আদর্শ সমাজ গঠনে কওমী মাদরাসা ও উলামায়ে কেরামের ভূমিকা

সারাংশ : মানুষ মহান আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে। সমাজকে আদর্শ করার জন্য মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে বিধান দিয়েছেন। এ ব্যাপারে মহানবীর আদর্শও রয়েছে। কওমী মদরাসাগুলো কুরআন সুন্নাহর শিক্ষা দিয়ে আদর্শ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছে। আলেমগণ নবী-রাসূলের উত্তরাধীকারী। কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী-রাসূল আসবেন না। সুতরাং নবী-রাসূলের জ্ঞান ও কর্মের উত্তরাধীকারী হিসেবে আলেমগণ দায়িত্ব পালন করছেন। সময়ের চাহিদা পূরণ ও যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবালায় আলেমদের দায়িত্বের পরিধি ও গতিবৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। সে বিষয়গুলোই আলোচিত হয়েছে প্রবন্ধে।
আদর্শ সমাজ : আদর্শ শব্দের অর্থ অনুকরণীয়, অনুসরনীয়, নমুনা, দৃষ্টান্ত ও আয়না। আর সমাজ অর্থ হচ্ছে পরস্পর সহযোগিতায় অবস্থানকারী মানবগোষ্ঠি, একজাতীয় প্রাণীর দল, জাতি, সম্প্রদায়, সংঘ ও সভা। সুতরাং আদর্শ সমাজ বলতে বুঝায় একটি সুশৃংখল অনুসরনীয় মানব সমাজ যারা পরস্পরে পরস্পরকে সহযোগিতা করে। আর ইসলামের দৃষ্টিতে কুরআন সুন্নাহর আলোকে সমাজকে পুনর্বিন্যাস করতে পারলে সেটাই হবে আদর্শ সমাজ।
কওমী মাদরাসা : কওম অর্থ জাতি, আর মাদরাসা অর্থ বিদ্যালয়, সুতরাং কওমী মাদ্রসা অর্থ জাতীয় বিদ্যালয়। হযরত আদম আ. কে সৃষ্টি করে মহান আল্লাহ তাঁকে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে নবী রাসুলগণের প্রতি যেসব আসমানী কিতাব ও শিক্ষা দিয়েছেন, সর্বশেষে মহানবী সা. এর উপর যে কিতাব-কুরআন মজীদ নাযিল করেছেন এবং মহানবী সা. এর জীবনাদর্শের শিক্ষা নিয়ে আসহাবে সুফফাতে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়েছিল, পাক ভারতে ইংরেজদের সেকুলার শিক্ষা চালুর মাধ্যমে যে শিক্ষব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করা হয়েছিল এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ হবার পর ১৮৬৬ খ্রি. দারুল উলূম দেওবন্দে পুনরায় যে শিক্ষার মশাল প্রজ্জোলিত করা হয়েছিল তারই উত্তরাধিকার বাংলাদেশের কওমী মাদরাসাসমূহ। এ শিক্ষা মহান আল্লাহ প্রদত্ত মূলধারার শিক্ষা, স্রষ্টার আনুগত্য ও সৃষ্টির সেবায় নিবেদিত মানুষ তৈরীর শিক্ষা। এ শিক্ষা একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা। দুনিয়ার কল্যাণ ও আখিরাতের মুক্তি নির্দেশক শিক্ষা। এ শিক্ষার মাঝে মানব জীবনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিদায়েত প্রাপ্তি ঘটে। সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা সৌহার্দ সম্প্রীতি রক্ষার সকল উপাদান এ শিক্ষায় অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। তাই আদর্শ সমাজ গঠনে কওমী মাদরাসা দেশে কার্যকর ও ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে।

কওমী মাদরাসার আবদান
এদেশের কওমী মাদ্রাসার আলেমগণ সবচেয়ে কম সুবিধাভোগী হয়ে সবচেয়ে বেশি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন জাতিকে। তাঁরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এ পথে। জাতিকে সৎপথের দিশা দেয়া অন্যায় অসত্য থেকে বাঁচানো, হিদায়াতের রাজপথ প্রদর্শন ও মানুষকে নৈতিক ও চারিত্রিক বলে বলিয়ান করা এবং মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছেন আলেম সমাজ।
এদেশের আলেমগণ দেশপ্রেমিক। নিজ দেশের সেবা করেন প্রচার বিমুখ হয়ে। এদেশের আলেমদের জীবন মরণের ঠিকানা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। দেশের জনগণের খুব কাছের মানুষ আলেমগণ। জনগণের চোখের সামনেই তাঁদের সকল কার্যক্রম। আলেমদের কোন গোপন এজেন্ডা বা কর্মকাণ্ড নেই। জনগণের সুখ দঃখের ও জীবন মরণের সাথী আলেমগণ। এজন্য আলেম ও কওমী মাদ্রাসা বিরোধী হাজারো অপপ্রচার, অপবাদ কোন কাজেই আসছে না। নাটক সিনেমায় আলেমদের চরিত্র হননের মত নিকৃষ্ট ঘৃণ্য অপকর্ম কোন প্রভাব ফেলছে না। কারণ দেশের মানুষ এসবে বিশ্বাস করে না। কওমী মাদ্রাসাগুলো জনগণের অর্থায়নে চলে, তাদের হাজারো খোলা চোখের সামনে। এজন্য এসব মাদ্রাসার বিরুদ্ধে সর্বগ্রাসী অপপ্রচার শুরু হবার পর জনগণের আগ্রহ অনুরাগ দান-অনুদানের মাত্রা কওমী মাদ্রসার প্রতি আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণ বুঝে গেছে এসবই হচ্ছে দেশ ও জাতি বিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ। যে সব গণমাধ্যম অবাস্তব মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করেছে তারা মিথ্যাবাদী হিসেবে মানুষের কাছে চিহ্নিত হয়েছে।
এদেশের আলেম সমাজ তথ্য সন্ত্রাসের শিকার, মজলূম। কারণ তাঁদের হাতে মিডিয়া নেই। আফসূসের বিষয় যে আমাদের অধিকাংশ গণমাধ্যম দেশ ও জাতির সেবায় নিয়েজিত আলেমদের কোন অবদান দেখতে পায় না। অথচ এদেশের আলেমরা বিনামূল্যে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা জনগণকে দিয়ে যাচ্ছেন। আলেমরা শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা চালু করেননি।
কবি মোজাম্মেল হক তাঁর এক কালজয়ী কবিতায় লিখেছেন,
পরধন দেখি, লোভে বাড়াও না হাত,
কাহার শরীরে, কভু করনা আঘাত।
কাহাকেও মন্দ কথা বল না কখন,
সকলের প্রিয় হতে করহ যতন।
মানীর সম্মান সদা রাখিবে যতনে,
তুষিবে সকলে অতি মিষ্টি সম্ভাষণে।
নীচ ভাবি মনে ঘৃণা কর না কাহারে,
সকলি আল্ল¬াহর সৃষ্টি জানিও সংসারে।
দেশের আলেমগণ জনগণকে অব্যাহতভাবে এ মহৎ শিক্ষা (যা কুরআন হাদীস থেকেই উৎসারিত) দিয়ে যাচ্ছেন। স্রষ্টার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানবতার কল্যাণে তাঁরা তা করেই যাবেন।
সুতরাং বাংলাদেশে সুশিক্ষার বিস্তার, নিরক্ষরতা দুরীকরণ, আদর্শ নাগরিক তৈরী এবং শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা ও উন্নয়ন উৎপাদনে দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোর ভূমিকা ও অবদান অপরিসীম। এ শিক্ষার স্বীকৃতি নিশ্চিত হলে এবং সরকারী সহযোগিতা যুক্ত হলে এসব মাদ্রাসা আরো বেশি অবদান রাখতে পারবে। জাতীয় কল্যাণে নিয়োজিত দেশের কওমী মাদ্রাসা কতৃপক্ষকে তাই অশেষ কৃতজ্ঞতা।

কওমী মাদ্রসা প্রসঙ্গে কতিপয় অভিযোগ এর জবাব
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের তুহমত
ইসলাম ও মুসলিম জাতিসত্তা বিরোধী কিছু ব্যক্তি কওমী মাদরাসার প্রতি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের তুহমত দিয়ে যাচ্ছে। এ অভিযোগ যে শতভাগ মিথ্যা দেশের মানুষ তা জানে। এ দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা বিশেষত কওমী মাদ্রসা শিক্ষা দেশের মানুষকে শান্তি শৃংখলা ও প্রগতির শিক্ষা দান করে। আসমানী এ শিক্ষা মানুষকে মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত করে যাচ্ছে। তাদের দায়িত্ব সচেতন করছে যেন সকল প্রকার সন্ত্রাস অশান্তি নিপীড়ন নির্যাতন থেকে মানুষ মুক্ত থাকে, দেশের জনগণকে এ জঘন্য অপরাধ থেকে মুক্ত রাখা এবং নিজেরা মুক্ত থাকা আলেমদের অঙ্গীকার। সুতরাং কওমী মাদ্রাসা এদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও নির্মূলে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সাথে এ দেশের কওমী মাদরাসার দূরতম কোন সম্পর্ক নেই।
অন্যায়, অসত্য, জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ কিংবা স্বাধিকার আন্দোলন সন্ত্রাস নয়, জান মাল ইজ্জত ধর্ম ও দেশ রক্ষার আন্দোলন কখনোই সন্ত্রাস হতে পারে না। ইসলামে একে জেহাদ বলা হয়েছে। জেহাদের অনেক স্তর, শর্ত ও পর্যায় আছে। যারা ইসলামের জেহাদকে সন্ত্রাস বলে প্রমাণ করতে চান তারা জ্ঞানপাপী নতুবা মুর্খ। পৃথিবীর অসত্য অন্যায় ও জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই এবং তাবৎ সন্ত্রাস নির্মুলে কিয়ামত পর্যন্ত জেহাদ চলবে বলে কালোত্তীর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন রাসূলুল্ল¬াহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম। যারা জেহাদকে সন্ত্রাস বলে চালিয়ে দিতে চান তাদের মতলব খারাপ। সন্ত্রাস কখনোই জেহাদ নয় আর জেহাদ কখনোই সন্ত্রাস নয়। যারা সন্ত্রাস করে জেহাদ নাম ব্যবহার করে তারা নাদান ও কুচক্রি। তাদের বিরুদ্ধে এ দেশের আলেম সমাজ ঐক্যবদ্ধ।
ইসলাম, কুরআন, নবী-রাসূল, অলি-আল্লাহ বা স্বয়ং আল্ল¬াহর শানে কেউ অশালীন কথা বললে, বেআদবী করলে যাদের মনে ঈমানের লেশ আছে তাঁদের চেতনায় লাগবে, তাঁরা আহত হবেন, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন এটা খুবই স্বাভাবিক। যারা এহেন প্রতিবাদকেও জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের সাথে তুলনা করেন, কিংবা আলেমদের সরলতাকে পুজি করে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে নিয়ম মাফিক প্রতিবাদকে সহিংসতার দিকে উস্কে দেন তারা ভুল করেন। নবী রাসূল ও স্রষ্টার বিরুদ্ধে কথা বললে বা লিখলে মুসলমান মাত্রেই আহত হবেন। সুতরাং কেউ যেন এহেন কাজ না করে সেজন্য ব্যবস্থা থাকা দরকার। কারণ একজন মুসলমান তাঁর স্রষ্টা এবং নবীজীকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে। সুতরাং কোন লোক যদি আল্লাহ ও তাঁর নবীর মর্যাদা হানি করে কিছু বলে বা লিখে ঈমানদার আহত হবে এটাইতো স্বাভাবিক। সমাজের মানুষকে আহত উত্তেজিত করে কেউ সমাজ ও দেশকে যেন অস্থিতিশীল করতে না পারে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং আমাদের সকলকে সচেতন থাকতে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষা অনুৎপাদনশীল
অনেক বন্ধু মাদ্রাসা শিক্ষাকে আন্প্রডাকটিভ (অনুৎপাদনশীল) খাত বলে মন্তব্য করেন। তাদের এ মন্তব্য একেবারেই অবিবেচনাপ্রসূত। কারণ কওমী মাদ্রসা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আর লক্ষ্য হচ্ছে সুনাগরিক তৈরী করা, মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলা। মানুষের আচরণে কাঙ্খিত পরিবর্তন সাধন করা। মানুষকে আল্লাহর অনুগত ও রাসূল সা. অনুসারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। বাহ্যত উৎপাদন এ শিক্ষার লক্ষ্য নয়। তারপরও উন্নয়ন উৎপাদনে এ শিক্ষার গৌরবজনক অংশিদারিত্ব রয়েছে। দেশের ভেতরে কোন আলেম বেকার নন। লক্ষ লক্ষ আলেম কর্মব্যস্ত কল্যাণমুখী মহৎ জীবন অতিবাহিত করছেন। সকলেই কোন না কোন মহৎ কাজে উন্নয়ন উৎপাদনে অবদান রেখে চলেছেন। পরামর্শ দিচ্ছেন; দু‘আ করছেন।
দেশের বাইরে হাজার হাজার আলেম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে আছেন। তাঁরা প্রত্যেকে বহির্বিশ্বে সম্মানজনক একাধিক কাজ করে যাচ্ছেন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ভূমিকা রাখছেন। বাংলাদেশের আলেমদের চাহিদা আছে সারা দুনিয়াতে। প্রায় সারা দুনিয়া এমনকি সৌদী আরব পর্যন্ত বাংলাদেশের হাজার হাজার আলেম ইমাম ও মুআযিযন হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের ভেতরে যারা মসজিদ মাদ্রাসায় দায়িত্ব পালন করছেন উন্নয়ন উৎপাদনে তাঁদেরও ভূমিকা রয়েছে। কারণ যারা বিধিবদ্ধ সুযোগ সুবিধা ভোগ করে ফাইলে স্বাক্ষর দিয়ে মনে করেন দেশের উন্নয়ন উৎপাদনে খুব অবদান রাখছেন, তাদের বিপরীতে সরকারের কোন সুযোগ-সুবিধা না নিয়ে জনগণের কাছে থেকে, জনগণকে সাথে নিয়ে উন্নয়ন উৎপাদন, ফসল বৃদ্ধি, ফসলে বরকতদান, খড়া, বন্যা শিলাবৃষ্টি ঝড়-তুফান থেকে ফসল রক্ষার জন্য যারা মালিকের কাছে জনগণের আবেদন-আবদার পেশ করছেন তাঁদের অবদান অনেক বেশি।
সুতরাং বাংলাদেশের কোন শ্রেণী পেশার মানুষের চেয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আলেমরা পিছিয়ে আছেন একথা সত্য নয়। দেশে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার সরকারী স্বীকৃতি না থাকায় তাঁরা সরকারী চাকুরী করতে পারছেন না কিন্তু উন্নয়ন উৎপাদনে ভূমিকা রাখার জন্য সরকারী চাকুরী করা দুনিয়ার কোথাও শর্ত নয়। এরপরও কওমী মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রী নিয়ে শত শত আলেম পুনরায় আলিয়া মাদ্রসা বা স্কুল কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে পড়ে সুনামের সাথে ডিগ্রী নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
কওমী মাদরাসায় বাংলা ইংরেজী নেই
অনেকে কওমী মাদ্রসা শিক্ষাকে তুচ্ছজ্ঞান করে কওমী শিক্ষির্থীদেরকে অর্ধশিক্ষিত বলেন। তাদের অভিযোগ এরা বাংলা ইংরেজি কিছুই জানে না। তারা হয়তো জানেন না যে, কওমী মাদ্রসায় পাঁচটি ভাষার চর্চা হয়। বাংলা, আরবী, উর্দূ, ফার্সী ও ইংরেজী। বাংলা ভাষা চর্চায় বর্তমানে কওমী মাদ্রাসা যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে বাংলাভাষার নেতৃত্ব একটা সময়ের ব্যবধানে আলেমদের হাতে চলে আসতে পারে। সুতরাং বাংলাচর্চা কওমী মাদ্রসায় হয় না এটা সত্য নয়। বাংলায় উর্দূ, ফার্সী, আরবী, ও হিন্দী সাহিত্যের অনুবাদ এখন আলেমদের হাতে। ইংরেজী চর্চায় আলেমরা দেরীতে এসেছেন একথা সত্য হলেও কওমী মাদ্রসায় মোটেই ইংরেজী চর্চা নেই একথা সত্য নয়। ইংরেজী চর্চা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ইংরেজী সাহিত্যে বেশ কিছু দক্ষ আলেম তৈরী হয়েছেন। আলেমরা ইংরেজী শিখছেন অর্থোপার্জনের জন্য নয়। বরং বিশ্বব্যাপী দীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার জন্য ইংরেজী শিক্ষা করা জরুরী মনে করছেন।
আলেমদের দেশপ্রেম নেই
অনেক বন্ধু আলেমদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা, এই দেশের স্বাধীনতা ও ঐক্য রক্ষায় এবং দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ কামনায় আলেমরা শেষ রাতে উঠে মালিকের দরবারে হাজিরা দেন। তারা কথায় কথায় তাদের দেশপ্রেমের যিকির হয়তো তুলেন না। কিন্তু আলেমদের দেশপ্রেম নিখাদ। দেশের মাটি ও মানুষের কল্যাণে তাঁরা নিবেদিতপ্রাণ। তাঁরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করছেন। কারণ প্রকৃত কোন ধার্মিক সাম্প্রদায়িক বিদ্ধেষ ছড়াতে পারে না। সুতরাং এদেশের আলেমগণ দেশ ও দেশের জনগণের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।
তাই অপপ্রচার নয় আসুন! জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সকলে মিলে মিশে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাই। নায়বে নবী আলেমদের সাথে থাকি, তাঁদের পাশে দাঁড়াই; তাঁদের কথা মানি এবং সহযোগিতা করি।
আদর্শ সমাজ গঠনে উলামায়ে কেরাম
১. জাতিকে সতর্ক করা : মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে আলেমদের দায়িত্ব নির্দেশ করেছেন। তারা প্রথমে দ্বীনের গভীর জ্ঞান হাসিল করবেন এরপর তাদের স্বজাতির কাছে ফিরে যাবেন এবং তাদেরকে সতর্ক করবেন, এটা হচ্ছে আলেমদের মূল কাজ। আলেমগণ এ মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে আরো কৌশলী ও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।
আলেমরা অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কথা বললেও অনেকের কাছে এটা মৌলবাদ আর জঙ্গীবাদ হয়ে যায়; কিন্তু বন্ধুরা চিন্তা করেন না যে, আলেমদের এই বাধা নিষেধ না থাকলে মানব জন্মের পবিত্রতা থাকবে না, সকলে লালসার গোলাম হয়ে গেলে জারজ সন্তানে ভরে যাবে দেশ, সামাজিক শৃংখলা বালির বাঁধের মত ভেসে যাবে। কুরআন হাদীসের কথা বলে জাতিকে সতর্ক করা আলেমদের ফরয দায়িত্ব। এতে যারা নাখুশ হন তাঁরা প্রকৃত অর্থেই অপরাধী। কারণ আলেমরা আজীবন মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন, এতে মাদক ব্যবসায়ী, মাদকাসক্ত ও মাতাল এবং চোরাকারবারীরা বেজার হতেই পারে। আলেমরা বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, অবাধ যৌনাচারের বিরুদ্ধে হরহামেশা কথা বলেন, এতে চরিত্রহীন, বদমাশ ও লম্পটেরা নারাজ হতেই পারে, আলেমরা জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলেন, এতে জালিমরা অসন্তুষ্ট হবে এটা স্বাভাবিক। এরপরও আলেমদের জাতিকে সতর্ক করার কাজ করে যেতে হবে।
২. সৎকাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধ : সৎকাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধ নবী রাসূলদের কাজ ছিল, উত্তরাধীকার সূত্রে একাজের প্রধান দায়িত্ব আলেমদের উপর বর্তেছে। স্রষ্টা ও সৃষ্টির হক আদায়ে তাঁরাই আমাদের উদ্বুদ্ধ করেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিকল্পিত উপায়ে এ কাজ আমাদের করতে হবে। সমাজকে নিরাময় রাখতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। এ মহান সেবা বিনামূল্যে পেয়ে যাওয়ায় আমরা এর মূল্য বুঝি না। বাতাস বিনা মূল্যে পাই এ জন্য বাতাসের মূল্য আমাদের কাছে নেই। কিন্তু বাতাস ছাড়া যে আমরা সামান্য সময়ও বাঁচতে পারি না এ উপলব্ধি থাকা দরকার।
৩. দাওয়াত ইলাল্লাহ
প্রত্যেক আলেমের দাঈ হওয়া ও দাঈর গুণ অর্জন করা প্রয়োজন। সকল নবী রাসূল দাঈ ছিলেন। অমুসলিমদের ঈমানের দাওয়াত দিতে হবে, আর মুসলমানদের ঈমানের দাবী পুরন ও আমলের দাওয়াত দিতে হবে। দাওয়াত পৌঁছানোর সকল পন্থাই আমাদের রপ্ত করা প্রয়োজন। নারী পুরুষ সকলের কাছে দীনের দাওয়াত পৌঁছানো আমাদের কর্তব্য। এজন্য সমকালীন উপায় উপকরণ ব্যবহার করা আবশ্যক। কার্যকর দাওয়াত দেওয়ার জন্য আমাদের সুন্নাহর পাবন্দ ও চৌকষ হতে হবে। অভিজ্ঞতা অর্জন ও দাওয়াতী কজে সমন্বয় সৃষ্টির জন্য বিশ্বব্যাপী দাওয়াতী কার্যক্রমের সাথে যারা জড়িত তাঁদের সাথে পরিচয় ও যোগাযোগ গড়ে তুলা আবশ্যক।
৪. তা‘লীম তরবিয়্যত
আমরা যে তা‘লীম তারবিয়তের সাথে আছি এর উন্নয়নেও আমাদের বহু কাজ করার আছে। প্রথমে কিতাবী যোগ্যতা অর্জন অতঃপর ফন্নী মেহারত বা বিষয় ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন এবং তাফাক্কুহ ফিদ্দীন বা শরঈ বিষয়ে পান্ডিত্য অর্জনে আমাদের আরো মনোযোগী হওয়া উচিত। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সমকালীন উপকরণ ব্যবহার শিক্ষাকে ফলপ্রসূ ও আনন্দদায়ক করে। কম সময়ে বেশি শেখানো যায়। আর শিক্ষকদের জন্য পাঠদান পদ্ধতি, শিশু মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষামনোবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণালাভ করা প্রয়োজন। এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। কারণ প্রশিক্ষণ জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে কাঙ্খিত পরিবর্তন আনে।
৫. বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই
জ্ঞানের জগতে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলমানরা আজ অনেক পেছনে পড়ে আছে। গবেষণা উদ্ভাবন আবিষ্কারে উল্লেখ করার মত কিছুই নেই। অথচ বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হলে জ্ঞান বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করাত আবশ্যক। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইতে বিজয়ী হতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম হতে হবে। ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি, প্রতিপক্ষের অভিযোগ আপত্তি ও মিথ্যাচারের পরিশিলিত উপযুক্ত জবাব দিতে হবে। এজন্য ভাষা ও বিষয় ভিত্তিক যোগ্যতাসম্পন্ন লোক তৈরী করা প্রয়োজন। মহান আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে বড় জেহাদ করার আদেশ দিয়েছেন। মুফাস্সিরগণ একে জিহাদ বিল কুরআন ও জিহাদ বিল ইলম বলেছেন। ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী র. বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইকে সকল জেহাদের প্রাণ ও মূল বলেছেন। সুতরাং এ লড়াইয়ে আমাদের পরঙ্গম হওয়া জরুরী।
৬. শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামীকরণ
দেশের মুসলমানদের জন্য ইসলামী শিক্ষা নিশ্চিত করণের জন্য সর্বস্তরের শিক্ষাকে ইসলামীকরণের আওয়াজ তুলা সময়ের দাবী। অন্য ধর্মের ছাত্ররা নিজ নিজ ধর্ম জানবে। মুসলমানরা ইসলাম শিখবে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য আচরণের কাঙ্খিত পরিবর্তন। প্রচলিত শিক্ষায় তা হচ্ছে না; এ বিষয়ে প্রায় সকলে একমত। শিক্ষার্থীদের আচরণে কাঙ্খিত পরিবর্তন সাধনে সক্ষম ইসলামী শিক্ষা। এ জন্য শিক্ষার সর্বস্থরে ৩০০ মার্কের ইসলামী শিক্ষা অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন। কারণ মহানবী সা. বলেছেন, ‘আবশ্যিক জ্ঞান তিন প্রকার ১. কুরআনের বিধান সম্বলিত আয়াতসমূহের জ্ঞান ২. রাসূলুল্লাহর সা. এর সুন্নাহ বা আদর্শ সংক্রান্ত জ্ঞান ৩. ফারাঈজ বা মানবাধিকার সংক্রান্ত জ্ঞান; এছাড়া অন্যান্য জ্ঞান অতিরিক্ত। এই তিন প্রকারের জ্ঞান একজন ছাত্র পেলে তার মধ্যে আল্লাহর হক ও বান্দার হক আদায়ের চেতনা জাগবে, তাঁর মধ্যে সততা তাকওয়া ও মানবিক গুণ-বৈশিষ্ট তৈরী হবে। আচরণের কাঙ্খিত পরিবর্তন হবে।
৭. খেদমতে খালক
সৃষ্টির সেবা মানুষকে উন্নত করে। নেতৃত্বের আসনে সমাসিন করে। বাংলাদেশে সেবার নামে মানুষকে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে বহু দিন থেকে। এ অবস্থায় মানব সেবার নানা আঙ্গিনায় আমাদের বিচরণ করা আবশ্যক। একই সাথে জীববৈচিত্র রক্ষা ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদের অবদান রাখা উচিৎ। মহান আল্লাহ হাদীসে কুদসীতে বলেছেন, ‘আল খালকু ‘ইয়া-লুল্লাহ’ পুরো সৃষ্টি আল্লাহর পরিবারভূক্ত। যে আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণকামী প্রিয় সে আল্লাহরও প্রিয়। সুতরাং তরুণ আলেমদের খেদমতে খালকের কাজে সমন্বিতভাবে আত্মনিয়োগ করা প্রয়োজন।
৮. উম্মাহর ঐক্য প্রচেষ্টা
উম্মাহর মধ্যে তুর বা বিচ্ছিন্নতা তৈরী করা শয়তানের কাজ এবং উম্মতের মধ্যে জোড়মিল তৈরী করা আলেমের কাজ। হাসান বসরী র. আলেমের পরিচয় বলতে গিয়ে বলেছেন ‘আন্নাসেহ লি জামা‘আতিহিম’ একজন আলেম পুরো উম্মতের কল্যাণকামী। আজ মুসলমানরা বেশী ক্ষতিগ্রস্থ নিজেদের দলাদলী হানাহানীর কারণে। বিশ্বকাফের শক্তি মুসলমানদের বিভক্ত করে তাদের এক দল দ্বারা আরেক দলকে নির্মূল করার যে ফাঁদ পেতেছে তা থেকে কোন দিন রেহাই মিলবে না যদি না আমরা ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হই। এ জন্য বিদ্যমান নানা মতপার্থক্য থাকা সত্তেও ‘ইত্তেফাক মা‘আল ইখতিলাফ’ এ অবস্থানে আসা প্রয়োজন যতদিন না ইমাম মাহদী ও হযরত ঈসা আ. এর আগমণ হবে। তাঁরা আসলে বিদ্যমান ফিরকা ও ফিৎনা এবং সকল বিভ্রান্তির অবসান হবে ইনশাআল্লাহ।
৯. নেতৃত্ব সৃষ্টি
কওমী মাদারাসা শিক্ষার্থীরা সরকারী চাকুরীতে যেতে না পারলেও দেশ ও জাতীর নেতৃত্ব গ্রহণে কোন বাঁধ নেই। সুতরাং কিছু সংখ্যক আলেমকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নেতৃত্ব দানের যোগ্য করে তৈরী করা প্রয়োজন। যাতে তারা স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সরকারে সততা ও দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিতে পারেন। স্থানীয় সরকারে অংশিদারিত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় সরকারে যাওয়ার রাস্তা তৈরী হবে। একই সাথে টেকসই নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। নেতৃত্ব তৈরীর জন্য কিছু কোর্স কারিকুলাম করা যেতে পারে।
১০. কুরআন চর্চাকে ব্যাপক করা
কুরআন মাজীদ মানব জাতীর হেদায়েতের মূল উৎস। । সুতরাং কুরআনের তিলাওত ও কুরআনের সূর দিয়ে জাতিকে মুহিত করার কর্মসূচী হাতে নেয়া প্রয়োজন। প্রতিটি জেলা উপজেলা ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে কেরাত সম্মেলন করা যেতে পারে। কুরআনের তিলাওত মানুষের ঈমানকে চাঙ্গা করবে। সেই সাথে কুরআনের তাফসীর, কুরআন বুঝে পড়ার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা কুরআনের আলোয় মানুষের ব্যক্তি জীবন পরিবার সমাজ ও দেশকে আলোকিত করার ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচী হাতে নেয়া প্রয়োজন। মুসলমানের সন্তানএদর জন্যমক্তবের বুনিয়দি শিক্ষা বর্তমানে চ্যোলেঞ্জের মুখে পড়েছে। কিন্ডার গার্টেন ও স্কুল শিক্ষা সকালে হওয়ায় সবাহী মক্তব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের মাসাঈ মক্তব এবং হলিডে মক্তব শহরাঞ্চলে চালু করা প্রয়োজন।
১১. গণমাধ্যম ব্যবহার
গণমাধ্যম বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় মাধ্যম। মুহুর্তের মধ্যে পৃথিবীর এ প্রান্তের খবর অপর প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে গণমাধ্যম এর সুবাদে। বিশ্ব মানসকে ব্যাপকভাবে আন্দোলিত ও প্রভাবিত করে গণমাধ্যম। এতে আমাদের দক্ষ যোগ্যতর উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাহিত্যের ডালপালায় বিচরণ, শৈল্পিক, নান্দনিক ও সাবলীল উপস্থাপন, বিশ্লেষণী ক্ষমতা অর্জন, তাৎক্ষণিক প্রশ্নের উত্তর দান, ভাষা ও বিষয়গত দক্ষতা অর্জন, শাণিত যুক্তি তর্ক উপস্থাপন ও প্রতিপক্ষের যুক্তি খন্ডনের দক্ষতা অর্জনে তরুণ আলেমদের প্রশিক্ষণ নেয়া জরুরী। এ বিষয়েও আলাদা কোর্স কারিকুলাম হতে পারে।

১২. উচ্চতর গবেষণা
উলূমে শরঈয়া তথা ইলমে তাফসীর, হাদীস ও ফিকহের উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলার প্রয়োজনীয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুগ চাহিদা পূরণে এসব প্রতিষ্ঠান যোগ্যতর দক্ষ মুফাসিসর মুহাদ্দিস ও মুফতী তৈরী করবে। যারা কালের সৃষ্ট সমস্যাদির শরঈ সমাধান দেবেন এবং একই সাথে ইসলাম ও মুসলিমের উপর আরোপিত অভিযোগ ষড়যন্ত্র চক্রান্তের মুখশ উন্মোচন করে বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব দেবেন। এ জন্য প্রতিষ্ঠিত বড় বড় মাদরাসাগুলোতে গবেষণা সেল করা যেতে পারে। সেখানে বিভিন্ন কোর্স চালু হতে পারে এবং যোগ্য আলেমদের গবেষণার জন্য ডিগ্রী প্রদান করা যেতে পারে। আল হামদুলিল্লাহ ঢাকায় মুফতী আব্দুল মালিক সাহেব ও সহযোগীর মারকাযুদ দাওয়াহ এর মাধ্যমে আমাদের সামনে একটি উদাহারণ তৈরী করেছেন। মহান আল্লাহ তাঁর হায়াতে বরকত দান করুন।
১৩. উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ
রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘মনের ঔষ্যর্যই প্রকৃত ঔষ্যর্য’ কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ মনকে সংকীর্ণ না করতে আদেশ দিয়েছেন। আজ পরিবেশগতভাবে আমরা বড়ই সংকীর্ণ। এতটা সংকীর্ণতা যে বলতেও লজ্জা হচ্ছে। মনটাকে বড় করা প্রয়োজন, মনের মাঝে সকল মানুষের প্রতি মমত্ববোধ জাগ্রত করা উচিৎ। হিংসা বিদ্ধেষ ফিৎনা ও ফিরকাবাজী পরিহার করে পুরো উম্মতে মুসলিমার স্বার্থকে প্রধান্য দেয়া উচিত।
১৪. সংস্কৃতিক উজ্জীবন : মানুষের পরিশীলিত পরিশুদ্ধ জীবনের বাহ্যিক আচার আচরণ ও রীতি নীতিই হচ্ছে সংস্কৃতি। কিছু মানুষ অপসংস্কৃতিকে সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দিতে চায়। বাংলাদেশে অপসংস্কৃতি, বিজাতীয় সংস্কৃতি অশ্লীলতা উলঙ্গপনা বেহায়াপনার যে জয়জয়কার চলছে এমতাবস্থায় ইসলামের নিজস্ব সংস্কৃতি তাহযীব তামাদ্দুন এর উজ্জীবন আবশ্যক। আমাদের মনে রাখতে হবে যে আদর্শিক বিজয়ের জন্য সংস্কৃতিক উজ্জীবন জরুরী। এজন্য সুন্নাহর ব্যাপক প্রচলন করা, নারী পুরুষকে নবীজীর নুরানী আদর্শের অনুসরী করা, অব্যাহত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদীর মাধ্যমে মানুষকে নির্মল আনন্দদানের ব্যবস্থা করা সময়ের দাবী। এ দাবী পূরণে তরুণ আলেমরা উদ্যোগী হবেন এ প্রত্যাশা করছি। তাছাড়া আলেমদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করা মাদ্রাসা ছাত্রদের জন্য মেধাবৃত্তি চালু করা যেতে পারে। রূহামা ফাউন্ডেশন মৌলভীবাজার তাদের কর্মসূচীতে এসব বিষয় অন্তর্ভূক্ত রেখেছেন শুনে আনন্দিত হয়েছি।
১৫. ওয়াজ নসীহতে সংস্কার সাধন : ওয়াজ নসীহত মানুষ ও সমাজের প্রাচীনতম শুদ্ধিকরণ প্রকৃয়া। এ প্রকৃয়ায় নবী-রাসূলগণ কাজ করে গেছেন। বর্তমানে যে ওয়াজ নসীহতের ধারা প্রচলিত তাতে কিছুটা বিকৃতি সন্বিবেশিত হয়েছে। এজন্য হাকীমূল উম্মত থানভী রহ. এর যে সংস্কার প্রস্তাব করে গেছেন তা বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ওয়াজ নসীহতকে রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের আলোকে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। এ বিষয়ে আলেমদরই পদক্ষেপ নিতে হবে। ওয়াজ নসীহতকে মানুষের হেদায়েত প্রাপ্তির বাহন হিসেবে উপস্থাপন জরুরী। সুরেলা বে-আমল পেশাদার ওয়ায়েজদের ওয়াজ দ্বারা মানুষের হিদায়েত ও দ্বীনের উজ্জীবন সম্ভব নয়। আমলদার বা-নিসবত আলেমদের দিয়ে সমাজের সমস্যা চিহ্নিত করে বিষয় ভিত্তিক স্বল্পকালীণ ওয়াজ নসীত এর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মানুষের মাঝে বিরক্তি উদ্রেককারী সারা রাতব্যাপী ওয়াজ নসীহত পরিহার করা প্রয়োজন।

১৬. তাযকিয়া ও ইহসান
একজন ডাক্তার এমবিবিএস ফাইন্যাল পরীক্ষা দেওয়ার পরও তাকে দুই বছর ইন্টার্নিশীপ করতে হয়, সনদ লাভের পূর্বে অভিজ্ঞ ডাক্তার ও প্রফেসরদের অধীনে থেকে চিকিৎসায় হাতে কলমে তা‘লীম নিতে হয়। লন্ডন থেকে বার এট ল পাশ করে এসেই কেউ কোর্টে প্রাকটিস শুরু করতে পারে না। তাকে একজন সিনিয়রে অধীনে অনেক দিন কজ করতে হয়। ইসলামী শিক্ষায়ও আগে এধারা চালু ছিল। উচ্চতর শিক্ষা সমাপনীর পর পরই কোন না কোন বুযুর্গের সুহবতে থেকে অর্জিত ইলমের সাথে আমলের সমন্বয় সাধন, আমল ও আখলাক গঠন, মন্দ আচরণ ও সভাব চরিত্রের সংশোধন, মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং রাসূলুল্লাহ সা. এর সুন্নাহর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকৃত অর্থে নায়েবে নবী হিসেবে গড়ে তুলার প্রকৃয়া এখন প্রায় রুদ্ধ হতে চলেছে। ধরে ধরে, খোঁজে খোঁজে আলেমদের সংশোধন করার মানুষ বিরল হতে চলেছেন। অথচ আপনার আমার সকলের জন্য এটি বড় প্রয়োজন। নাই-নাইয়ের মাঝেও যারা আছেন তাঁদের সাথে নিসবত কায়েম করে তরুণ আলেমদের আত্মসংশোধনে ব্রতী হওয়া উচিৎ বলে মনে করি।

১৭. উন্নয়ন উৎপাদনে অংশিদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা
অন্যান্য শ্রেণী পেশার মানুষের মত আলেমদের উন্নয়ন উৎপাদনে লেগে যাওয়ার কথা বলছিনা। সমাজের ধর্মীয় নেতৃত্ব এখনো পর্যন্ত তাদের হাতে থাকার কারণে কিছু কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণা সরবরাহ করে তারা বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারেন। যেমন বেকারত্ব অবসানে যুবকদের ট্রেড ট্রেনিং ও ভাষা শিক্ষায় উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরীতে ভূমিকা রাখা যায় এবং বহির্বিশ্বে কর্মসংস্থান করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখা যায়। আমাদের পাশের দেশ ভারতে আলেমরা তা করে যাচ্ছেন। এক জরিপে জানা গেছে সিলেট বিভাগে অনাবাদী জমির পরিমাণ ৭৪ লক্ষ হেক্টর। এ জমি আবাদ করা, এক ফসলা জমিকে দুই ফসলা করা, বৃক্ষরোপণ বণায়ন সমন্বিত খামার, দুগ্ধ খমার ইত্যাদি উন্নয়ন ও উৎপাদনমূলক কাজে যুবকদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে উদ্বুদ্ধ করে আমরা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারি।
দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণা সরবরাহের কথা বলছিলাম, দেখুন এটা জৈষ্ঠ মাস। প্রতিটি মাছের পেটে ডিম। বৈশাখ জৈষ্ঠ দুই মাস মাছ শিকার নিষিদ্ধ করে আইন আছে। এই দুই মাস দেশীয় মাছের প্রজনন কাল। দুই মাস মাছ না মারলে বাকী ১০ মাস দেশের মানুষ পর্যাপ্ত পরিমাণ মাছ খেতে পারবে। এ আইন একান্তই দেশের মানুষের স্বার্থে করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ সমানে মাছ মারছে। মা মাছ, ডিম ওয়ালা মাছ পণা মাছ সব মারছে। কারেন্ট জাল ব্যবহার করে দেশীয় প্রজাতির মাছ নির্মূল করা হচ্ছে। এ যেন মৎস নির্মূল অভিযান চলছে দেশে । গ্রামের মানুষ আইন মানছে না। আমাদের এই গরীব দেশের ১৬ কোটি মানুষের পুষ্টি বিধানে মাছ একটি বড় ভূমিকা রাখে। মাছের চাহিদা পূরনে বার্মা থেকে সন্দেহযুক্ত মাছ এনে আমাদের খেতে হয়। এ অবস্থার উন্নয়নে আলেম ও ইমামগণ কার্যকর অবদান রাখতে পারেন। দেশের অবস্থার প্রেক্ষাপটে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও জীব বৈচিত্র রক্ষা এবং মানুষের রিযিক রক্ষায় মা মাছ, ডিম ওয়ালা মাছ, ও পণা মাছ মারা নিষিদ্ধ হওয়ার দাবী রাখে কি না তা ভেবে দেখা দরকার। কমপক্ষে গ্রামে গ্রামে মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করার কাজটি আমরা করতে পারি এবং জুমআর খুৎবায় আলোচনা করতে পারি।

১৮. মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা
মানবিক হওয়া একজন মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে অনেক অকল্যাণ থেকে বাঁচা যায় এবং কল্যাণের পথে হাটা যায়। আমরা ফিকহের অনেক মাসআলা পড়ি ও পড়াই। যে গুলোর সাথে মানবিক দৃষ্টিকোণ যুক্ত হলে সোনায় সোহাগা হত। যেমন নেফাসের মাসআলাই ধরুন, একজন নারীর ৪০ দিন পর্যন্ত প্রসব পরবর্তী রক্তপাত হতে পারে, এসময়ে নামায রোযা কুরআন তিলাওত নেই। মাসআলা এখানে শেষ। কিন্তু একাধারে ৪০ দিন বা অধিক পরিমাণ রক্তপাত হলে একজন সদ্য সন্তান প্রসবিনী মা রক্তশুন্য হয়ে মারা যেতে পারে, তাকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করা দরকার (যার সহজ ও উপযুক্ত চিকিৎসা আছে) এ বিষয়টি যুক্ত থাকলে শিক্ষার্থীদের মনে মানবিক বিকাশ ঘটবে। মানবাধিকার বিষয়ে ইসলামে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ এর ধর্মতত্ত্ব বিভগের অধ্যাপক শায়খ মুহাম্মদ উসাইমিন হাক্কুল ইবাদকে নয় ভাগে ভাগ করেছেন। ১. রাসূলুল্লাহ সা. এর হক ১. পিতা-মাতার হক ৩. সন্তানের হক ৪. স্বামী-স্ত্রীর হক, ৫. নিকটাত্মীয়দের হক, ৬. প্রতিবেশীর হক, ৭. শাসক শাসিতের হক, ৮. সাধারণ মুসলমানরে হক, ও ৯. অমুসলিমের হক। এ বিষয়গুলো বিশ্লেষণী ভাষায় জন-মানুষের সামনে উপস্থাপন ও এসব অধিকার আদায়ে মানুষকে দায়িত্বশীল করা আমাদের কর্তব্য। বর্তমানে মানুষকে নিজ নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে কিন্তু দায়িত্ব পালনে মানুষ গাফিল ও উদাসিন। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরী।
১৯. জাতীয় ও আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখা
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের কিছু জাতীয় সমস্যা রয়েছে। যেমন নিরক্ষরতা, বেকারত্ব, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অদক্ষতা, পানি মাটি বায়ূ ও শব্দ দুষন, সীমান্ত হত্যা, খুন, গুম, মাদকাসক্তি, মানব পাচার, যৌতুক, নদী ভাঙ্গন, ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষ, দিনে দিনে কৃষি জমি কমে যাওয়া, জীব বৈচিত্র ধবংস হওয়া, পহাড় বন বনানী ও বৃক্ষ নিধন, খাদ্যে ভেজাল ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধানে এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে কুরআন সুন্নাহর আলোকে বক্তব্য উপস্থান করে আমরা ইতিবাচক অবদান রাখতে পারি।
তেমনিভাবে আঞ্চলিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকা, সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার মানোন্নয়ন, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিবেশ পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা, মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করা, গ্যাস বিদ্যুৎ প্রপ্তি, সম্প্রীতি ও শৃংখলা রক্ষায় অংশিদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখা। এসব কাজের জন্য বহু সংস্থা প্রতিষ্ঠান ও এজেন্সি আছে। অবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে আমরা সমাজের গেইট কিপার হিসেবে আমাদের সাধ্য সক্ষমতা ও সঙ্গতি অনুযায়ী তাঁদের সাথে সহযোগিতা করে যেতে পারি।

উপসংহার : একটি ঘটিতে যেমন এক পুকুর পনি ভরা যায় না তেমনি একটি প্রবন্ধে একটি গ্রন্থের বিষয় সামাল দেয়া যায় না। আলোচ্য বিষয়কে উপজীব্য করে পয়েন্ট আকারে সংক্ষিপ্তভাবে আদর্শ সমাজের উপাদান, সমাজ গঠনে কওমী মাদরাসার ভূমিকা, কওমী মাদ্ররাসা সম্পর্কে কিছু অভিযোগের কিঞ্চিৎ জবাব বর্তমানে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব কর্তব্য বিষয়ে কিছু আলোচনা করা হলো। দায়িত্বশীলতার সাথে পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে এ কাজগুলো অব্যাহত রাখতে পারলে সমাজের অবক্ষয় রোধ করে একটি আদর্শ নিরাময় সমাজ বিনির্মাণের পথে আমরা অগ্রসর হতে পারবো। সমাজ পরিচালনায় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব দিতে পারবো। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন। আমীন।
——————————————————————
২২ মে ২০১৪ বৃহস্পতিবার, রূহামা ফাউন্ডেশন মৌলভীবাজার কর্তৃক আয়োজিত
মৌলভীবাজার সাইফুর রহমান অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য সেমিনারের মূল প্রবন্ধ।
উপশহর, সিলেট : তারিখ : ১৭ রজব ১৪৩৫; ৩ জৈষ্ঠ ১৪২১; শনিবার; ১৭ মে ২০১৪

-শা হ ন জ রু ল ই স লা ম