কুরআনী কান্না – [মাওলানা আতিকুল্লাহ]

সালাফ-সালেহীনের কথা পড়তে গিয়ে অবাক হয়ে যাই। কুরআন কারীমের প্রতি তাদের ভালোবাসা আর আমাদের ভালোবাসায় কত পার্থক্য! সম্মান ইহতিরামে কত পার্থক্য! বুঝ-সমঝে কত পার্থক্য! শিক্ষা ও নসীহত গ্রহণে কত পার্থক্য! তাদের জীবন আর আমাদের জীবনেও কত পার্থক্য!

তারা কুরআন কারীম পড়তেন পরিপূর্ণ আত্মনিবেদন নিয়ে। পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে। তারা কুরআন কারীম তিলাওয়াত করতেন জীবন্ত অনুভূতি নিয়ে। তারা ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে কুরআন কারীম অনুভব করতেন। কুরআন কারীমের যা কিছু শুনতেন, যা কিছু তিলাওয়াত করতেন, সাথে সাথে মানতেন। কুরআন কারীমের শিক্ষার বিপরীত কিছু করার কথা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতেন না। কুরআন কারীম তিলাওয়াত ছিলো তাদের রোগের উপশম। মানসিক অস্থিরতার প্রশান্তি। পাপ থেকে বাঁচার মাধ্যম। সামাজিক সমস্যার সমাধান।

কুরআন কারীম শুধু আমাদের মতো সাধারন মানুষের জন্যেই নয়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের জন্যেও শিক্ষার মাধ্যম ছিলো। আল্লাহ তা‘আলা নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,

وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا ۚ مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَٰكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا ۚ وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

এভাবেই আমি আমার নির্দেশে আপনার প্রতি ওহীরূপে নাযিল করেছি এক রূহ। ইতঃপূর্বে আপনি জানতেন না কিতাব কী এবং (জানতেন) না ঈমান। কিন্তু আমি একে (অর্থাৎ কুরআনকে) বানিয়েছি এক নূর, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে চাই হেদায়াত দান করি। নিশ্চয়ই আপনি মানুষকে দেখাচ্ছেন হেদায়াতের সেই সরল পথ (শুরা ৫২)।

কুরআন কারীম নাযিল হওয়ার আগে নবীজির অবস্থা একরকম ছিল, নাযিল হওয়ার পরে আরেক অবস্থা। কুরআন কারীমের ছোঁয়ায় নবীজি আরও বেশি অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন,

﴿نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ وَإِنْ كُنْتَ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ﴾

(হে নবী!) আমি ওহী মারফত এই যে কুরআন আপনার কাছে পাঠিয়েছি, এর মাধ্যমে আপনাকে এক উৎকৃষ্টতম ঘটনা শোনাচ্ছি, যদিও আপনি এর আগে এ সম্পর্কে (অর্থাৎ এ ঘটনা সম্পর্কে) বিলকুল অনবহিত ছিলেন (ইউসুফ ৩)।

নবীজিও কুরআন কারীমের প্রভাবে বদলে যেতেন।

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهم عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ وَكَانَ يَلْقَاهُ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ الْقُرْآنَ فَلَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهم عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدُ بِالْخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের কাজে ছিলেন সবচেয়ে বেশি দানশীল, বিশেষকরে রমযান মাসে। (তাঁর দানশীলতার কোন সীমা ছিল না) কেননা, রমযান মাসের শেষ পর্যন্ত প্রতি রাতে জিবরাঈল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তিনি তাঁকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। যখন জিবরাঈল তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি কল্যাণকর ব্যাপারে প্রবহমান বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল হতেন (ইবনে আব্বাস র.। বুখারী)।

কুরআন নাযিল হওয়ার আগে কেমন ছিলেন সে বিষয়ে আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু কুরআন নাযিল হওয়ার পর, কুরআন কারীমের সংস্পর্শও নবীজিকে আন্দোলিত করত। পাক কালামের ছোঁয়ায় নবীজি হয়ে যেতেন আরও দানশীল। আরও মুক্তহস্ত। মুক্তবায়ুর মতো উদার। কুরআনি নূরে তার দানশীলতা বৃদ্ধি পেত। ইয়াকীন ও ঈমান বেড়ে যেতো। কর্মোদ্যম বৃদ্ধি পেতো। নবীজির অবস্থা যদি এমন হয়, আমাদের মতো দুর্বল ঈমানদারের অবস্থা কেমন হবে? তাহলে নিজের ঈমান বৃদ্ধির জন্যে আমি কুরআন কারীমের প্রতি কতোটা মুখাপেক্ষী?

নবীজির অনেক বৈশিষ্ট্য ছিলো, একটা বৈশিষ্ট্য রাব্বে কারীম এভাবে বলেছেন,

﴿رَسُولٌ مِنَ اللَّهِ يَتْلُو صُحُفًا مُطَهَّرَةً﴾

আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একজন রাসুল, যিনি পবিত্র গ্রন্থ পড়ে শোনান (বাইয়িনাহ ২)।

আগের যুগের আহলে কিতাবের ঘটনা বলে, আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাদের মধ্যে অনেক ভালো মানুষও ছিল। তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত,

﴿أُمَّةٌ قَائِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللَّهِ آنَاءَ اللَّيْلِ﴾

যারা রাতের বেলা আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে (আলে ইমরান ১১৩)।

আল্লাহ তা‘আলা নানা ভঙ্গিতে, নানা আঙ্গিকে আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, আমরা যেন কুরআন কারীমের সাথে সম্পর্ককে গভীর করি। সুদৃঢ় করি। কখনো তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন তাদাব্বুর করার প্রতি মনোযোগী করে,

﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ﴾

তারা কি কুরআন কুরআন সম্পর্কে চিন্তা করে না? (মুহাম্মাদ ২৪)।

কখনো উদ্বুদ্ধ করেছেন, চুপচা তিলাওয়াত শুনতে বলে,

﴿وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا﴾

যখন কুরআন পড়া হয় তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক (আ‘রাফ ২০৪)।

কখনো আদেশ করেছেন মনোযোগ দিয়ে আকর্ষণীয় সুরে তিলাওয়াত করতে,

﴿وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا﴾

ধীরস্থিরভাবে স্পষ্টরূপে কুরআন তিলাওয়াত করো (মুযযাম্মিল ৪)।

কখনো বলেছেন, তিলাওয়াতের আগে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে। আল্লাহর কাছে, শয়তান দুরভিসন্ধি থেকে পানাহ চাওয়ার মাধ্যমে। যাতে কুরআন তিলাওয়াতের সময় দিল সাফ থাকে। কুরআনের প্রভাব অন্তরে বেশি রেখাপাত করে,

﴿فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ﴾

সুতরাং তোমরা যখন কুরআন পড়বে, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করবে (নাহল ৯৮)।

কখনো সতর্ক করার ভঙ্গিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কুরআন কারীম থেকে দূরে সরে থাকলে, কী ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে সেদিকে ইঙ্গিত করে,

﴿وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا﴾

আর রাসূল বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এ কুরআনকে বিলকুল পরিত্যাগ করেছিল (ফুরকান ৩০)।

কখনো বান্দাকে অভয় দিয়ে বলেছেন,

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ

বস্তুত আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্যে সহজ করে দিয়েছি (কামার ১৭)।

আল্লাহ তা‘আলা কুরআন কারীমের কসম খেয়েছেন। কুরআন কারীমের ভাষাকে প্রশংসার ভঙ্গিতে উল্লেখ করেছেন। কুরআন কারীমকে শ্রেষ্ঠতম আসমানী কিতাব বানিয়েছেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের উপর কুরআন কারীম নাযিল করেছেন। কুরআন কারীমের সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজের দায়িত্বে তুলে নিয়েছেন। এতসব গুরুত্ব নিয়ে কুরআন কারীম কি সাধারণ কোনও কিতাবের মতো হতে পারে?

গভীর রাত। সুনসান নিরব এক স্থান। পিনপতন নিস্তব্ধতা। মাঝেমধ্যে শুকনো পাতা ঝড়ার আওয়াজ আসছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকারাও ঘুমিয়ে গেছে। রাতজাগা নিশিপ্রাণীরাও সুপ্তির কোলে। এমন নিঝুম সময়ে একজন মানুষ জেগে আছে। রবের মহব্বতের মুরাকবায় ডুবে আছে। দূর থেকে ভেসে এল সমুধুর এক লাহান। এক অপার্থিব তারতীল। কুরআন কারীম তিলাওয়াতের অনির্বচনীয় এক নাগমা! মানুষটার কেমন লাগবে? তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় কতোটা উন্মুখ হয়ে সে সুরে ভাসতে শুরু করবে?

কুরআন কারীমকে যারা ভালোবাসেন, তাদের কাছে কুরআনী সুর কেমন করে ধরা দেয়? কুরআনের জান্নাতী সুর তাদের হৃদয়ে কেমন করে পশে? মানবীয় ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব!

একটা কারখানা। বিকট আওয়াজে কারখানার মেশিন চলছে। কানে তালা লাগার যোগাড়। ভেতরে যারা কাজ করছে, তারা সবাই অভ্যস্ত। নতুন কেউ এমন প্রচ- শব্দময় পরিবেশে এল। কানের পর্দা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু বের হওয়ার উপায় নেই। পেটের দায়, কাজ করে যেতে হবে। নইলে মাহিনা শেষে মাইনে মিলবে না। আচানক কোনও কারণে মেশিন এক লহমায় থেমে গেল। নেমে মৃত্যুশীতল নিরবতা! নতুন রোজগার করতে যোগ দেয়া মানুষটা যেন এক বর্ণনাতীত প্রশান্তি অনুভব করল। কুরআন কারীমও মুমিনের মনে এমনই সুখস্পর্শ নিয়ে আসে।

সভা এখনো শুরু হয়নি। সভাস্থলে শুধুই কোলাহল। যে যার মতো গলা উঁচু করে গল্প করে যাচ্ছে। প্রধান অতিথি উপস্থিত হলেন। আচানক পুরো হল নিরব হয়ে গেল। হলজুড়ে কেমন একটা শান্তি শান্তি বিরাজ করতে লাগল। কুরআন কারীমও মুত্তাকীদের হৃদয়ে এমন শীতল বায়ুর সুখদ আমেজ নিয়ে হাজির হয়।

আশেপাশের সবাই ঘুমিয়ে আছে, রাতের তৃতীয় যাম শুরু হয়েছে। পাশের কামরা থেকে কুরআন কারীম তিলাওয়াতের মনকাড়া সুর ভেসে আসছে। এমন সুর যে কারও মনে দাগ কাটবে।

রাতের গাড়ি চলছে। প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাস লাগছে। অনেকক্ষণ হল, বিজন একস্থানে জানজটে আঁটকে আছে গাড়ি। জানালা খোলা যাচ্ছে না ছিনতাইকারীদের ভয়ে। গাড়ির অন্যরা ঘুমে তলিয়ে আছে। চালক মৃদু আওয়াজে তিলাওয়াত ছেড়ে দিলেন। নিমেষেই সমস্ত বিরক্তি উধাও।

একজন বুঝের মানুষ। পর্যাপ্ত ধর্মীয় জ্ঞানও রাখেন। অনেক বোঝানোর পরও কাজ হয়নি। মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। কথায় কথায় মায়ের সাথে রেগে যান। বড় বড় মনীষীর উক্তি দিয়ে বোঝানো হল। মায়ের মর্যাদার সপক্ষে অকাট্য যুক্তি দেয়া হল। উঁহু, কোনও কাজ হল না। আরেকদিন মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করার সময়, এলাকার হুজুর এলেন। তিনি এসে মানুষটার হাত ধরে শুধু একটা আয়াত পড়লেন,

﴿وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا﴾

এবং তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণের সাথে তাদের সামনে নিজেকে বিনয়াবতন করো এবং দু‘আ করো, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছে, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি রহমতের আচরণ করুন (ইসরা ২৪)।

আয়াতটা শোনার সাথে সাথে, মানুষটা ফনা নামানো সাপের মতো শান্ত হয়ে গেল। আর কোনও দ্বিরুক্তি করল না। কুরআন কারীমের আয়াতের শক্তি কেমন, মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না।

আরবী জানেন। কুরআন কারীমও বোঝেন। তার মা বদমেজাজী। ছেলেও মায়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মেজাজ দেখাতে কসুর করে না। দৃশ্যটা তার একজন ওস্তাদের কানে গেল। ওস্তাদ তার শিষ্যকে একান্তে ডেকে নিয়ে বিস্তারিত শুনলেন। শিষ্য নিজের আচরণের সাফাই গাইতে গিয়ে যুক্তিতর্কের অবতারণা করতে শুরু করল। ওস্তাদ প্রথমে তার কথাগুলো চুপচাপ শুনে গেলেন। বাধা দিলেন না। শিষ্য তার মনের যত খেদ ছিল, সব উগড়ে দিল। ওস্তাদ তারপরও চুপ করে রইলেন। অস্বস্তিকর নিরবতা কামরায়। শিষ্য কিছুটা অবাক! সে ভেবেছিল হুজুর তাকে থামিয়ে পাল্টা যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করবেন। ধারনার বিপরীত আচরণের সম্মুখীন হয়ে, সে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। আরও কিছুকাল পর, হুজুর শান্তস্বরে একটা আয়াত পড়লেন,

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا

তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, মাতা-পিতার কোনও একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ্ পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো (ইসরা ২৩)।

আয়াতটা শোনার সাথে সাথে, শিষ্যের মনে কী হলো, আল্লাহ তা‘আলাই ভালো বলতে পারবেন, সে হু হু করে কেঁদে দিল। কুরআন কারীম পাথর দিলকে গলিয়ে মোম করে দিয়েছে।

একজন দা‘ঈ লিখেছেন, আমি যখন পশ্চিমে পড়াশোনা করতে গেলাম, একটা কৌতূহল আমাকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়াত। এখানে যারা ইসলাম গ্রহণ করছে, তারা ইসলামের কী দেখে ঈমান আনছে? ইসলামের কোনও বিষয়টা তাদেরকে প্রভাবিত করেছে? কারণটা জানতে পারলে, অন্যদের মাঝে দাওয়াতী কাজ চালানো সহজ হবে। খুঁজে খুঁজে নবমুসলিম বের করলাম। তাদের সাথে একে একে কথা বলে গেলাম। তাদের লিখিত বই পড়লাম। তাদের সাক্ষাতকারগুলো দেখলাম।

আমার আগে ধারনা ছিল, তারা জটিল দার্শনিক কোনও তত্ত্বের কারণে ঈমান এনেছে। বিজ্ঞানের কোনও সূত্রের সমর্থন পেয়ে মুসলমান হয়েছে। মুসলমানদের আখলাক দেখে মুগ্ধ হয়ে এই দ্বীনে প্রবেশ করেছে। মুহাম্মাদ সা.-এর আদর্শ দেখে তার অনুসারী হয়েছে।

ভুল ভাঙতে দেরী হলো না। আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, তাদের বেশির ভাগই ঈমান এনেছে, কুরআন কারীম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। কেউ আরবী তিলাওয়াত শুনে। কেউ অনুবাদ পড়ে। তাদের বক্তব্য, কুরআন কারীমের মধ্যে কী যেন একটা আছে, যা বাকি আর দশটা সাধারণ বই এমনকি বাইবেলেও নেই। এক সম্বোহনী শক্তি আছে কুরআনে। ব্যক্ত করা যায় না এমন চৌম্বকীয় শক্তি!

আসলেই তাই। কুরআন কারীমে অবিশ্বাস্য এক শক্তি আছে। সরল দৃষ্টিতে যা দেখা যায় না। কাছে এলে অনুভব করা যায়। উপলব্ধি করা যায়। এই কুরআন কি শুধু মানুষকে গলিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে? জি¦ না।

﴿لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ﴾

আমি যদি এ কুরআনকে অবতীর্ণ করতাম কোনও পাহাড়ের উপর, তবে আপনি দেখতেন তা আল্লাহর ভয়ে অবনত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে (হাশর ২১)।

এই আয়াত বলছে, কুরআন কারীমের প্রভাবে, পাথর পর্যন্ত বিদীর্ণ হয়ে যেতো। তাহলে মানুষের উপর কেমন প্রভাব ফেলবে? আরবের বাইরে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তারা প্রায় সবাই আরবী বুঝতো না। কুরআন কারীমের অর্থ বুঝতো না। না বুঝেই তারা এতটা প্রভাবিত হত।

কুরআন কারীম মানুষকে কতোটা বিহ্বল করে দেয়, তার আদর্শ নমুন হল আবু বাকর সিদ্দীক রা.। মক্কী যুগ। তাজা তাজা কুরআন কারীম নাযিল হচ্ছে। মুমিনগণ এই আসমানি নেয়ামত লুফে নিচ্ছেন। তাদের সময় কাটছে কুরআনি রঙে রঙিন হয়ে। চারদিক থেকে থেকে নির্যাতনের স্টিমরোলার নেমে আসছে, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। বনু হাশেম শে‘বে আবি তালেবে বন্দী। নবীজিও সেখানে অন্তরীন হয়ে আছেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে নবীজি মক্কার অসহায় মুসলমানদেরকে হাবশায় হিজরতের অনুমতি দিলেন। আবু বকরও হিজরতের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। আয়েশা রা.-এর বর্ণনা পিতার সেইগুলি বুখারির বর্ণনা ফুটে উঠেছে, তার বর্ণনার সারাংশ ছিলো,

আবু বাকর হাবশায় হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হলেন। পথিমধ্যে মালিক বিন হারিস (ইবনুদ দাগিনাহ)Ñএর সাথে দেখা! ইবনুদ দাগিনাহ সবকথা শুনে আবু বকরকে নিরাপত্তা দিতে সম্মত হলো। আবু বাকর মক্কায় অবস্থান করেই তার রবের ইবাদত করতে পারবে এই মর্মে। আবু বকর ফিরে এলেন। নিজ ঘরে বসেই আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করতে শুরু করলেন।

فابتنى مسجدا بفناء داره وبرز فكان يصلي فيه ويقرأ القرآن فيتقصف عليه نساء المشركين وأبناؤهم يعجبون وينظرون إليه وكان أبو بكر رجلاً بكّاءً لا يملك دمعه حين يقرأ القرآن فأفزع ذلك أشراف قريش من المشركين

কিছুদিন পর আবু বকর নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় একটা মসজিদ নির্মাণ করলেন। সেখানে তিনি সালাত আদায় করতেন। কুরআন তিলাওয়াত করতেন। (তার সালত-কেরাত শোনার জন্যে) মুশরিকদের নারী ও সন্তানের চারদিক থেকে (يتقصف) ভেঙে পড়তো! আবু বকর ছিলেন নমর দিলের মানুষ। কুরআন তিলাওয়াতের সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারতেন না। এমন বেগতিক পরিস্থিতি দেখে, মুশরিক নেতারা ভয় পেয়ে গেল (ভাবার্থ বুখারি)।

এই হাদীসে অনেক লক্ষ্যণীয় বিষয় আছে। আমরা শুধু তিনটি দিককে আলাদা করি,

১: আবু বকর শুধু কাঁদতেন না, কান্নায় ভেঙে পড়তেন। আদরের কন্যা বাবার কান্নার অবস্থা বোঝানোর জন্যে সাধারণ অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করেননি, করেছেন (بكّاءً) শব্দটি। অনেক বেশি কাঁদতেন।

২: কান্নার এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য মুশরিক নারী-শিশুদের চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণ করত। কুরআন তিলাওয়াতের সুর শোনার জন্যে, তারা পতঙ্গের মতো সম্মোহিত হয়ে ছুটে আসতো। মুশরিক স্বামী ও সমাজপ্রভুদের রক্তচক্ষু উপক্ষো করে।

৩: কুরআন কারীমের মধ্যে রাব্বে কারীম কী এমন শক্তি দিয়ে দিয়েছেন, যা মক্কার কট্টর মুশরিকরাও বুঝতে পেরেছিল। এমন শক্তির মুখোমুখি হতে তারা ভয় পেতো। স্ত্রী-পুত্রদেরকেও মুখোমুখি করতে ভয় পেতো?

কুরআনের প্রভাবে গলে যাওয়া প্রকৃত জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য। আমরা যাদেরকে জ্ঞানী মনে করি, তারা প্রকৃত জ্ঞানী নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, প্রকৃত জ্ঞানী কারা?

﴿قُلْ آمِنُواْ بِهِ أَوْ لاَ تُؤْمِنُواْ إِنَّ الَّذِينَ أُوتُواْ الْعِلْمَ مِن قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلأَذْقَانِ سُجَّدًا﴾

(কাফেরদেরকে) বলে দিন, তোমরা এতে ঈমান আন বাা নাই আন, যাদেরকে এর আগে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, তাদের সামনে যখন (কুরআন) পড়া হয় তখন তারা থুতনি ফেলে সিজদায় পড়ে যায় (ইসরা ১০৭)।

আয়াতটা আরেকবার পড়া যেতে পারে। আরও একবার। বারবার। কী চিত্র ফুটে ওঠে? একদল মানুষকে রাব্বে কারীম তার পক্ষ থেকে ইলম দান করেছেন। তাদের সামনে কুরআন কারীম তিলাওয়াত করা শুরু করতে না করতেই, মানুষগুলো কান্নায় ভেঙে পড়লো। রবের প্রতি শ্রদ্ধায় কৃতজ্ঞায় ভালোবাসায় সিজদায় লুটিয়ে পড়লো!

শুধু কি সাধারণ মানুষ? কুরআন কারীম দ্বারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন নবীগণ। তাদের ওপর কুরআন কারীমের প্রভাব কেমন ছিল? কুরআন তাদের মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আনতো?

أُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ آدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْرَائِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا

আদমের বংশধরদের মধ্যে এরাই সে সকল নবী, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। এদের কতিপয় সেসব লোকের বংশধর, যাদেরকে আমি নূহের সাথে (নৌকায়) আরোহণ করিয়েছিলাম এবং কতিপয় ইবরাহীম ও ইসরাঈল (ইয়াকুব)-এর বংশধর। আমি যাদেরকে হিদায়াত দিয়েছিলাম ও (আমার দ্বীনের জন্য) মনোনীত করেছিলাম এরা তাদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সামনে যখন দয়াময় আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হত, তখন তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত। (মারইয়াম: ৫৮)।

সুবহানাল্লাহ! এখানে শুধু একজন নবীর কথা বলা হয়নি। সমস্ত নবীর মৌলিক একটা গুণ বা স্বভাব প্রকাশ করা হয়েছে। তারা আল্লাহর আয়াত শুনে শুধু কাঁদতেনই না, কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়তেন। একটা কথা অন্তকে কতোটা প্রভাব ফেললে, কান্নায় ভেঙে পড়া যায়?

আমাদের পেয়ারা নবীজি? তার কুরআনি কান্না কেমন ছিলো? এ নিয়ে একাধিক ঘটনা আছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন

-একদিন নবীজি আমাকে বললেন,

-(اقرأ علي) আমাকে পড়ে শোনাও তো!

-আপনাকে পড়ে শোনাবো? আপনার উপরই তো কুরআন নাযিল হয়!

-( إني أشتهي أن أسمعه من غيري) অন্যের কাছ থেকে কুরআন শুনতে আমার ভালো লাগে!

আমি সূরা নিসা পড়া শুরু করলাম। পড়তে পড়তে পৌঁছলাম,

فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَىٰ هَٰؤُلَاءِ شَهِيدًا

সুতরাং (তারা ভেবে দেখুক) সেই দিন (তাদের অবস্থা) কেমন হবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং (হে নবী), আমি আপনাকে ওইসব লোকের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব? (৪১)।

এই আয়াত পর্যন্ত। নবীজি তখন বললেন,

-( كف) থামো!

আমি থেমে গেলাম। নবীজির দিকে তাকিয়ে দেখি, তার দু’চোখ খেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরছে।

নবীগণ আল্লাহর কালাম শুনে চোখের পানি ফেলবেন এটাই স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ ও ভিনধর্মী আহলে কিতাব (নাসারা), এখনো মুসলমান হননি এমন কেউ যদি কুরআন শুনে আপ্লুত হয়ে কাঁদেন?

﴿وَلَتَجِدَنَّ أَقْرَبَهُمْ مَوَدَّةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَى ذَلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسِّيسِينَ وَرُهْبَانًا وَأَنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ (৮২)﴾

আপনি মানুষের মধ্যে মুসলিমদের সাথে বন্ধুত্বে সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী পাবেন তাদেরকে যারা নিজেদেরকে নাসারা বলে। এর কারণ এই যে, তাদের মধ্যে অনেক ইলম-অনুরাগী এবং সংসার-বিরাগী দরবেশ রয়েছে। আরও এক কারণ হল যে, তারা অহংকার করে না (আনআম)।

এই মানুষগুলোও যখন কুরআন কারীম শোনে, তখন কেমন হয় তাদের প্রতিক্রিয়া?

وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ

এবং রাসূলের প্রতি যে কালাম নাযিল হয়েছে তারা যখন তা শোনে তখন দেখবে তাদের চোখসমূহকে, তা থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে (মায়িদা ৮৩)।

এই আয়াতে খ্রিষ্টানদের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর কালাম শুনে তারা হক চিনতে পেরেছিল। শুনে নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারেনি। ঝরঝর করে কেঁদে দিয়েছে। আগের আয়াত ও পরের আয়াত দেখলে বিষয়টা আরো স্পষ্ট হবে। এ-অবস্থা শুধু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেই ছিল, এমন নয়। এখনো অনেক সত্যসন্ধানী খ্রিষ্টান এমন আছেন। রূবা কাউইর এমন একজন। জর্দানি খ্রিষ্টান। কুরআন কারীমের ভুল ধরতে এসে সেই কুরআন পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। আমি কি কখনো কুরআন শুনে বা পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম? একজন খ্রিষ্টানের যদি কান্না আসে তাহলে আমার কেন নয়? তাহলে কি বলবো, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে জন্মগতভাবে হক পেয়ে উদাসীন হয়ে পড়েছি?

শুধু কি মানুষ? ফিরিশতাগন পর্যন্ত কুরআন কারীমের তিলাওয়াত শুনে অভিভূতের ন্যায় আচরণ করেছিলেন (‘আশ‘আরী ঘরানা’ দিনলিপি দ্রষ্টব্য)।

কুরআন কারীম শুধু কি মনকেই আর্দ্র করে? কিছু প্রিয় বান্দা আছেন, যাদের শুধু মনই নয়, শরীরের বহির্ভাগও প্রভাবিত হয়ে পড়ে, কুরআন কারীমের প্রভাবে।

اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُتَشَابِهًا مَثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللهِ

আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী এমন কিতাব যার বিষয়বস্তুসমূহ পরস্পর সুসমঞ্জস, যার বক্তব্যসমূহ পরস্পর পুনরাবৃত্তি করে হয়েছে। যাদের অন্তরে তাদের প্রতিপালকের ভয় আছে, তারা এর দ্বারা প্রকম্পিত হয়। তারপর তাদের দেহ-মন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে (যুমার ২৩)।

আল্লাহু আকবার! কুরআনের আয়াত শুনে তাদের চামড়া (جُلُودُ)-ও কুঁকড়ে যায় ভয়ে। (تَقْشَعِرُّ) থরথর করে কেঁপে ওঠে। আবার (تَلِينُ) কোমল হয়ে ওঠে। হায়, আমার চামড়া তো দূরের কথা কলবই ঠিকমত স্থির থাকে না!

বিপরীত চিত্রও আছে। কিছু মানুষ আছে, কুরআন কারীম তাদেরকে বিন্দুমাত্র নাড়া দেয় না। কুরআন কারীম শুনে তাদের ভেতরে কোনও প্রকার তরঙ্গ সৃষ্টি হয় না। কুরআন বোধকে জাগ্রত করে না। তাদের চিন্তাকে উস্কে দেয় না। তাদের ভাবকে ভাবিত করে না। তাদের অন্ধকারে আলোর মশাল জ¦ালে না। মাস কে মাস গত হয়ে যায়, তারা কুরআন নিয়ে বসে না। এটা একটা রোগ। এটা কঠিন এক ব্যাধি,

﴿فَوَيْلٌ لِلْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُمْ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ﴾

সুতরাং ধ্বংস সেই কঠোরপ্রাণদের জন্যে, যারা আল্লাহর যিকির থেকে বিমুখ (যুমার ২২)।

আমি কি প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি? তাওফীকে কুলোয় নিত্য তিলাওয়াত করতে? যদি নিত্যদিন তিলাওয়াত তাওফীকে নসীব হয়, তাহলে ভাবা উচিত, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নেয়ামত। আমি কুরআন তিলাওয়াত করে (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহকে নয়, নিজেকেই কৃতার্থ করেছি। কুরআন তিলাওয়াত করতে পেরে, আমি নিজেই বর্তে গেছি। সৌভাগ্যম-িত হয়েছি। মুবারক হয়েছি। রাবের বিশেষ অনুগ্রহ ছাড়া, এই নেয়ামত লাভ করা সম্ভব নয়,

﴿وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَى مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ أَبَدًا﴾

তোমাদের প্রতি আল্লাহর ফযল রহমত না হলে তোমাদের মধ্যে কেউ কখনও পাক-পবিত্র হতে পারত না (নূর ২১)।

আমি নেক আমল করতে পারছি, আমি ভালো হয়ে চলতে পারছি, এটা রবেরই অনুগ্রহ। এজন্য আমার করণীয় কি?

﴿وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِيَ لَوْلَا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ﴾

আর তারা বলবে, সমস্ত শোকর আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে এই স্থানে পৌঁছিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে না পৌঁছালে আমরা কখনোই (এ স্থলে) পৌঁছতে পারতাম না (আ‘রাফ ৪৩)।

হেদায়াত লাভ ও ইবাদতের তাওফীক লাভ করার জন্যে বান্দার প্রধানত দুটি কাজ করা কর্তব্য,

১: আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।

২: ইস্তে‘আনত বা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা।

﴿إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ﴾

(হে আল্লাহ) আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য চাই।

কুরআন কারীম কিছু মানুষের মনে কেন এতটা গভীর রেখাপাত করে? দুটি আয়াতে এদিকে ইঙ্গিত মেলে,

﴿وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ﴾

এবং বলুন, সত্য (কুরআন) এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে (ইসরা ৮১)।

কুরআন কারীম আসার সাথে সাথে, মিথ্যা দূরীভূত হয়ে গেছে। যারা সত্যিকারের মুমিন ও আল্লাহভীরু, কুরআন কারীম তাদের অন্তর থেকে সব ধরনের মিথ্যা দূর করে দেয়। তাই তাদের কলব এতটা বিগলিত হয়ে যায়। কুরআন কারীম তাদের কলব ও আকলের ভ্রান্তি দূর করে দেয়,

﴿بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ﴾

বরং আমি সত্য মিথ্যার উপর নিক্ষেপ করি, যা মিথ্যার মাথা গুঁড়ো করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ তা সম্পূর্ণ নিশ্চি‎হ্ণ হয়ে যায় (আম্বিয়া ১৮)।

সত্যিই কুরআন কারীম মিথ্যাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সত্যকে উদ্ভাসিত করে দেয়। বুখারি থেকে আরেকটি দৃশ্য অবলোকন করা যাক।

বদরে মক্কার সত্তরজন বন্দী হল। তাদের ছাড়িয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে, আলোচনা করার জন্যে পাঠানো হলো জুবায়ের বিন মুতইমকে। মদীনায় পৌঁছতে পৌঁছতে মাগরিবের সময় হয়ে গেল। মদীনার মসজিদে তখন মাগরিবের জামাত শুরু হয়েছে। আর কী করবেন, জামাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলেন। কান খোলা। মসজিদ থেকে ভেসে আসল এক অপার্থিব সুর। জুবায়ের তন্ময় হয়ে শুনছেন। ইমাম আর কেউ নন, স্বয়ং মহানবী সা.। জুবায়ের পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করার পর, সেদিনের স্মৃতি ও অবিস্মরণীয় হিদায়াতবাহী অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন,

-নবীজি সূরা তূর পড়ছিলেন। পড়তে পড়তে পৌঁছে গেলেন,

﴿أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ (৩৫) أَمْ خَلَقُوا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بَلْ لَا يُوقِنُونَ (৩৬) أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ الْمُصَيْطِرُونَ﴾

তারা কি কারও ছাড়া আপনা-আপনিই সৃষ্টি হয়ে গেছে, না কি তারাই (নিজেদের)-স্রষ্টা? না কি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী তারা সৃষ্টি করেছে? না; বরং (মূল কথা হচ্ছে) তারা বিশ্বাসই রাখে না। আপনার প্রতিপালকের ভা-ার কি তাদের কাছে, নাকি তারাই (সবকিছুর) নিয়ন্ত্রক? (৩৫-৩৭)।

আয়াতগুলো শুনে (كاد قلبي أن يطير) আমার হৃদয় উড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল (বুখারী)।

আল্লাহু আকবার! একজন মুশরিক! তাকেও কুরআন কারীম এভাবে মাবহুত (অভিভূত) করে দিয়েছে? হৃদয় উড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল? ভয়ে? বিস্ময়ে? মুগ্ধতায়? অথচ তিনি আল্লাহর কালাম শুনেছিলেন তার ঘোরতর শত্রুর মুখ থেকে। তার তো ঘৃণা উদ্রেক হওয়ার কথা ছিল! কিন্তু কুরআন কারীম তাকে অসহায় করে দিয়েছে।

আরেকদিন। মক্কার বইরে। নবীজি ফজরের সালাতে সূরা জি¦ন তিলাওয়াত করছিলেন। একদল জি¦ন সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তারা অবাক! এত সুন্দর সুর আর এত চমৎকার কথা? কাছে ঘনাল। তন্ময় হয়ে শুনল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ তেলাওয়াত। চিত্রটা রাব্বে কারীম কী সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন,
﴿وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَرًا مِنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوا أَنْصِتُوا﴾

এবং (হে রাসূল!) স্মরণ করুন, যখন আমি এক দল জিনকে কুরআন শোনার জন্যে আপনার অভিমুখী করে দিয়েছিলাম। যখন তারা সেখানে পৌঁছল, (একে অন্যকে) বলল, চুপ কর (আহকাফ ২৯)।

জীবনে এই প্রথম কুরআন শুনল তারা। শোনার সাথে সাথেই ভদ্র হয়ে গেল। আদব শিখে গেল। একে অপরকে চুপ থাকতে বলল। শুধু তাই নয়,

فَلَمَّا قُضِيَ وَلَّوْا إِلَىٰ قَوْمِهِم مُّنذِرِينَ

তা পড়া হয়ে গেলে তারা আপন সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।

সুবহানাল্লাহ! কুরআন কারীম শোনার বরকতে তারা একেকজন দায়ীতে পরিণত হল। শুধু তাই নয়, তারা সেদিন কুরআন কারীম শুনে বিস্ময়াভিভূত হয়ে গিয়েছিল। নিজ দেশে ফিরে সেটা অন্যদেরকে কাছে প্রকাশও করেছিল,

﴿قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا﴾

(হে রাসূল!) আপনি বলে দিন, আমার কাছে ওহী এসেছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে (কুরআন) শুনেছে অতঃপর (নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে) বলেছে, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি (জি¦ন ১)।

এমন অসাধারণ এক কুরআন কারীম ভাগে পেয়ে, আমি কি তার যথাযথ কদর করছি? আমি যদি কুরআন কারীমকে অবহেলা করি, তার পরিণতি কিন্তু ভয়াবহ! স্বয়ং নবীজি আমার বিরুদ্ধে রাব্বে কারীমের দরবারে অভিযোগ দায়ের করবেন,

﴿وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا﴾

আর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এ কুরআনকে বিলকুল পরিত্যাগ করেছিল (ফুরকান ৩০)।

এই আয়াতে সম্প্রদায় বলে যদিও কাফেরদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তবুও কুরআন কারীমকে অবহেলা করলে, মুমিন বান্দাও কেয়ামতের দিন ফেঁসে যাওয়ার আশংকা থেকে যায়।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.