের দায়ী করার প্রবণতা হতে বের হয়ে আসতে হবে। নিজের ভুল বের করুন। অপরাধ ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করুন। নইলে, হালাক হয়ে যাবেন।

আগে আমাদের সীমাহীন ভ্রান্তির লিস্ট করুন। কান্নাকাটি কোন জাতির ভাগ্য বদলায় না।

দুনিয়াকে আল্লাহ পরিচালনা করেন কিছু মৌলিক নীতিমালার ভিত্তিতে।

ইজরাইল রাতারাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন আমাদের হতাশা বাড়াবে। কিচ্ছু হবে না।

জাতি ও সভ্যতার উত্থান পতনের ইতিবৃত্ত পড়ার চেষ্টা করুন।

পড়াশোনা একটু কঠিন বিষয়। আরো কঠিন কী জানেন? আন্দাজি ও আজগুবি পড়াশোনা করে বিশ্বাস করা।

আমরা চূড়ান্ত বানোয়াট কথাবার্তা আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করছি। এভাবে বাঁচা যায় না। এমনকি মরাও যায় না।

এরকম অগবেষণার জাতি মৃত্যুর নিশ্চয়তাও পায় না।

আজ সিরিয়ায় যা হচ্ছে, তা বেশিরভাগ মুসলিম দেশের দিকে ধেয়ে আসছে। এরকম দুঃসংবাদ দিতে আমার ভালো লাগছে না। এটাই একমাত্র সত্য।

আমাদের ভুলের প্রাসাদ বিস্তীর্ণ। সেসব ভুলের রাজ্য হতে বেরিয়ে পড়া ফরজ। মুখস্ত দুআয় কিচ্ছু হবে না। চিন্তাশীল ও বাস্তবিক কাজ ছাড়া মুসলিম জাতির ভাগ্যরেখা বদলাবে না।

এট লিস্ট ইহুদি নাসারার সমকক্ষ হতে হবে।

শিক্ষায়,

চিন্তাশক্তিতে,

উদ্ভাবনে,

কৌশলে,

পরিকল্পনায়,

ঐকমত্যে

ও ক্ষিপ্রতায়।

পারলে, তাদের ছাড়িয়ে যেতে হবে।

আল্লাহ, আমাদের বিশুদ্ধ বুঝ দান করুন।

আমিন!
[রুকন রাশনান লুবান]

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.