সুরাতুল বাক্বারার কথা

আলকুরআনের দ্বিতীয় সুরা। কুরআনের বৃহত্তম সুরা। দুইশত ছিয়াশি আয়াত সম্বলিত বৃহৎ সুরা। এটি মাদানি সুরা। হিজরতের পর প্রথম অবতীর্ণ সুরা। সুরা ফাতিহা দুআময় সুরা। এটি যেন তা মকবুল হওয়া মঞ্জুল একটি কবুলপত্র।

সুরা বাক্বারা একটি বিস্তৃত বিষয়াদির গোছাল আলোচক সুরা। পরিপূর্ণ ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এ সুরায় আলোচিত হয়েছে। মদিনার ইসলাম মক্কার ইসলামের চেয়ে বহুবর্ণিল প্রস্ফুটিত হচ্ছিল। তখনকার সমগ্র প্রয়োজনীয়তা সবিস্তার এ সুরায় সমাধান হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

নিটোল, নিরুপম ইসলামের এক আলেখ্য এ সুরা। আক্বিদা, ইবাদত, বিধি, নীতি, গল্প, ইতিহাস, শিক্ষা, মাসায়েল, ফজায়েল সব এ সুরায় আলোচনায় এসেছে। পৃথিবীর সৃষ্টির পটভূমিকা, মানুষ ও জীন জাতির উদ্ভব, বিভিন্ন জাতির উত্থান পতনের এক সরেস আখ্যান এ সুরাতুল মুবারাকা।

বাক্বারা আরবিতে গাভিকে বলা হয়। ইহুদিদের এক গল্পের গাভিকে উপজীব্য করে এ নামকরণ করা হয়েছে। কুরআন মজিদ কোন মানবরচিত পুস্তকের মতো নয়। এখানে বিষয়ভিত্তিক সুরার বিন্যাস নেই। আঙ্গিকগত শৈলীতে কুরআন সুবিন্যস্ত।

গল্প, সাহিত্য সুষমা, কল্যাণ কথা, বিধান ও যুক্তির সমন্বিত মিষ্ট এক নিয়মে কুরআন সাজানো। এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার অপূর্ব শৈলীগত পদ্ধতি।

এজন্য কুরআনকে বিষয়ে বিভাজন কঠিন। কুরআনে সব মিলমিশ হয়ে সুগন্ধি ছড়ায়।

তবু, সব সুরার নিজস্ব রওনক ও রওশন আছে। মৌল বিষয় থাকে। একটা বিষয়ের প্রাধান্য বিরাজ করে। আমরা সে মৌল স্রোত ছোঁয়ার মেহনত করছি। আপনিও সুস্বাগত।

এ সুরার মূল বিষয় কী? আমার কাছে ইসলামের বিশদ বর্ণনা এ সুরা মূল মকসদ মনে হয়। এ সুরায় নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, কিতালের বর্ণনা আছে। মুসলমান, মুনাফিক ও কাফিরের পরিচিতিসহ পূর্বাপর তাত্ত্বিক বিষয় মওজুদ আছে। এটাকে ইসলাম পরিচিতির সুরা বলা সম্ভবত অন্যায় হবে না।

কেউ কেউ এ সুরাকে মুসলমানকে জমিনের খলিফা করার সুরা বলেছেন। প্রথম মানুষ ও রাসুল আদম আলাইহিস সালামের সুস্পষ্ট গল্প এ সুরাতে আলোচিত হয়েছে। অনেকে ইবাদাতকে এ সুরার আলোচ্য বিষয় সাব্যস্ত করেছেন।

আমরা ইসলাম পরিচিতিকে এ সুরার লক্ষ্য বলতে আগ্রহ বোধ করছি। এ বিষয়ের অভ্যন্তরে ছোট ছোট অনেক উপলক্ষ্যের অবতারণা আছে। এটা কুরআনের একটি শৈল্পিক গঠন। লক্ষ্যের সাথে উপলক্ষ্যের সমাহার নিয়ে কুরআন সমুজ্জ্বল।

এ সুরা সংশয়বাদ, পৌত্তলিকতা থেকে তাবৎ ভ্রান্তি দূরীভূত করার উপঢৌকন নিয়ে নাজিল হয়েছে।

মানসিক অস্থিরতা, অশান্তি, হতাশাসহ সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক রোগের প্রতিষেধক এ সুরায় আল্লাহ তায়ালা দিয়ে দিয়েছেন।

আমরা এখন এ সুরার আয়াত সংখ্যাগত উপলক্ষ্যের সাথে একটু পরিচিত হব।

এক-
সুরার ১ থেকে ২০ আয়াতে ইবাদতের নিরিখে মানুষের প্রকার পরিষ্কার করেছেন।

এভাবে-

►১-৫ আয়াত

মু’মিনের পরিচয়।

►৬-৭ আয়াত

কাফিরের পরিচয়।

►৮-২০ আয়াত

মুনাফিকের পরিচয়।

দুই-
►২১-২৯ আয়াত

আল্লাহর উপাসনার হুকুম।

তিন-
►৩০ থেকে ১৪১ আয়াতে ইবাদতের দৃষ্টান্তসমূহ নিয়ে আলোচনা এসেছে।

এভাবে-

►৩০-৩৯

আদম আলাইহিস সালামের শিক্ষণীয় গল্প।

►৪০-১২৩

বনু ইসরাইলের চরম ব্যর্থতার ইতিবৃত্ত। তাদের উত্থান, উন্নতি, ভুল, অপরাধ ও কৃতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা।

►১২৪-১৪১

চূড়ান্ত সফল ও আদর্শ মানব ইবরাহিম আলাইহিস সালামের গল্প।

চার-
►১৪২-১৫২

বাইতুল মাকদাস থেকে বাইতুল্লার দিকে ক্বিবলা পরিবর্তনের তথ্য ও তত্ত্ব।

পাঁচ-
►১৫২-১৫৭

পরীক্ষণ ও পরীক্ষা বিষয়ক কথাবার্তা। ঈমানের পরীক্ষা বিষয়ক আলাপ।

ছয়-
►১৫৮

হজ্বের নিদর্শনাদির কথা।

সাত-
►১৫৯-১৬৩

আহলুল কিতাব তথা ইহুদি নাসারার কথা।

আট-
►১৬৪-১৬৭

আল্লাহর ইবাদত উপেক্ষকদের সতর্কীকরণ।

নয়-
►১৬৮ থেকে ২৪২ আয়াতে ইবাদত ও মাসায়েলের প্রলম্বিত আলাপন।

এভাবে-

►১৬৮-১৭৬

খাওয়াদাওয়া নিয়ে আলাপন।

►১৭৭

কল্যাণকামনা নিয়ে কথা।

►১৭৮-১৭৯

কিসাস তথা হত্যার শাস্তি নিয়ে আলোকপাত।

►১৮০-১৮২

ওসিয়্যত তথা উইল নিয়ে আলোচনা।

►১৮৩-১৮৯

রোজা বিষয়ক কথাবার্তা।

►১৯০-১৯৪

কিতাল তথা জিহাদের মাসায়েল আলোচিত হয়েছে।

►১৯৫

মালসম্পদ খরচ বিষয়ক আলোচনা।

►১৯৬-২০৩

হজ্ব ও উমরা বিষয়ক আলোচনা।

►২০৪-২১৪

বিভিন্ন মানুষের উদাহরণ।

►২১৫

আবার সম্পদ খরচ করার আলোচনা।

►২১৬-২১৮

কিতাল বিষয়ক আবার আলোকপাত।

►২১৯-২২০

মদ, জুয়া, ব্যয় ও ইয়াতিম বিষয়ক কথাবার্তা।

►২২১-২৪২

নারী সংক্রান্ত আলোচনা।

দশ-
►২৪৩ থেকে ২৫৪ আয়াতে জিহাদ বিষয়ক বিশদ বিশ্লেষণ।

এগারো-
►২৫৫ থেকে ২৬০ আয়াতে আল্লাহ তায়ালার শানদার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে।

এভাবে-

►২৫৫

আল্লাহর শান বর্ণনা।

►২৫৬-২৫৭

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আনয়নের দাওয়াত।

►২৫৮-২৬০

আল্লাহর প্রতি প্রতীতি সৃষ্টির ঘটনাদি। নামরুদ ও ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনা। ওজাইর আলাইহিস সালামের গল্প। পাখি জীবিত করার কিচ্ছা।

বার-
►২৬১ হতে ২৮৩ আয়াতে অর্থনৈতিক লেনদেন আলোচিত হয়েছে।

প্রথমে আল্লাহর রাস্তায় খরচের আলোচনা। তারপর সুদের বিষাক্ত বিষয়ে আলোচনা। শেষে, ঋণ বিষয়ে ইসলামি দর্শন আলোচিত হয়েছে।

তের-
►২৮৪ থেকে ২৮৬ আয়াতে ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য নিষ্ঠাবান হওয়ার আহ্বান এসেছে।

খেয়াল করলে, উপলব্ধি করবেন, সুরাতুল বাক্বারা টোটাল ইসলামকে ব্রিফ করেছে। দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে ইতিহাসের শিক্ষা ও নির্ভুল পথদিশা সব এ সুরায় সন্নিবেশিত আছে।

বর্তমান অস্থির সময়ের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সকল প্রশ্নের সহীহ উত্তর এ সুরায় রয়েছে। কেউ সুরা বাক্বারা গভীর ও নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করলে, সমূহ মুশকিল আসান হয়ে যায় আলহামদুলিল্লাহ্‌।

ইসলাম বিষয়ক একটা পরিচ্ছন্ন ধারণা বাক্বারায় খোদাই করা আছে। ইসলাম মতো চলার জন্য এ সুরা দারুণ এক রোডম্যাপ।

এ সুরার তিলাওয়াত ও তাফসির ও তাদাব্বুরকে আত্মস্থ করতে পারলে, ইসলাম জানা, মানা ও ইসলাম নিয়ে দাওয়াত দেওয়া মসৃণ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্‌।

পুরো কুরআন নিয়ে তাফসির পড়া ও বুঝা কারো জন্য সময়সাপেক্ষ হলে, মিনতি করব, অন্তত সুরা বাক্বারার তাফসির ও তর্জমা পড়ুন। দয়া করুন!

এ সুরা আপনাকে বিশুদ্ধ, বিমল ও বিমোহক ইসলামের সুশীতল সওগাত উপহার দিবে। ইনশাআল্লাহ।

রুকন রাশনান লুবান

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It on Pinterest

Share This