কওমী মাদ্রাসা জাতিকে কী দিয়েছে?

ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে যাত্রা শুরু কওমী মাদরাসার। বৃটিশ ওপনিবেশ শাসনের শেষ পর্যায়ে এসে পরাধীন জাতির মুক্তির চেতনা নিয়ে কওমী মাদরাসা শিক্ষাধারার সূচনা। এটি ইসলামী শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি। মৌলিকত্ব, অনাড়ম্বরতা ও নৈতিক আপসহীনতা এ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। দারুল আরকাম থেকে সূচিত নববী শিক্ষার ধারাবাহিকতা মদীনা, কুফা, বসরা, মিশর, দামেশক, বাগদাদ, খোরাসান, মধ্য এশিয়া হয়ে দিল্লি তারপর দেওবন্দ-সাহারানপুরের পথ ধরে উপমহাদেশসহ সারা দুনিয়ায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। বর্তমানে এ ধারার শিক্ষা ধর্মীয় ও জাতীয় চেতনার অনন্ত উৎস হিসেবে মুসলিম উম্মাহর আলোকবর্তিকার কাজ করছে। দীপান্বিত এই শিক্ষাধারা প্রকৃত মানুষ গড়ার মহান ব্রত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আপন গন্তব্যে। মানবিকতার বিকাশ, পাশবিকতার মূলোৎপাটন, শান্তির পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনে কওমী শিক্ষাধারা ইতোমধ্যে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছে। স্খলিত ও আদর্শবিচ্যুত এই সমাজব্যবস্থায় এ শিক্ষাধারার প্রবাহ দেশ ও জাতির জন্য নিরাশায় আশার আলো এবং মহানিয়ামকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
কওমী মাদরাসার সিলেবাস দরসে নেজামী নামে পরিচিত। হিজরী দ্বাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম মোল্লা নেজামুদ্দীন সাহালুভী রহ. প্রণয়ন করেন এ সিলেবাস। তাই তাঁর নামেই এটি পরিচিত হয়। অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ায় তা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত এ শিক্ষাধারাই ছিল ভারতবর্ষের সর্বত্র প্রচলিত। এরপর ওপনিবেশিক শক্তি ভারতবর্ষে চালু করে এক নতুন শিক্ষাক্রম। যার প্রণেতা ছিলেন স্যার মেকলে। দখলদার শক্তি তাদের মনন ও চিন্তার অনুকূলে একদল শিক্ষিত মানুষ তৈরি করার জন্য এটি প্রণয়ন করেছিল। এটাই তখন শিক্ষার মানদ- হিসেবে পরিগণিত হতো। তা সত্ত্বেও দরসে নেজামী শিক্ষাধারা কোনো রকম টিকে আছে। বিচক্ষণ ওলামায়ে কেরাম খেয়ে না খেয়ে প্রাণান্তকর চেষ্টার মাধ্যমে দরসে নেজামী শিক্ষাধারা বহাল রেখেছেন। পরবর্তী সময়ে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পর দরসে নেজামীই এর শিক্ষাক্রম হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন সহকারে দরসে নেজামীই আজ পর্যন্ত কওমী মাদরাসার পাঠ্যক্রম হিসেবে বিবেচিত। দরসে নেজামী তথা কওমী মাদরাসায় শিক্ষিতরাই একদিন এদেশের স্বাধীনতার রক্ষাকবচের ভূমিকা পালন করছিল। আজও নিজস্ব বলয়ে, বিস্তৃত পরিম-লে কওমী মাদরাসার শিক্ষিতরা রেখে যাচ্ছেন জোরালো অবদান।
যুগে যুগে এ ধারার শিক্ষা উপহার দিয়েছে অগণিত লৌহমানবদের; যাদের স্পর্শ পেয়ে ধন্য হয়েছে সভ্যতা, সুশোভিত হয়েছে দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতি। মুজাদ্দিদে আলফে সানী খ্যাত শেখ আহমদ শেরহিন্দীর ধর্মীয় সংস্কার ও অবদানের কথা কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়-তিনি ছিলেন এই দরসে নেজামীর ফসল। তাঁরই সহপাঠী নওয়াব সাদউল্লাহ খান এবং উস্তাদ মা’মার-স্ব স্ব ক্ষেত্রে মহিমান্বিত হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়। তাদের একজন শৌর্য-বীর্য ও ঐতিহ্যের ধারক মোঘল সালতানাতের স্বর্ণযুগের দীর্ঘকালীন উজিরে আজম ছিলেন। দ্বিতীয়জন ছিলেন পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্যের একটি ঐতিহাসিক তাজমহলের নির্মাতা। এ তিনজনের কৃতিত্ব দ্বারাই দরসে নেজামী তথা কওমী মাদরাসা শিক্ষাধারার যথার্থতা ও যথোপযুক্ততা নিরূপণ করা যায়। এ ছাড়াও ভারত উপমহাদেশের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন সব ব্যক্তিত্ব অতীত হয়েছেন যারা দরসে নেজামীর সনাতনী ধারায় শিক্ষিত হয়েও দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে গেছেন।
দুই.
কওমী মাদরাসা শিক্ষা অতীতে জাতিকে অনেক কিছু দিয়েছে, বর্তমানে দিচ্ছে, ভবিষ্যতেও দিয়ে যাবে। স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও আপন গতিধারায় টিকে থেকে কওমী মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা রচনা করেছে একটি আদর্শিক ধারার। স্খলিত ও ক্ষয়িঞ্চু শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বর্তমানে একমাত্র কওমী মাদরাসা শিক্ষাই দেশ ও জাতির কাক্সিক্ষত স্বপ্নের সফল বাস্তবায়নের যোগ্যতা রাখে। আমাদের দেশে প্রচলিত ত্রিধারার শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিচারে কওমী মাদরাসা শিক্ষাই সবচেয়ে ফলপ্রসূ ও কার্যকর শিক্ষা। শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি হয় নৈতিক উৎকর্ষ, মানবতার বিকাশ, পাশবিকতার মূলোৎপাটন এবং আদর্শিকতার স্ফূরণ তবে সে অর্থে কওমী মাদরাসা শিক্ষাতেই এগুলোর যথার্থ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অপরাপর শিক্ষাধারায় এর পূর্ণতা ও চর্চার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ কথার সত্যতা প্রমাণের জন্য কাউকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। আমাদের দেশের তথাকথিত আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জ্ঞাত। যোগ্য ও আদর্শ নাগরিক তৈরির পরিবর্তে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসছে এমন কিছু লোক যাদের হাতে দেশ, সমাজ, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব কোনোটিই নিরাপদ নয়। এর কারণ হচ্ছে, কওমী মাদরাসা ছাড়া বাকি দুটি ধারার সূচনাই হয়েছে পরাধীনতার নাগপাশ পরে ভিনদেশী ষড়যন্ত্রকারী চক্রের হীনস্বার্থ রক্ষার প্রত্যয়ে। একমাত্র কওমী মাদরাসার সূচনাই দেশ ও জাতির উত্তরণের মহান ব্রত নিয়ে উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতায়। ‘কওমী’ শব্দের মধ্যেই জাতীয়তাবোধ ও স্বাধীন চেতনা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই এতে দেশপ্রেম, মানবতাবোধ, মুক্ত-স্বাধীন চেতনা এবং সত্য-সুন্দরের প্রতি সহজাত আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়।
সূচনাকালীন প্রভাব আমাদের দেশের সব কটি শিক্ষাধারাতেই মোটাদাগে ধরা পড়ে। কওমী মাদরাসার সূচনাই যেহেতু জাতীয়তাবোধের ওপর এজন্য প্রকৃত বিচারে এ ধারার শিক্ষিতদের মাঝেই এ গুণটি যথাযথ পাওয়া যায়। স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি দরদমাখা স্বচ্ছ হৃদয় নিয়ে তারা নিজস্ব পরিমণ্ডলে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কার্যক্রম। শত উপেক্ষা, অবজ্ঞা ও অস্বীকৃতিও তাদেরকে সরাতে পারছে না নিজস্ব ভুবন থেকে। অনেকের কাছে বিস্ময় মনে হলেও তারা তাদের অবস্থানে টিকে আছে এবং ভালোভাবেই আছে। এমন কোনো অবস্থান ও চাওয়া-পাওয়া তাদের প্রত্যাশিত নয় যা তাদেরকে আদর্শচ্যুত করতে পারে কিংবা তাদের স্বকীয়তা বিনষ্ট করতে পারে। নিজস্ব বলয় ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি এই আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যয়ই তাদের প্রতি সমাজের সাধারণ সমীহের মৌলিক কারণ।
আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি ও জাতীয় পর্যায়ে কওমী মাদরাসা শিক্ষার প্রভাব অগণন। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর তুলনায় কওমী মাদরাসাসংশ্লিষ্টদের সংখ্যা সামান্যই। তবে এ অল্পসংখ্যকের যে প্রভাব ও ছাপ সবার মধ্যে ব্যাপৃত তা উপেক্ষা করার নয়। মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে প্রকৃত ধর্মীয় চেতনার যে বিকাশ তা কওমী মাদরাসা শিক্ষিতদের মাধ্যমেই আবর্তিত হচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন সেক্টরে তাদের সযতœ ও গঠনমূলক খেদমত জাতিকে আলোর পথের সন্ধান দিয়ে যাচ্ছে। পতনের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের এই সমাজব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া অসততা, দুর্নীতি, অবক্ষয় ও অন্যায়ের বিপরীতে অবস্থান নেয়ার মতো শক্তির নিদারুণ শূন্যতায় সনাতনী ও ঐতিহ্যনির্ভর এই শিক্ষাধারা প্রত্যাশার দিগন্ত উম্মোচন করেছে। শিক্ষার নামে অশিক্ষা ও কুশিক্ষার এই সরগরমের মাঝে কওমী ধারার শিক্ষা ততটা প্রচলিত না, তবে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য সাধনে এ ধারাই মূল শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছে। সমাজের সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি জাতীয়ভাবে নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য হচ্ছে, ত্রিধারার প্রচলিত শিক্ষায় এ ধারাটি ক্ষীয়মান, উপেক্ষিত ও অনেকটা অপাঙ্ক্তেয়। এটা জাতিসত্তার চেতনার সংকট ও জাতীয়তাবোধের অপরিপক্কতার প্রমাণ বহন করে।
তিন.
কওমী মাদরাসা শিক্ষা জাতিকে কী দিয়েছে, কওমী মাদরাসা শিক্ষিতরা জাতির জন্য কী করছে-এসব প্রশ্ন আজ ডাকঢোল পিটিয়ে জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। সম্প্রতি এক মন্ত্রীও বলেছেন, ব্যাঙের ছাতার মতো নাকি কওমী মাদরাসা হচ্ছে। এসব মাদরাসা নাকি জাতির জন্য বিপদজ্জনক। কিন্তু তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয়Ñঅপরাপর শিক্ষাধারা জাতির জন্য কী কল্যাণ বয়ে এনেছে? শিক্ষার নামে অপশিক্ষার বিষ ছড়িয়ে দিয়ে সমাজকে কি বিষিয়ে তুলছে না? আমাদের আজকের সমাজ কি সুসভ্য ও ভদ্রোচিত কোনো সমাজের প্রতিবিম্ব? মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও কেন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ প্রতিফলিত হচ্ছে না? এর কারণ আমাদের সবার জানা। জানা সত্ত্বেও আমরা স্থূল প্রাপ্তি ও সস্তা প্রলোভনে মোহাচ্ছন্ন। উন্নত ক্যারিয়ার, বৈষয়িক উৎকর্ষ ও প্রতিষ্ঠাকেই শিক্ষার ফলাফল হিসেবে গণ্য করার কারণে এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা কওমী ধারাকে আমাদের কাছে মনে হয় অসংলগ্ন ও অপাঙ্ক্তেয়। অথচ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের আয়নায় একমাত্র কওমী মাদরাসা শিক্ষাই কৃতিত্বের দাবিদার। কারণ তারা সমাজের জন্য তেমন কোনো স্থূল প্রাপ্তির সংযোজন করতে না পারলেও দৃশ্যালোকের বাইরের এমন কিছু চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করছে যা দেশ ও জাতির টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। নৈতিকতা, দেশপ্রেম, সততা, দায়িত্ববোধ, ন্যায়পরায়নতা ও মানবিকতার চর্চা জাতিসত্তার অপরিহার্য উপাদান। এগুলো ছাড়া একটি দেশ বা জাতি আকারে-অবয়বে নিজের অস্তিত্ব¡ ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু প্রকৃত বিচারে অন্তঃসারশূন্য-যার দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি অত্যাসন্ন। এসব গুণ প্রচলিত ধারার শিক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে কল্পনাতীত। অথচ কওমী ধারার শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক উপাদানই এসব বিষয় দ্বারা গঠিত। সুতরাং চেতনাধারী বিবেকের কাছে এর প্রকৃতি অজানা থাকার কথা নয়।

Pin It on Pinterest

Hatay masaj salonu Diyarbakır masaj salonu Adana masaj salonu Aydın masaj salonu Kocaeli masaj salonu Muğla masaj salonu Yalova masaj salonu Gaziantep masaj salonu Kütahya masaj salonu Elazığ masaj salonu Bursa masaj salonu Konya masaj salonu Samsun masaj salonu Mersin masaj salonu Manisa masaj salonu Afyon masaj salonu Kütahya masaj salonu Çanakkale masaj salonu Edirne masaj salonu Yozgat masaj salonu Çorum masaj salonu>