ঈসা (আ) ও রাসুলুল্লাহ (স৷) এর মধ্যবর্তী যুগের কয়েকটি ঘটনা

ঈসা (আ) ও রড়াসুলুল্লাহ (না)-এর মধ্যবর্তী
যুগের কয়েকটি ঘটনা

(ক) কাষা নির্মাণ

কেউ কেউ বলেন, সর্বপ্রথম যিনি কাবা ঘর নির্মাণ করেন তিনি হলেন আদম (আ)
আবদুল্লাহ্ ইবন অড়ামর বর্ণিত এ সম্পর্কে একটি মারফু হাদীসও আছে ৷ তবে এর সনদে ইবনুল
হায়আ নামক একজন দুর্বল রাবী রয়েছেন ৷ বিশুদ্ধতর অভিমত হলো, সর্বপ্রথম যিনি কাবা ঘর
নির্মাণ করেছেন, তিনি হলেন ইব্রাহীম (আ) ৷ ইতিপুর্বে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে ৷
সিমাক ইবন হারব আলী ইবন আবু তড়ালিব থেকে এরুপ বর্ণনা করেছেন ৷ আলী (রা ) বলেন,
অতঃপর কাবাঘর ধ্বংস হয়ে গেলে আমালিকা বংশীয়রা তা নির্মাণ করে ৷ তারপর আবারও
ধ্বংস হলে জুরহুম বংশীয়রা তা নির্মাণ করে ৷ পুনরায় ধ্বংস হলে এবার কুরাইশরা তা নির্মাণ
করে ৷ কুরাইশের কাবাঘর পুনঃনির্মাণের আলোচনা পরে আসছে ৷ তা ঘটেছিল নবী করীম
(না)-এর নবুওত লাভের পাচ বছর , মতান্তরে পনের বছর আগে ৷ যুহরী বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা)
তখন যৌবনে উপনীত ৷ যথাস্থানে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইন্শাআল্পাহ ৷

(ণ) কা ব ইৰ্ন ষ্ওস্টয়াই

আবু নু’আয়ম আবু সালামা সুত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, কাব ইবন লুওয়াই
প্রতি শুক্রবার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে সমবেত করে ভাষণ দিতেন ৷ কুরাইশরা সে দিনটিকে
বলতো আরুবা’ ৷ বক্ততায় তিনি বলতেন, হে লোক সকল ! তোমরা শ্রবণ কর, শিক্ষা লাভ কর
ও অনুধাবন কর ! অন্ধকার রাত, আলোকােজ্জ্বল দিন বিছানা স্বরুপ পৃথিবী ছাদ আকাশ স্বরুপ,
কীল্কস্বরুপ পাহাড়রাজি আর পথ নির্দেশক তারকারাজি আগের পরের নির্বিশেষে সকল
সকল, নারী ও পুরুষ সর্বপ্রথম স্বীকারােক্তি ফ্লেৰু-এর প্রতি ইঙ্গিতকারী বিষয় এবং রুহ ৷ তোমরা
রক্তের আত্মীয়তা বজায় রেখে চল ৷ বৈবাহিক সম্পর্ক রক্ষা কর ৷ অর্থ-সষ্পদকে ফলপ্রদ বানাও ৷
মৃত্যুবরণকারী কাউকে কি তোমরা ফিরে আসতে কিত্বা মৃত ব্যক্তিকে পুনরুথিত হবে দেখেছা
আসল বাড়ী তোমাদের সম্মুখে ৷ তোমরা যা বলছ, ব্যাপার তার বিপরীত ৷ তোমাদের মর্যাদাকে
তোমরা উৎকর্ষিত করে তােল এবং এর উপর দৃঢ় থাক ৷ অচিরেই আসছে এক মহা সংবাদ ৷
মহান এক নবী আত্মপ্রকাশ করছেন বলে ৷ অতঃপর তিনি আবৃত্তি করেন ?

— রাত ও দিন প্রত্যহ নিত্য-নতৃন ঘটনা নিয়ে আসছে ৷ সেই রাত ও দিন সবই আমাদের
জন্য সমান ৷ বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়ে রড়াত-দিন ফিরে আসে ৷ প্রভুত প্রাচুর্য নিয়ে আমাদের
উপর তার আবরণ ঢেলে দেয় ৷ নবী মুহাম্মদ এসে পড়বেন তোমরা টেরও পাবে না ৷ এসে
তিনি বহু সংবাদ প্রদান করবেন, সংবাদদাতা হবেন মহা সত্যবাদী ৷

অতঃপর তিনি বলতেন০ ং সেদিন পর্যন্ত যদি আমি বোচ থাকত ৷ম ,তড়াহলে অবশ্যই আমি
উটের উপর দাড়িয়ে থাকার ন্যায় ঠায় দাড়িয়ে থাকতাঃ এবং বাছুরের ন্যায় দৌড়াতড়াম ৷
তারপর বললেন :

হার, যেদিন সমাজের মানুষ সত্যকে পদানত করতে চইিবে, সেদিন যদি আমি তার
দাওয়াতের সামনে উপস্থিত থাকতে পারতড়াম ৷

বর্ণনাকারী বলেন, কাব ইবন লুওয়াই এর মৃত্যু এবং রাসুল (না)-এর নবুওত লাভের
মাঝে ব্যবধান ছিল পড়াচশত ষাট বছর ৷

(গ) যমযম কুপ পুনঃখনন

জুরহুম গোত্র যমযম কুপ বন্ধ করে দেয়ার পর থেকে আবদুল মুত্তালিবের সময়কাল পর্যন্ত
তার কোন চিহ্ন বিদ্যমান ছিল না ৷ মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন যে, একদা আব্দুল
ঘুত্তালিব হিজরে তথা হাতীমে ঘুমিয়ে ছিলেন ৷ এসম্পর্কে তিনি বলেন যে, হিজরে ঘৃমম্ভ অবস্থায়
আমি স্বপ্নে দেখালাম ৷ এক ব্যক্তি এসে বলল, তুমি তড়ায়ােবা’ খনন কর ৷ ’ আমি জিজ্ঞাসা
করলাম, তড়ায়ােবা কী ? কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়েই যে চলে গেল ৷ পরদিন রাতে
আমি যখন বিছানায় গেলাম এবং ঘুমিয়ে পড়লাম, লোকটি এসে পুনরায় আমাকে বলল,
বাররা’ খনন কর ! আমি জিজ্ঞাসা করলাম, বাররা’ কী ? লোকটি আমাকে জবাব না দিয়েই
চলে গেল ৷ তৃতীয় রাতে আবারো স্বপ্নে দেখলাম যে, কে যেন আমাকে বলছে, মাযনুনা খনন
কর ৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, মড়াযনুনা কী ? পরের রাতে আবারো এসে সে বলল, যমযম
খনন কর ৷’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, যমযম কী ? সে বলল, যা কখনো শুকাবে না, মহান
হার্জীগণ যার পানি পান করবেন ৷ গোবর ও রক্তের মধ্যখানে যার অবস্থান, সাদা পা বিশিষ্ট
কড়াকের নিকটে, পিপড়ার বসতির কাছে ৷

আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (২য় খণ্ড) ৫৮-

আব্দুল মুত্তালিব বলেন, পরিচয় ও জায়গার নির্দেশনা পেয়ে আমি কোদাল নিয়ে সেখানে
গেলাম ৷ পুত্র হারিছ ইবন আব্দুল মুত্তালিবও সঙ্গে ছিল ৷ সে সময় পর্যন্ত তার অন্য কোন পুত্র
ছিল না ৷ খনন কার্য শুরু হয়ে এক সময়ে তা ণ্শষ হলো ৷ আব্দুল মুত্তালিব পানি দেখতে পেয়ে
উচ্চস্বরে আল্লাহ আকবর বলে উঠলেন ৷ তাকবীর ধ্বনি শুনে কুরাইশরা বুঝল যে, আব্দুল
মুত্তালিব এর উদ্দেশ্যে হাসিল হয়ে গেছে ৷ ফলে তারা তার নিকট শ্ন্শুায়ে বলল, হে আব্দুল
মুত্তালিব ! আপনি যে কুপের সন্ধান পেয়েছেন, তা আমাদের পিতা ইসমাঈলের কুপ এবং
নিঃসন্দেহে তাতে আমাদের অধিকার আছে ৷ অতএব আমাদেরকে তার ভাগ দিতে হবে ৷
আব্দুল মুত্তালিব বললেন, না, তা হবে না ৷ এ কুরুপ শুধু আমাকেই দেওয়া হয়েছে, এতে
তোমাদের কোন অংশ নেই ৷ কুরাইশরা বলল, আমরা এর দাবি ছাড়ব না ৷ প্রয়োজনে
আপনার সঙ্গে লড়াই করে হলেও আমরা আমাদের অধিকার আদায় করে ছাড়ব ৷ আব্দুল
মুত্তালিব বললেন, ঠিক আছে, তা-ই যদি করো, তা হলে একজন লোক ঠিক কর, আমরা তার
উপর এর বিচারের তার অর্পণ করব ৷ কুরাইশরা বলল, বনু সাদ ইবন হুয়াইমের গণক
ঠাকুরণীর কাছে চলুন ৷ আব্দুল মুত্তালিব বললেন, ঠিক আছে ৷ এই গণক ঠাকুরণীর আবাসস্থল
ছিল সিরিয়ার দিকে ৷

আব্দুল মুত্তালিব রওয়ানা হলেন ৷ সঙ্গে তার বনু উমাইয়া এবং কুরাইশের প্রত্যেক গোত্রের
একজন করে একদল লোক ৷ তখনকার দিলে তা ছিল এক বিরান মরু প্রাতর ৷ এক সময়ে
আব্দুল মুত্তালিব ও তার সঙ্গীদের পানি শেষ হয়ে গেল ৷ তারা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লেন ৷
এমন কি প্রাণ হারারার উপক্রম হল ৷ ফলে আব্দুল মুত্তালিবের সঙ্গীরা অন্যদের নিকট পানি
চাইল ৷ কিন্তু তারা পানি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলল, আমরা নিজেরাও তোমাদের মত এ মরু
প্রান্তরে বিপন্ন হওয়ার আশংকা করছি ৷ অগত্যা আব্দুল মুত্তালিব সঙ্গীদেরকে বললেন, পায়ে
কিছুটা শক্তি-সামর্থ্য থাকতেই তোমরা নিজেদের জন্য গর্ত খনন করে রাখ, যাতে কেউ মারা
গেলে সঙ্গীরা তাকে সেই গর্ভে পুতে রাখতে পারে ৷ এভাবে সর্বশেষ একজন হয়ত সমাধি থেকে
বঞ্চিত হবে ৷ তা হয় হোক ৷ গোটা কাফেলা বিনা দাফনে থাকা অপেক্ষা একজন থাকাই ভালো ৷
সঙ্গীরা বলল, আপনার এই আদেশ অতি উত্তম ৷ আমরা তাই করব ৷ প্রতেক্লকেই নিজের জন্য
গর্ত খনন করল এবং বসে মৃত্যুর অপেক্ষা করতে লাগল ৷

অতঃপর আব্দুল মুত্তালিব সাথীদের বললেন, আমরা এভাবে নিজেদেরকে মৃত্যুর হাতে
সােপর্দ করে বসে রইলাম ৷ চেষ্টা করলে হয়ত আল্লাহ কোন প্রকারে পানির ব্যবস্থা করেও
দিবেন ৷ বসে না থেকে তোমরা সামনে অগ্রসর হয়ে দেখ ৷ তারা রওয়ানা হলো ৷ আব্দুল
মুত্তালিবের উট উঠে র্দাড়াতেই তার পায়ের নীচ থেকে সুমিষ্ট পানির ফোয়ারা বইতে শুরু
করল ৷ আব্দুল ঘুত্তালিব তাকবীর ধ্বনি দিয়ে উঠলেন ৷ সংগীরাও তাকবীর দিয়ে উঠল ৷ আব্দুল
মুত্তালিব বাহন থেকে নেমে পানি পান করলেন ৷ সংগীরাও পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করল
এবং আপন আপন মশক ভরে নিল ৷ অতঃপর আব্দুল মুত্তালিব কুরাইশের গোত্রসমুহের
প্রতিনিধিদেরকে আহ্বান করলেন ৷ এতক্ষণ তারা তাকিয়ে এসব অবস্থা দেখছিল ৷ আব্দুল
মুত্তালিব বললেন, “এসো এসো এই যে পানি ! আল্লাহ আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করেছেন ৷

তারাও সেই পানি পান করল এবং পরিতৃপ্ত হলো ৷ অতঃপর বলল, আল্লাহ আপনাকে আমাদের
উপর বিজয়ী করেছেন ৷ শপথ আল্লাহর, যমযমের ব্যাপারে আমরা আপনার সঙ্গে আর কখনো
বিবাদ করব না ৷ এই মরু অঞ্চলে যিনি আপনাকে এ পানি দান করলেন, তিনিই আপনাকে
যমযম দান করেছেন ৷ অতএব নিরাপদে আপনি আপনার কুপের নিকট ফিরে যান ৷ আব্দুল
মুত্তালিব ফিরে গ্যেলেন ৷ প্রতিপক্ষও তার সঙ্গে ফিরে গেল ৷ যমযম সম্পর্কিত বিবাদের মীমাংা
এভাবেই হয়ে গেল ৷ গণক ঠাকুরণীর কাছে আর যাওয়ার প্রয়োজন হলো না ৷ তারা তার হাতে
যমযমের অধিকার ছেড়ে দিল ৷

ইবন ইসহাক বলেন, এই হলো আলী ইবন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত যমযম
সম্পর্কিত বর্ণনা ৷ অন্য এক সুত্রে আমি শুনেছি যে, আব্দুল মুত্তালিব বর্ণনা করেছেন, স্বপ্নে যখন
তাকে যমযম খনন করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তখন এ-ও বলা হয়েছিল এরপর তুমি
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পানির জন্য দোয়া করবে ৷ আল্লাহর ঘরের হড়াজীরা তা পান করবে ৷ এই কুপ
যতদিন টিকে থাকবে, তা থেকে কোন ভয়ের কারণ থাকবে ণ্ন্া ৷

বর্ণনড়াকারী বলেন, এ সময় আব্দুল মৃত্তালিব কুরাইশেয় নিকট গিয়ে বললেন, তোমরা জেনে
রাখ, আমি যমযম খননের জন্যে আদিষ্ট হয়েছি ৷ তারা জিজ্ঞাসা করল, যমযম কোথায় তা কি
আপনাকে বলে দেওয়া হয়েছে? আব্দুল মুত্তালিব বললেন, না জানানো হয়নি ৷ লোকেরা বলল
তা হলে এ স্বপ্নটি যে বিছানায় শুয়ে দেখেছিলেন, আজও সে বিছানায় ঘুমাবেন ৷ এই স্বপ্ন যদি
সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থােক হয়ে থাকে, তা হলে আল্লাহ বিষয়টা বিস্তারিত জানিয়ে দিবেন ৷
আর যদি তা’ শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তাহলে সে আর আসবে না ৷ আব্দুল মুত্তালিব
ফিরে গেলেন এবং ঘুমিয়ে পড়লেন ৷ এবারও স্বপ্ন দেখলেন, কে যেন বলছে, যমযম খনন কর,
যদি তুমি তা কর তা হলে লজ্জিত হবে না ৷ তা তোমার মহান পিতার উত্তরাধিকার; কখনো
তা’ শুকাবে না ৷ হাজীগণকে তুমি তা’ থেকে পান করাবে ৷ মানতকারীরা সেখানে প্রাচুর্যের জন্য
মানত করবে ৷ তা পৈত্রিক সম্পত্তি হবে এবং মজবুত বন্ধন হবে ৷ তার স্থান তুমি জান আর তা
রক্ত ও গোবরের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে ৷

ইবন ইসহাক বলেন, আব্দুল ঘুত্তালিবকে যখন স্বপ্নে এ সব কথা বলা হলো, তখন তিনি
জিজ্ঞাসা করলেন, কুপটির অবস্থান কোথায়? বলা হলো পিপড়ের ঢিবির নিকট ৷ আপামীকাল
ওখানে কাক ঠোক্রাবে ৷

উক্ত বিবরণ দৃ’টির কোনটি যথার্থ, তা আল্লাহ্ই ভাল জানেন ৷ আব্দুল ঘুত্তালিব পরের দিন
পুত্র হারিছকে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন ৷ সে সময়ে হারিছ ছাড়া তার আর কোন পুত্র ছিল না ৷
উমুবীর বর্ণনা মতে, তার গোলাম পিপড়ের ঢিবিতে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, আসাফ ও নায়লা
মুর্তিদ্বয়ের মধ্যখানে কাক ঠোকরাচ্ছে ৷ এই দুই মুর্তির নিকট কুরাইশরা পশু বলি দিত ৷ আব্দুল
মুত্তালিব কােদাল দিয়ে মাটি খুড়তে শুরু করেন ৷ দেখে কুরাইশের লোকেরা ছুটে এসে বলল,
আল্লাহ্র কসম! আমরা তোমাকে এই জায়গার মাটি খুড়তে দেব না ৷ আমাদের দুই দেবতার
মধ্যকার এই স্থানে আমরা পশু বলি দেই ৷ শুনে আব্দুল মুত্তালিব পুত্র হারিছকে বললেন, আমি

কুপ খনন করা পর্যন্ত তুমি আমার হেফাজতের ব্যবস্থা কর ৷ আল্লাহর কসম, আমি যে কাজের
আদেশ পেয়েছি, তা আমি বাস্তবায়ন করবই ৷ আব্দুল মুত্তালিবের দৃঢ়তা দেখে কুরাইশের
লোকেরা তাকে আর খনন কাজে বাধা দিল না ৷

আব্দুল মুত্তালিব খনন কার্য চালাতে থাকলেন ৷ অল্প একটু খনন করার পরই পানি বেরিয়ে
এলো ৷ আব্দুল মুত্তালিব তাকবীর ধ্বনি দিয়ে উঠলেন এবং পরিষ্কার বুঝতে পারলেন যে , তিনি
যে স্বপ্ন দেখেছেন, তা সত্য ৷

বেশ কিছুটা খনন করার পর আব্দুল মুত্তালিব তাতে স্বর্ণের দু’টি হরিণ মুর্তি পান ৷ জুরহুম
গোত্র এখানে তা পুতে ব্লেখেছিল ৷ সেখানে তিনি কয়েকটি তলোয়ার এবং কিছু বর্ষ পেলেন ৷
দেখে কুরাইশরা বলল, “আব্দুল মুত্তালিব ৷ এতে তোমার সঙ্গে আমাদের ভাগ আছে ৷” আব্দুল
মুত্তালিব বললেন, “না, তা হবে না ৷ তবে একটি সুরাহায় আসতে পার ৷ এসো লটারীর
মাধ্যমে আমরা এর মীমাংসা করি ৷ ” কুরাইশরা বলল, তা কিভাবে হবে বলুন ৷ আব্দুল মুত্তালিব
বললেন, কাবার নামে দুটি তীর নাও ৷ আমার নামে নাও দুটি এবং তোমাদের নামে দুটি ৷
যার তীর যে জিনিসটির উপর গিয়ে পড়বে সে তার মালিক হবে আর যার তীর লক্ষ্যচ্যুত
হবে, সে কিছুই পাবে না ৷ কুরাইশরা বলল, আপনার প্রস্তাবটি ন্যায়সঙ্গত ৷

আব্দুল মুত্তালিব কাবার নামে দুটি হলুদ তীর নিলেন ৷ নিজের জন্য নিলেন দু’টি কালো
তীর এবং কুরাইশদের জন্য নিলেন দু’টি সাদা তীর ৷ কুরাইশের বড় দেবতা তার নিকটবর্তী
তীর নিক্ষেপকারীর নিকট তীরগুলি অর্পণ করে ৷ হোবল যে কারণে আবু সুফিয়ান ওহুদ যুদ্ধের
দিন বলেছিল হোবলের জয় হোক- আব্দুল মুত্তালিব অ ৷ল্লাহ্র নিকট দোয়া করতে লাগলেন :

হে আল্লাহ! আপনি প্রশংসিত রাজাধিরাজ ৷ আপনি আমার প্রতিপালক আপনিই সৃষ্টির
সুচনাকারী এবং পুনঃসৃষ্টিকারী ৷ আপনি পাথুরে পাহাড়কে সুদৃঢ় করে রেখেছেন ৷ আপনার নিকট
থেকে আসে অর্থ ও পশু সম্পদ ৷ আপনি চাইলে আমার মনে ইলহাম করবেন কাবার ঐ স্থানটি
যেখানে ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ)এর স্বর্ণালঙ্কার ও অস্ত্রশস্ত্র প্রোথিত রয়েছে ৷ আজ আপনি
আমাকে অবহিত করেন আপনার ইচ্ছা যদি আপনার মর্জি হয় ৷ আমি শপথ করেছি ৷ আপনি
আমাকে তা দিয়ে দিন ৷ আমি আর কিছু চইিবাে না ৷

এবার তীর নিক্ষেপ শুরু হলো ৷ হলুদ তীর দু’টি গিয়ে হরিণ মুর্তির উপর পতিত হলো ৷ যা’
ছিল কাবার জন্য ৷ কালো দু’টি গিয়ে পড়ল তরবাৰী ও বর্যগুলাের উপর ৷ এগুলো পেলেন

আব্দুল মুত্তালিব ৷ কুরাইশদের সাদা ৷ভীর দু ’টো লক্ষ্যচ্যুত হলো ৷ আব্দুল মুত্তা ৷লিব তরবারী এবং
হরিণ মুর্তি দু ’টি কা বার দরজায় স্থাপন করে রাখেন ৷ লোকের ধারণা তা-ই ছিল কা বার পায়ে
প্রথম সোনার অলংকার ৷ তারপর আব্দুল মুত্তালিব যমযম ক্যুপ হাজীদের পানি পানের ব্যবস্থা
করেন ৷

ইবন ইসহড়াক প্রমুখ বলেন, আব্দুল মুত্তালিবের আমলে যমযম উদধাটিত হওয়ার আগে
মক্কায় আরো অনেকগুলো কুপ ছিল ৷ ইবন ইসহাক সেগুলোর সংখ্যা এবং নামধামও উল্লেখ
করেছেন ৷ সবশেষে বলেন, কিন্তু যমযম অন্যসব কুপের উপর প্রাধান্য লাভ করে এবং মানুষ
অন্যান্য কুপ ছেড়ে যমযমের প্রতি ছুটে আসে ৷ কারণ যমযম মসজিদুল হারামে অবস্থিত ৷ আর
এর পানি সব কুপ অপেক্ষা উত্তম ৷ সর্বোপরি, যমযম ইব্রাহীম (আ)-এর পুত্র ইসমাঈল
(আ)-এর কুপ ৷ আরদে মানাফের গোত্র এই কুপ নিয়ে কুরাইব্;শর অন্যান্য গোত্র এবং সমস্ত
আরবের উপর পর্ব করত ৷

হযরত আবৃযর (রা) এর ইসলাম গ্রহণ বিষয়ক মুসালম রীৰুফর এক হাদীসে আছে যে
রাসুলুল্লাহ (সা) যমযম সম্পর্কে বলেছেনং : ণ্ছু ; ৷ব্লুদ্বু প্রু ওাষ্ ণ্া;াদ্বু ষ্ ৷

“এই যমযম তার পানকারীর জন্য খাদ্য স্বরুপ এবং তা রোগের নিরাময়ও বটে ৷

ইমাম আহমদ হযরত জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা)-এর বরাতে বলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা)
বলেছেনঃ

“যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয় তা পুরণ হয় ৷”
ইবন মাজাহ্র বর্ণনায় এর পাঠ হচ্ছে

হাকিম (র) ইবন আব্বাস (রা) এর বরাতে বর্ণনা ৷করেন যে, তিনি জনৈক ব্যক্তিকে
বলেছেন, তুমি যখন যমযমের পানি পান করবে, তখন কিবলার দিকে মুখ করবে, বিসমিল্লাহ
বলবে, তিন নিঃশ্বাসে পান করবে এবং পরিতৃপ্তি সহকারে পান করবে ৷ যখন পান করা শেষ
করবে, তখন আল-হামদৃ লিল্লাহ’ বলবে ৷ কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা) বল্যেছন : “আমাদের ও
মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্য হলো, ওরা যমযমের পানি তৃপ্তি সহকারে পান করে না ৷ ”

আব্দুল মুত্তালিব থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন : “হে আল্লাহ! এই যমযমের পানি
আমি পােসলকারীর জন্য হালাল মনে করি না ৷ যমযমের পানি পানকারীর জন্য বৈধ ৷” কেউ
কেউ এ উক্তিটি আব্বাস (রা)-এর বলে মত প্রকাশ করলেও বিশুদ্ধ মতে এটি আবদুল
মুত্তালিবেরই উক্তি ৷ কেননা তিনিই এটি পুনঃ খনন করেছিলেন ৷

উমাবী তার মাগাযীতে বর্ণনা করেছেন যে, আবু উবড়ায়দ ইয়াহ্ইয়া ইবন সাঈদ ও আব্দুর
রহমান ইবন হারমালড়াহ সুত্রে বর্ণনা করেছেন ৷ আব্দুর রহমান ইবন হারমালা বলেন, আমি
সাঈদ ইবন মুসড়ায়ব্রুড়াবকে বলতে শুনেছি যে, আব্দুল মুত্তালিব ইবন হাশিম যখন যমযম খনন
করলেন তখন বলেছিলেন, “এই কুপ পােসলকারীর জন্য হড়ালাল নয়, এটি কেবল পানকারীর
জন্যই বৈধ ৷” তিনি যমযম কুপে দু’টি হাউজ তৈরি করে দিয়েছিলেন ৷ একটি পান করার জন্য

অপরটি ওজু করার জন্য ৷ তখন তিনি বলেছিলেন, একে আমি গোসলের জন্য ব্যবহারের
অনুমতি দেবে না ৷ তার উদ্দেশ্যে ছিল মসজিদকে পবিত্র রাখা ৷

আবু উবায়দ অন্য এক সুত্রে বর্ণনা করেছেন যে, আসিম ইবন আবুন্নাজুদ আব্বাস (রা) কে
বলতে শুনেছেন, আমি একে পােসলকারীর জন্য হালাল করব না এটি পানকারীর জন্য বৈধ ৷
আব্দুর রহমান ইবন মাহ্দী সুফিয়ান ও আব্দুর রহমান ইবন আলাকামা সুত্রেও ইবন আব্বাস
(বা) থেকে অনুরুপ বর্ণিত আছে ৷

মুলত যমযমের পানি দ্বারা গোসল করা নিষিদ্ধ নয় ৷ কিন্তু আব্দুল মুত্তালিব ও আব্বাস (বা)
এ কাজ থেকে মানুষকে নিরুৎসাহিত করার জন্য এমনটি বলেছিলেন বলে মনে হয় ৷

উল্লেখ্য যে, আব্দুল মুত্তালিব যতদিন বেচে ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত তিনিই যমযমের
তত্ত্বাবধানের দাযিতু পালন করেন ৷ তার মৃত্যুর পর সেই দায়িতু পুত্র আবু তালিবের উপর
ন্যান্ত হয় ৷

আবু তালিব অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েন ৷ বাধ্য হয়ে তিনি তার ভাই আব্বাস-এর নিকট থেকে
দশ হাজার মুদ্রা ঋণ নিয়ে হাজীদের জন্য যমযমের কাজে ব্যয় করেন ৷ কথা ছিল , পরের বছর
সে ঋণ গােধ করে দেবেন ৷ কিন্তু একবছর চলে যাওয়ার পরও আবু তালিবের স্বচ্ছলতা ফিরে
আসল না ৷ তাই তিনি আব্বাসকে বললেন, তুমি আমাকে চৌদ্দ হাজার মুদ্রা ঋণ দাও ৷ আগামী
বছর আমি তোমার সব পাওনা পরিশোধ করে দেব ৷ জবাবে আব্বাস (রা) বললেন, এই শর্তে
দিতে পারি যে, যদি আপনি যথাসময়ে ঋণ শেড়াধ করতে না পারেন, তাহলে যমযমের কর্তৃতু
আমার হাতে চলে আসবে ৷ আবু তালিব শর্তটি মেনে নেন ৷ এক বছর চলে যাওয়ার পরও আবু
তালিব ঋণ পরিশোধ করার কোন ব্যবস্থা করতে পারলেন না ৷ ফলে শর্ত অনুযায়ী যমযমের
দায়িত্বভার আব্বাসকে দিয়ে দেন ৷ আব্বাসের পরে যমযমের দায়িতু আব্বাসের পুত্র আব্দুল্লাহর
হাতে আসে ৷ আন্দুল্লাহর পরে আসে আলী ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাসের হাতে ৷ তারপর
আসে দাউদ ইবন আলীর হাতে ৷ অতঃপর সুলায়মান ইবন আলীর হাতে ৷ অতঃপর ঈসা ইবন
আলীর হাতে ৷ অতঃপর মনসুর যমযমের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং তার অড়াযাদকৃত গোলাম
আবু রাযীনকে দেখা-গোনার দায়িত্ব অর্পণ করেন ৷ উমুবী এরুপ বর্ণনা করেছেন ৷

আবদুল মুত্তালিবের পুত্র যবাহ
করার মানত

ইবন ইসহাক বলেন, যমযম খনন করার সময় কুরাইশের সঙ্গে আবদুল মুত্তালিবের যে
বিবাদ হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে তিনি মানত করেছিলেন যে যদি তার দশটি সন্তান জন্ম নেয়
এবং বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে তীকে শত্রুদের থেকে রক্ষা করার উপযুক্ত হয় , তাহলে তাদের একজনকে
কাবার নিকটে আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবাই করবেন ৷ যখন তীর ং-ৰুম্ভান সংখ্যা দশে উপনীত হয়
এবং তিনি উপলব্ধি করলেন যে, তারা র্তাকে রক্ষা করতে সমর্থ, তখন তাদের সকলকে
একত্রিত করে তিনি তার মানতের কথা অবহিত করলেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তাদের
প্রতি আহ্বান জানালেন ৷ তারা হলেন হারিছ, যুরায়র , হাজাল , যেরার, মুকাওয়িম , আবু লাহাব ,
আব্বাস, হড়ামযা, আবু তালিব ও আবদুল্লাহ ৷ পিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে পুত্ররা বললেন,
আমরা কিভাবে আপনার এই মানত পুরণ করতে পারি ? আবদুল মুত্তালিব বললেন, তীরে নিজের
নাম লিখে আমার কাছে নিয়ে এসো ৷ পুত্ররা তা করলেন ৷ আবদুল মুত্তালিব তাদেরকে কাবার
অভ্যন্তরে হোবল দেবতার মুর্তিব্ নিকট নিয়ে যান ৷

উল্লেখ্য যে, কাবার জন্য নিবেদিত উপটোকনাদি কাবা স্থিত একটি গহ্বরে রাখা হত ৷
আর হোবলের নিকট সাতটি লটারীর তীর ছিল ৷ বিশেষ কোন সমস্যা দেখা দিলে মুশরিকরা
তার নিকট গিয়ে লটারী ফেলে মীমাংসায় আসত ৷ বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই তীর থেকে যে
নিদের্শনা পাওয়া যেত, তইি তারা সর্বাম্ভকরণে মেনে নিত ৷

আবদুল মুত্তালিব পুত্রদের নিয়ে হোবলের কাছে গেলেন এবং যথারীতি লটারী তীর
তৃললেন ৷ নাম আসল আবদৃল্লাহ্র ৷ আবদুল্লাহ ছিলেন পুত্রদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এবং তার
সর্বাধিক প্রিয় ৷ আবদুল মুত্তালিব পুত্র আবদৃল্লাহ্র হাত ধরলেন এবং ছবি নিয়ে তাকে জবাই
করার জন্য আসাফ ও নায়েলড়া প্রতিমা দুইটির দিকে অগ্রসর হলেন ৷ তা দেখতে পেয়ে কুরাইশ
তাদের মজলিস থেকে দৌড়ে এসে বলল, আবদুল মুত্তালিব ! আপনার উদ্দেশ্য কী? আবদুল
মুত্তালিব বললেন, আমি একে জবাই করব ৷ কুরাইশ এবং আবদুল মুত্তালিবের পুত্ররা বললেন,
আল্লাহর কলম ! কোন নিশ্চিত বিকল্প না হওয়া পর্যন্ত আপনি একে জবাই করতে পারবেন না ৷
যদি তা’ করেন, তাহলে পুত্র বলি দেওয়ার ধারা চালু হয়ে যাবে ৷ তাহলে মানুষের নিরাপত্তা

কেমন করে রক্ষিত হবে ?

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It on Pinterest

Hatay masaj salonu Diyarbakır masaj salonu Adana masaj salonu Aydın masaj salonu Kocaeli masaj salonu Muğla masaj salonu Yalova masaj salonu Gaziantep masaj salonu Kütahya masaj salonu Elazığ masaj salonu Bursa masaj salonu Konya masaj salonu Samsun masaj salonu Mersin masaj salonu Manisa masaj salonu Afyon masaj salonu Kütahya masaj salonu Çanakkale masaj salonu Edirne masaj salonu Yozgat masaj salonu Çorum masaj salonu>