কওমী মাদরাসা শিক্ষা : শেকড়ের খোঁজে

কওমী মাদরাসা শিক্ষা : শেকড়ের খোঁজে

মুফতী সালাহ উদ্দিন

সকল প্রশংসা আল্লাহর। তার নামেই নিবেদিত আমার জীবন, আমার মরণ। আমর শ্বাস-প্রশ্বাস ও অস্তিত্বের সকল স্পন্দন। সালাত ও সালাম রাসূল সা. এর উপর, যার পদতলে অর্পিত আমার হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা। আর তার পরিবার, সাহাবী ও অনুসারীদের প্রতি বর্ষিত হোক আল্লাহর অশেষ রহমত।

স্বাধীনভাবে জ্ঞান চর্চার যোগ্যতা আল্লাহ তায়ালা কেবল মানব জাতিকেই দান করেছেন। এ জ্ঞান চর্চার বৈশিষ্ট্যেই মানুষ সবার থেকে আলাদা, শ্রেষ্ঠ ও সম্মানের পাত্র। জ্ঞানের মহাত্মাকে সম্মান না জানিয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করার কারণেই শয়তান আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হয়।

তাছাড়া মানবজীবনের স্বাভাবিক বিকাশ ও পরিচালনার জন্য জ্ঞানের বিকল্প নেই। অন্য লক্ষ্য সৃষ্টির মাঝে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে জ্ঞান চর্চাই মানুষের একমাত্র আশ্রয়। জগতের প্রথম প্রতিযোগিতায় প্রথম মানুষ হযরত আদম আ. প্রতিযোগী হিসেবে যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা তো জ্ঞান চর্চার সুবাদেই।

আল কুরআনে মানবেতিহাসের এ প্রথম প্রতিযোগিতার কথা বর্ণিত হয়েছে সূরা বাকারার ৩১-৩২ নং আয়াতেÑ “আর আল্লাহ তায়ালা (আদম আ. ও সকল ফেরেশতার উপস্থিতিতে) বললেন, হে ফেরেশতারা! তোমাদের জানা থাকলে এই সব বস্তুর নামগুলো বলো? তারা বললো, হে পবিত্র সত্ত্বা,আপনি যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের তো আর কোন জ্ঞান নেই। আপনি তো মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়। তারপর আল্লাহ (আদম আ. কে) বললেন, হে আদম তুমি তাদেরকে এগুলোর নাম বলে দাও, তখন তিনি তাদেরকে সেগুলোর নাম বলে দিলেন।” [সূরা বাকারা: ৩১-৩২]

সে দিন থেকেই শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান হাতে শুরু হয় মানুষের জাগতিক পথ চলা। প্রজন্মের পর প্রজন্মের আগমন। একে একে অনেক মানুষ। মানুষের আধিক্যের স্বাভাবিক পরিণতিতে মতের আধিক্য। আর মতের আধিক্য মানেই চিন্তার বৈচিত্র্য। ভাবনার বৈষম্য। বিশ্বাসিক ভিন্নতা। পার্থক্যপূর্ণ জীবন দর্শন। শুদ্ধাশুদ্ধ নানান কৌশলে জীবনের পথে এগিয়ে চলা। পার্থিব এ জগৎ মানেই যেহেতু পরীক্ষাগার। সফলদের সত্যিকারের রূপ ও সামর্থ্য প্রমাণের সুবিস্তৃত মঞ্চ। বহুমুখী পরীক্ষার নানা রকম আয়োজন। দৃষ্টিনন্দন বিচিত্র বিভ্রান্তি জালের অবাধ বিস্তার। ইন্দ্রজালিক নানা ভয়ংকর সুন্দর ফাঁদের সমারোহ।

আকর্ষণীয় এমন জাগতিক রূপ-রসের আপাত সুস্বাদে নেশাগ্রস্থ হয়ে কেউ কেউ নয় অনেকেই যে উদভ্রান্ত হবে- এ প্রবণতা স্বাভাবিক। অনুচিত হলেও যৌক্তিক। এই যৌক্তিকতার সাথে একমত হয়েই আল্লাহ আমাদেরকে সঙ্গত ও সঠিক পথে চালিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আল্লাহর পরীক্ষায় সাফল্যের প্রধান ও একমাত্র শর্ত আল্লাহর প্রভুত্বে চূড়ান্ত বিশ্বাস রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। শুধু তাই নয় শিল্পিত আবরণের আড়ালে জগতের জটিল ধাঁধার ভয়ংকর হিং¯্রতা এড়িয়ে সাফল্যের স্বপ্নিল পথে সাহসী পথচলা নিশ্চিত করতে হযরত নূহ, হযরত শীস এবং হযরত ইবরাহিম আ.সহ অসংখ্য মহামানবকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল, পৃথিবীর মেকাপি নান্দনিকতায় বিভোর মানুষদেরকে প্রেমময় কৌশলে আসল গন্তব্য প্রতি পথ নির্দেশ করা। অগ্রপথিক হয়ে সবাইকে নিয়ে ¯্রষ্টার ঘনিষ্ঠতায় আশ্রয় নেওয়া। একটি সম্পূর্ণ জাতি হিসাবে মানব জাতির প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে খৃষ্ট শতাব্দীর সূচনাকাল পর্যন্ত প্রতিটি জাতির জন্যই আল্লাহ তায়ালা একেকজন নির্দেশক পাঠিয়েছেন। কুরআনিক ভাষায় যাদেরকে আমরা নবী-রাসূল নামে ডাকি। এ ঐতিহাসিক বাস্তবতার কথা বর্ণিত হয়েছে মহা পবিত্র কুরআনেও। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- “প্রতিটি জাতির জন্যই আছে একজন পথ প্রদর্শক।” [সূরা রাআদ: ৭]

আল্লাহর পক্ষ থেকে সৃষ্ট মানুষ জাতির প্রতি এই ‘নির্দেশনা ও নির্দেশক’ই ছিল সবচেয়ে বড় অনুগ্রহের দান। এ কথার পেছনে বিভিন্ন দালিলিক বর্ণনা হয়তো উপস্থাপন করা যাবে। কিন্তু হযরত ঈসা আ. এর পর সাময়িকভাবে নবী-রাসূলদের আগমনের স্বাভাবিক ধারা বন্ধ থাকার পরিণতিতে মানব জাতি যে ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল তার একটি সাধারণ সরল চিত্রই এ অনুগ্রহের গুরুত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। হযরত ঈসা আ. এর প্রত্যাবর্তনের পর প্রায় পাঁচশত বছর পর্যন্ত আর কোন নবী রাসূল পৃথিবীতে আসেননি। সঙ্গত পরিণতিতেই ওয়াহিয়ে এলাহী তথা ঐশী নির্দেশনার অপার্থিব ফয়েজ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল পাঁচ শতাব্দীর বিশ্ব। জগতের অস্থায়ী সৌন্দর্যের নেশায় আক্রান্ত হয়ে এলাহী নির্দেশনার লালন ও অনুশীলন থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল মানুষ। পার্থিব ভোগচিন্তা প্রধান উপজীব্য বানিয়ে নানামুখী উৎকর্ষ অর্জনে মনোযোগী হয়েছিল। বাহ্যিক বিবেচনায় তাতে কিছুটা সাফল্য হয়তো অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু আত্মার প্রধান চাহিদা উপলব্ধি করে জীবনের সঠিক গন্তব্যের পথে এক পা সামনেও অগ্রসর হওয়া যায়নি; বরং মানবিক বৈশিষ্ট্যের বিলোপের সমানুপাতে দেখা দিয়েছে বহুমুখী বিশৃক্সক্ষলা। মানুষ হারিয়ে ফেলেছে মানুষের আসল পরিচয়। মনুষ্যত্বের সংকটে একাকার হয়ে গেছে মানুষ আর অমানুষ। ঐশী জ্ঞানের পুষ্টির অভাবে ধুকতে থাকা সমাজে আমূল ভেঙ্গে পড়ে মানবীয় সব সম্পর্কের বাঁধন।

অসাম্য, অপ্রেম আর উদ্ধত হিং¯্রতাই হয়ে ওঠে ঐতিহ্যের প্রতীক। অনৈতিক নীতিহীনতাই জীবন যাত্রার একমাত্র নীতিতে পরিণত হয়। অশান্তির দূষিত হাওয়ায় বিষাক্ত হয়ে ওঠে মানুষের সমগ্র আবাসভূমি। প্রকৃতির অনাবিল সরলতা ছাপিয়ে উদ্ধত হয়ে ওঠে পশুত্বের সর্বগ্রাসী রুক্ষতা। পাশবিক চরিত্রে আশ্রিত মানব সমাজের অধঃপতন ঠেকে যায় অন্তহীন গভীরতায়। বৈষয়িক উন্নয়ন ও উৎকর্ষ অর্জনের সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও প্রাচীন ও আধুনিক সকল ঐতিহাসিক নির্দ্বিধ কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন, খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দী ইতিহাসের সর্ব নিকৃষ্টতম অধ্যায়। যে কলঙ্কদাগ মানুষের ইতিহাসকে শুধু কলুষিতই করেনি, পাঠের অযোগ্য অংশে পরিণত করেছে। যা আমাদের কাছে আজও আইয়ামে জাহিলিয়াত তথা মূর্খতার যুগ, অন্ধকারের যুগ বলে নিন্দিত, ঘৃণিত।

সমগ্র মানবজাতি যখন মারাত্মক ভারসাম্যহীনতার বহুমাত্রিক কাঁপুনিতে অস্থির, অনিয়মের নিষ্ঠুর কাঁটাতারে আটকে পড়ে অস্তিত্ব যখন শেষ স্পন্দনটি হারানোর অপেক্ষায়; ঠিক তখনই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা মানব জাতির সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামতটি দান করেন। কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য চূড়ান্ত ঐশী নির্দেশনা মহা পবিত্র আল কুরআনসহ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ রাহবার সার্বিক বিবেচনায় সর্বোৎকৃষ্ট মহামানব হযরত মুহাম্মাদ সা. প্রেরিত হন। যে চিরন্তন নির্দেশনা সর্বপ্রথম ঘোষণা করা হয়, “পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপি- থেকে।” [সূরা আলাক : ১-২]

আয়াত দুটির নাযিলের সময় ও বর্ণনা ধারার মাঝ দিয়ে আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাস সমৃদ্ধ জ্ঞানের অপরিহার্যতা অত্যন্ত প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। সাথে সাথে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন, মানুষের উদ্ভাবিত কোন কৌশলেই ¯্রষ্টা নির্দেশিত গন্তব্যে পৌছা সম্ভব নয়। কাজেই মানুষের সামগ্রিক উৎকর্ষ উত্তীর্ণ মাত্রায় গতিশীল রেখে নৈকট্য অর্জনের প্রয়োজনে এলাহী নির্দেশনা তথা ইলমে ওয়াহীর বিকল্প কোন আশ্রয় নেই। আশ্রয় খোঁজারও সুযোগ নেই।

ঐশী নির্দেশনা তথা রেসালাত প্রাপ্তির পর রাসূল সা. এর উপর প্রধানত তিনটি দায়িত্ব অর্পিত হয়।

১. আল্লাহর যাবতীয় বাণী-নির্দেশনা অবিকৃতভাবে উম্মতের কাছে উপস্থাপন করা।

২. এসব বাণীর মর্মকথা ও আবেদন স্পষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দান করা।

৩. যাবতীয় নির্দেশনার ব্যবহারিক অবকাঠামো প্রদর্শন করা।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনে ইরশাদ করেন, “তোমরা সালাত কায়েম কর।” [সূরা আনআম: ৭২] রাসূল সা. এ ঐশী বাণী পাওয়ার পর প্রথমে তা সাহাবীদের নিকট তিলাওয়াত করে শুনান। আর সাহাবীগণও তা আত্মস্থ করেছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি সাহাবীদের কাছে এ সালাত সম্পর্কে বিভিন্ন নিয়ম-কৌশল-পন্থা বর্ণনা করে সালাত এর সংক্ষিপ্ত রূপটাকে বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন। সালাতের বিভিন্ন বিধি-বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নামাযের মধ্যে জাগতিক কোন কথা বলা উচিত নয়, নামায হচ্ছে তাকবীর তাসবীহ ও কুরআন পাঠ’ [সহিহ মুসলিম: ১/৩৮১; আবু দাউদ: ১/২৪৪] এ হাদীসে সালাতে সূরা ফাতেহা পাঠের অপরিহার্যতার বিধান বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে এসেছে- “যখন ‘ফা সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আযীম’ আয়াতটি অবতীর্ণ হল, তখন রাসূল সা. সাহাবীদের বললেন, তোমরা এটাকে তোমাদের রুকুর মাঝে পাঠ কর। আর যখন ‘সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আ‘লা’ নাযিল হয় তখন তিনি বলেন, তোমরা এটিকে তোমাদের সিজদায় পড়।” [সুনানে আবু দুাউদ: ১/১২৬]

উল্লেখিত হাদীসের মত অনেক হাদীসের মাধ্যমে রাসূল সা. সালাতের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান বর্ণনা করেছেন। শুধু বিধান বর্ণনা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি; বরং রিসালাতের পূর্ণ দায়িত্ব মোতাবেক সালাতের ব্যবহারিক শিক্ষাও সাহাবীদের দান করেন। সালাতের সম্পূর্ণ অবকাঠামো প্রদর্শন করার পর তিনি ঘোষণা করেন, “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছ ঠিক সেভাবেই সালাত আদায় কর।” [বুখারী, হাদীস: ৭২৪৬]

এভাবেই রাসূল সা. তিন স্তর বিশিষ্ট পদ্ধতিতে রিসালাতের মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। আর কথা-কর্ম, চিন্তা-বিশ্লেষণ, আচরণ ও সমর্থন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে অনুদিত হয়েছে ঐশী নির্দেশনার পরিপূর্ণ আবেদন। এজন্যই রাসূল সা. এর সমৃদ্ধ চরিত্র সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরে হযরত আয়েশা রা. বলেন, “কুরআনের বিশ্লেষিত দৃশ্যরূপই ছিল তার চরিত্র।” [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস:২৫৮১৩], তবে মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও কুরআনের সম্পূর্ণ চাহিদার আদলে প্রতিষ্ঠিত নববী চরিত্রের প্রভাব ও প্রয়োজনীয়তা একটি বিবেচ্য বিষয়। সে ক্ষেত্রে খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে একটু নজর দিলেই আমরা দেখতে পাব, পঞ্চম শতাব্দীর অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী কুরআনের অপার্থিব নূরের রৌশনীতে কী দারুণ ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হয়েছিল। জীবনের বহুমুখী জটিলতায় আক্রান্ত, হিং¯্র, হতাশ মানুষগুলো জগতশ্রেষ্ঠ সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিল কুরআন চর্চার সুবাদেই। বসবাসের অযোগ্য একটি মানব সমাজ কুরআন তথা ইসলামী শিক্ষার যাদুকরী ছোঁয়ায় রূপান্তরিত হয়েছিল অভাবনীয় সুখসমৃদ্ধ ও যে কোন মানুষের প্রত্যাশিত ঠিকানায়। ব্যক্তির সমাজ ও মানস জগতে ইলমে ওয়াহীর ইতিবাচক প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণেই খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধকে বিশ্ব ইতিহাসের ‘স্বর্ণযুগ’ বলে চিহ্নিত করা হলে মুসলিম-অমুসলিম কোন ঐতিহাসিকই দ্বিমত পোষণ করেন না।

খৃষ্টপূর্বকালে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অঞ্চল, জাতি, প্রজন্মসহ বিচিত্র বিবেচনায় নবীদের প্রেরণ করতেন। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সা. আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল হওয়ায় আর কোন নবী আসার সুযোগ নেই। অথচ নবী পরবর্তীকালেও মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করা ও তার পথনির্দেশ করার প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান। এ প্রয়োজনের প্রেক্ষিতেই সর্বকালের, সবস্থানের, সকল মানুষের জন্য সমান ও পূর্ণভাবে উপযোগী চিরন্তন আল-কুরআনের প্রতিটি বাণী সর্বসাধারণের কাছে পৌছে দেওয়ার মহান দায়িত্ব বর্তায় উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ জামাআত আসহাবে রাসূলের উপর। নববী ইলম ও ফয়েজের নিরঙ্কুশ উত্তরাধিকারী উলামায়ে কেরামের উপর। এ মর্মে রাসূল সা. এর স্পষ্ট নির্দেশ “একটি আয়াত হলেও আমার পক্ষ থেকে তোমরা পৌছিয়ে দাও।” [বুখারী, হাদীস: ৩৪৬১]

সাহাবায়ে কেরাম রা. রাসূল সা. এর এ আদেশ পালনে সবোর্চ্চ ঐকান্তিকতায় তাদের সামর্থ্যরে সবটুকু ব্যয় করেছেন- একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কারণ ঐশী নির্দেশনায় পুষ্ট ইসলামের আদর্শের প্রতি মানুষকে ডাকতে গিয়ে তারা যে ত্যাগ-তিতিক্ষা বরণ করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোন নজির নেই। সাহাবায়ে কেরামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসাবে পরবর্তী প্রতিটি যুগের আলেমগণই ইলমে ওয়াহী ধারণ করেছেন এবং বিতরণ করেছেন। এ কাজে তাঁদের একনিষ্ঠতা ও নিবেদনের মাত্রা ছিল সবোর্চ্চ মানের।

অসংখ্য হাদীস গ্রন্থের অনবদ্য সংকলন, অগণিত তাফসির গ্রন্থসহ ইলমে দ্বীনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে রচিত গ্রন্থের সুবিশাল সমারোহই তাদের অবদানের নির্বাক সাক্ষী। তাছাড়া ইতিহাসের প্রতিটি পরিচ্ছেদে অসংখ্য ইসলামিক স্কলারের উজ্জ্বল উপস্থিতিও আলোচ্য প্রসঙ্গে তাদের ভূমিকার কথা স্পষ্ট করে তোলে।

ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণেই আল্লাহ তাঁর স্মরণকে পার্থিব জীবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন। আল্লাহর নির্দেশনাই মানব জীবনে প্রকৃত সাফল্যের প্রধান নিয়ামক- এ কথাটি প্রতিটি মানুষের মগজ ও হদয়ে গেঁথে দেয়ার লক্ষ্যে আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়আশয় থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আল্লাহর জিকির” [সূরা আনকাবূত: ৪৫]

শুধু তাই নয়, রাসূল সা. এ জিকিরকেই পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান উপাদান হিসাবে বর্ণনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে “‘আল্লাহ, আল্লাহ’ বলতে থাকে এমন একজন লোক পৃথিবীতে থাকলেও কিয়ামত সংঘটিত হবে না।” [মুসলিম, হাদীস: ২৩৪] এই আল্লাহ আল্লাহ বলা, আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলার পূর্ব শর্ত হল পৃথিবীতে ইলমে ওয়াহীর অব্যাহত চর্চা বিদ্যমান থাকা। কারণ কোন বিষয়ে ইলমের অস্তিÍত্ব না থাকলে বাস্তবিক কর্মে তার প্রতিফলন আশা করা চরম নির্বুদ্ধিতা বা নিরেট কল্পনা বিলাস ছাড়া আর কিছু নয়। ইলমে ওয়াহীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ মানব জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্যতম প্রধান কর্ম বলেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে রাসূল সা. শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। হাদীসে নববীতে তিনি ইরশাদ করেন, “ তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই যে কুরআন শিক্ষা লাভ করে এবং তা শিক্ষা দেয়।” [বুখারী, হাদীস: ৫০২৭]

তাছাড়া মানবজাতির জন্য হেদায়াতরূপে অবতীর্ণ ইলমে ওয়াহী যেহেতু মানুষকে জান্নাতগামী করার নির্দেশনা, তাই ইলমে ওয়াহী অর্জনের প্রতিটি পদক্ষেপকে জান্নাতমুখী পথযাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাসূল সা. ইলমে ওয়াহীর শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে বলেন, “যে ইলমের অনুসন্ধিৎসা নিয়ে পথযাত্রা শুরু করে আল্লাহ তার (এ ইলম অর্জনের চাহিদা ও প্রাথমিক প্রয়াসের) জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেন। [মুসলিম, হাদীস: ২৬৬৯]

ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও প্রামাণিক বিশ্লেষণ শেষে গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও মর্যাদার বিবেচনায় নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইলমে ওয়াহীর শিক্ষা ও শিক্ষা প্রদানই হলো জগতের সবচে’ মহৎ কর্ম। ভারসাম্য রক্ষার এবং ব্যক্তির উভয় জাগতিক কল্যাণ সাধনে যা সর্বতোভাবে সক্রিয় ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এ ঐশী শিক্ষার প্রথম শিক্ষক ছিলেন রাসূল সা. যিনি ঐশী শিক্ষা তথা দ্বীনী ইলমের শিক্ষক হতে পেরে গর্বভরে উচ্চারণ করেছেন, “নিশ্চয়ই আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি।” [সুনানে দারেমী, হাদীস: ৩৬১]

রাসূল সা. ও তার পরবর্তী কয়েক শতাব্দী যাবৎ শিক্ষকভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত ছিল বলে সাহাবায়ে কেরামের কাছে ভিন্ন ভিন্নভাবে সুহবত গ্রহণের মাধ্যমে তাবেঈনে কেরাম ইলমে দ্বীন শিক্ষা করেন। শিক্ষকভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোতেই মক্কায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, মদীনায় হযরত উবাই ইবনে কাআব, ইরাকে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ও ইয়ামানে আবু মুসা আশআরী রা. সহ অনেক সাহাবী ইলমে দ্বীনের শিক্ষা প্রদান করেন। তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের যুগসহ প্রায় খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ পদ্ধতিতেই চলে ইলমে দ্বীনের শিক্ষা কার্যক্রম। আর এ শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মসজিদ। অবশেষে একাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আফগান শাসক সুলতান মাহমূদ কর্তৃক গজনীতে ইলমে দ্বীনের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য মসজিদসংশ্লিষ্ট একটি আলাদা গৃহ নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে যা ছিল প্রথম মাদরাসা। অবশ্য প্রসিদ্ধ মতানুসারে একাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাদশাহ নিজামুল মুলক তুশী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘মাদরাসায়ে নিজামিয়াকে’ সর্বপ্রথম মাদরাসা বলে গণ্য করা হয়। মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই মূলত শিক্ষকভিত্তিক শিক্ষাকাঠামো পরিবর্তিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। শিক্ষা ব্যবস্থার এ প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা সবার কাছে সমাদৃত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠলে দ্বাদশ শতাব্দীতে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ব্যাপক বিস্তার ঘটে। একই কারণে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উপমহাদেশেও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ধারা শুরু হয়। এবং এত দ্রুত ও বেশি মাত্রায় বিস্তার লাভ করে যে, শতাব্দীর প্রথমার্ধ শেষে শুধু দিল্লিতে এক হাজারেরও বেশি মাদরাসা পাওয়া যায়। এ সব প্রতিষ্ঠানে ইলমে ওয়াহীর আলোক পুষ্ট মনীষীগণ শুধু জ্ঞান আহরণের ও বিতরণের কাজেই ব্যস্ত ছিলেন না; বরং সমাজে, রাষ্ট্রে এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে কোন ষড়যন্ত্রের বিপরীতে রুখে দাঁড়ান। এমনকি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইংরেজদের কাছে বাংলার স্বাধীনতা হাত ছাড়া হয়ে গেলেও ইলমে ওয়াহীর চেতনাসিদ্ধ আলিমগণ দমে যাননি, হতাশ হননি। বরং বিভিন্নসময় নির্যাতক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছেন, প্রতিরোধী হয়েছেন। হযরত শাহ আব্দুল আজিজ র., সাইয়েদ আহমদ শহীদ র. সাইয়েদ ইসমাঈল শহীদ র., হাজী শরীয়তুল্লাহ র., হাজী নেছার আলী উরফে তিতুমীর র., শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান র., শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী র., উবাইদুল্লাহ সিন্ধী র. এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। যাদের বাদ দিয়ে বাংলার মুক্তির সম্পূর্ণ ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ইংরেজ শাসকদের অবৈধ হস্তক্ষেপে ঐতিহ্যময় মাদরাসাশিক্ষার ধারা ব্যাহত ও বন্ধ হয়ে গেলে জাগতিক ও মানসিক নানা জটিলতায় আক্রান্ত জাতির মুক্তির লক্ষ্যে ঐশী ইলমের মারকাজ রূপে ১৮৬৬ সালে ভারতের দেওবন্দে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলূম দেওবন্দ। তারপর শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলাদেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা ও চট্টগ্রামে অভিন্ন উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে বেশ কিছু মাদরাসা। যেসব প্রতিষ্ঠান ছিল স্বাধীনতা চেতনার সূতিকাগার। যাবতীয় বন্দিত্ব অবক্ষয় থেকে এ জাতিকে পরিত্রাণ দেওয়ার নিয়তে সক্রিয় ছিল এ সব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নকরা ইলমে ওয়াহীর আলোকে প্রদীপ্ত মানুষগুলো। পরবর্তীতে অভিন্ন চেতনার আলোকে দেওবন্দী আদলে এদেশের সর্বত্র গড়ে ওঠে অসংখ্য মাদরাসা। যা আজ আমাদের কাছে কওমী মাদরাসা নামে পরিচিত। বর্তমানে কওমী মাদরাসা শিক্ষার সিলেবাস, শিক্ষা পদ্ধতি, এ শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম সমাজের জীবন চরিত্র, কর্মনীতি ও উম্মাহর প্রতি দরদী নিবেদন দেখে নির্দ্বিধায় বলা যায়, চৌদ্দশ বছর আগে রাসূল সা. নানামুখী ফেতনার হাত থেকে রক্ষা করে ইলমে ওয়াহীর আলোকে মানবজাতিকে আল্লাহমুখী করার যে গুরু দায়িত্ব আলিম সমাজের উপরে অর্পণ করেছিলেন। কওমী মাদরাসার যাবতীয় কার্যক্রম সে মহান দায়িত্ব পালনেরই একটি সমন্বিত প্রয়াস।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, ইসলামে বিশুদ্ধ ও সমৃদ্ধ শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রভূমি এসব কওমী মাদরাসা আদর্শিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই শয়তানী শক্তির শ্যেন দৃষ্টির শিকার। ইসলামী চেতনার প্রধান মারকাজ এসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর নিকৃষ্ট মানসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নানা অসত্যের অপপ্রচার তাদের ঘৃণ্য মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। তাছাড়া সরকার যন্ত্রের বিভিন্ন অংশে ঢুকে পড়া ইসলাম বিরোধী দালাল-নাস্তিকদের অসৎ পরামর্শে সরকারও কওমী মাদরাসার সাথে বিমাতৃসুলভ আচরণ করছে যা কোনভাবেই প্রত্যাশিত নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়।

সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে, ইদানীং কওমী মাদরাসার কিছু ছাত্র-শিক্ষকও বাতিল শক্তির অপপ্রচারে প্রভাবিত হচ্ছেন। আধুনিক জ্ঞানপাপীদের অন্তঃসারশূন্য নানা যুক্তি প্রশ্নে তাদের মনেও সমাজে কওমী মাদরাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অযথা সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। বোধ করি, ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের হৃদপি-ে ইলাহী আদর্শ ও নৈতিকতার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে মানুষের ব্যক্তিক ও সামষ্টিক জীবন ভারসাম্যপূর্ণ ও সাফল্যম-িত করার পেছনে একমাত্র দ্বীনী শিক্ষাই যে প্রধান ভূমিকা রাখছে সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার অভাবেই অনাকাক্সিক্ষত এ ব্যাধির সংক্রমণ হচ্ছে। সবশেষে কওমী মাদরাসা শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট ও এর বিরোধিতায় বিভোর উভয় পক্ষকে বলতে চাই, নিজেদের স্বার্থেই এ শিক্ষা স্বযতেœ লালন করুন। অন্যথায় পৃথিবীতে অচিরেই নেমে আসবে আরেকটি অন্ধকার যুগ। যার অশুভ প্রভাব থেকে আমরা কেউই মুক্ত থাকতে পারব না।

লেখক: মুহতামিম ও শাইখুল হাদীস, জামিয়া দারুল উলূম আল ইসলামিয়া দিলুরোড ঢাকা