চাঁদা ও চাঁদাবাজিঃ কওমী ও সরকারী বিতর্কের সমাধান

(লেখাটি বড়-ছোট সবাইকে পড়ার অনুরোধ করছি)

একটি কওমী মাদ্রাসা। সকাল দশটা। মুহতামিম তথা প্রিন্সিপাল সাহেব তার কক্ষে বসে আছেন। মাদ্রাসার পাশের গ্রামের দুইজন লোক তাঁর কক্ষে প্রবেশ করলেন। একজন একটি সদ্য এমপিও (মানথ্লি পে অর্ডার) তালিকাভুক্ত হওয়া একটি আলিয়া মাদ্রাসার আরবী প্রভাষক ও আরেকজন একটি কলেজের অধ্যাপক। মুহতামিম সাহেব তাদেরকে কেক ও চা খাওয়ালেন। খেয়ে আরবী প্রভাষক বললেন, মুহতামিম ভাই! আসলে এভাবে মাদ্রাসা না চালিয়ে আপনি এটিকে এমপিওভুক্ত করার পথে গেলে ভালো হয়। পাবলিকের চাঁদা নিয়ে এভাবে প্রতিষ্ঠান চালানো কেমন জানি লজ্জা লাগে! কলেজের অধ্যাপক প্রভাষকের সাথে সহমত পোষণ করে বললেন, জি! ঠিক। আসলে এভাবে প্রতিষ্ঠান না করে এমপিওভুক্তির পথে গেলেই ভালো হয়। পাবলিকের কাছে আলেমদের হাত পাতা আমার কাছে লজ্জাজনক মনে হয়।

উভয়ের বক্তব্য শুনে মুহতামিম সাহেব বললেনঃ

১. প্রথম কথা হলো, আমরা সাধারণত পরিচিত ও স্থানীয় লোকজন ছাড়া অন্যদের কাছে চাঁদা বা অনুদানের জন্য যাই না এবং অনুদানের জন্য কাউকে জোরাজুরি করা হয় না। তাছাড়া জোরাজুরি করার ক্ষমতা ও রুচি কোনটাও আমাদের নেই।

২. দ্বিতীয়ত আমাদের এ প্রতিষ্ঠান কোনো প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। এটি ইলমের দায়বদ্ধতা তথা প্রতিষ্ঠাতার সামাজিক দায়িত্ব social responsibly পালন করার জন্য আছহাবে ছুফ্ফার আদলে প্রতিষ্ঠিত এক মহৎ উদ্যোগ। এটির প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় কোনো ধরণের বাণিজ্যিক মনোভাব ও সূত্র নেই।

৩. তৃতীয়ত আপনারা যে বললেন, পাবলিকের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া লজ্জাকর, তা সঠিক নয়। পাবলিকের কাছ থেকে চাঁদা নিয়েই আপনাদের গ্রামের মসজিদ ও মক্তবসহ বাংলাদেশের প্রায় সকল মসজিদ ও মক্তব পরিচালনা করা হয়। তাছাড়া আপনাদের গ্রামে প্রতিবছর যে ওয়াজ মাহফিল হয়, সেটির জন্যও পাবলিক থেকে চাঁদা নেওয়া হয়।

৪. মাদ্রাসার জন্য যেসব পাবলিক চাঁদা দেন, তারা স্বেচ্ছায় সওয়াবের নিয়তে কিংবা সমাজে জনপ্রিয়তা লাভের জন্য দিয়ে থাকে। অন্যদিকে সরকারী চাকরীজীবিদের বেতন ও এমপিওর অর্থটা আসে অবৈধ পন্থায় তথা স্বচ্ছল ও দরিদ্র উভয় শ্রেণীর পাবলিক থেকে জোরপূর্বক চাঁদাবাজির মাধ্যমে।

মুহতামিম সাহেবের কথা শোনামাত্র উভয় শিক্ষক বলে উঠলেন, তা কিভাবে? মুহতামি সাহেব উত্তরে বললেন, আপনারাতো ইসলামে বিশ্বাসী তাই না? উভয়ে বললেন, অবশ্য। মুহতামিম সাহেব বললেন, আমাদের রাষ্ট্রটা কি ইসলামী অর্থনীতি অনুযায়ী চলে? তারা বললেন, না। মুহতামি সাহেব বললেন, তাহলে এবার আপনাদের বেতনের টাকার উৎস নিয়ে আমাকে কিছু বলতে দিন। তারা বললেন, জি! বলতে পারেন। মুহতামি সাহেব বললেনঃ

নবীজি ছঃ ও তাঁর খলীফা রাশেদগণের পরিচালিত রাষ্ট্রকেই ইসলামী রাষ্ট্র বলা হয়। জনসাধারণের প্রতি ওই রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব ছিল তিনটি। যথাঃ

১. জামায়াতের সাথে নামাজে কায়েমের ব্যবস্থা করা।

২. চুরি, ডাকাতি ও হত্যাসহ নানা অপরাধের বিচার করে দেশ ও সমাজকে মানুষের জন্য বাসযোগ্য রাখা।

৩. স্বচ্ছল মুসলিম পাবলিকের কাছ থেকে নগদ অর্থ, ব্যবসা, গবাদি পশু ও ফসলের জাকাত, খরাজ (সরকার মালিকানাধীন কৃষি ভূমির কর) এবং অমুসলিমদের কাছ থেকে জিযিয়া (সাধ্য অনুযায়ী নিরাপত্তা কর) ও উশর (ব্যবসার কর) ইত্যাদি তুলে রাষ্ট্রের কর্মচারী ও দরিদ্র নাগরিকদের মাঝে ইনসাফ ভিত্তিক তথা চাহিদা অনুযায়ী বণ্টন করা।

কিন্তু কাফির বৃটিশ ও ফরাসী সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে বা তাদের আদলে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সরকারগুলো এ তিনটি কাজের দুইটি (প্রথম ও তৃতীয়টি) মোটেই পালন করে না। দ্বিতীয় দায়িত্বটি কিছু কিছু রাষ্ট্রে পালিত হলেও তা ইসলামী বিচার ব্যবস্থার বদলে কাফিরদের কাছ থেকে ধার করা ধারণা consept ও ব্যবস্থায়ই পালিত হয়। অন্যদিকে আমাদের মত মুসলিম রাষ্ট্রের সরকারগুলো কাফির রাষ্ট্রগুলোর আদলে অনেক অপ্রয়োজনীয় খাত ও বিভাগ সৃষ্টি করে প্রচুর অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সেনাসদস্য লালন করছে এবং ধনী-গরিব ও সক্ষম-অক্ষম সকল জনগণের কাছ থেকে জোরপূর্বক বিভিন্ন ধরণের কর (পদে পদে ডিউটি, ট্যক্স, ভ্যাট, ফি ও সার্ভিস চার্জ ইত্যাদি) আরোপের মাধ্যমে ওই সব অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিলাসী বেতন, ভাতা ও পেনশন আদায় করছে। অন্যদিকে এসব রাষ্ট্র সমাজে নামাজ প্রতিষ্ঠা তথা মসজিদ ও মক্তব (মৌলিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) পরিচালনা না করে এবং দরিদ্র জনগণের মাঝে জাকাতের অর্থবণ্টনের দায়িত্ব পালন না করে জনসাধারণের বিশেষত মুসলিম নাগরিকদের কষ্ট বহুগুণ বৃদ্ধি করে রেখেছে এবং প্রচুর মানুষ অনাহারে ও ফুটপাতে ধুঁকে ধুঁকে মরছে৷ সারকথা, আপনারা যারা সরকার থেকে বেতন নিচ্ছেন, তাদের টাকাগুলো অবৈধ চাঁদাবাজির সাথে তুল্য অনৈসলামিক পদ্ধতিতে ধনী-গরিব সকল নাগরিকের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা অর্থ থেকেই আসছে। আর সরকার সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামী নীতি ও আদর্শের আলোকে না সাজিয়ে পশ্চিমের কাফিরদের পদ্ধতি অনুসরণ করায় ইসলামী শিক্ষার অভাব ও প্রয়োজনীয়তা থেকে আমাদের মত হুজুরদেরকে এত কষ্ট করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে হচ্ছে।

মুহতামিম সাহেবের কথা শুনে উভয় শিক্ষক বললেন, আপনার কথা ঠিক আছে। তবে সরকারতো আলিয়া মাদ্রাসাগুলোকে এমপিওভুক্ত করে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি কিছুটা হলেও দায়িত্ব পালন করছে। তাই এখানে আবার কষ্ট করে কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করার দরকার কি?

মুহতামিম সাহেব বললেন, হ্যা! এটা সত্য যে, আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর মাধ্যমে এদেশে ইসলামী শিক্ষার প্রসার ঘটছে। তবে কওমী মাদ্রাসাগুলোর মাধ্যমে তা আরো ব্যাপক ও অধিক আন্তরিক ভাবে ঘটছে। আলিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি কওমী মাদ্রাসাও এদেশে থাকা জরুরী ও উপকারী। কারণঃ

১. আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রম ও পরিচালনায় এদেশের অনৈসলামী সরকারের প্রভাব রয়েছে। আলিয়া মাদ্রাসায় অমুসলিম শিক্ষক নিয়োগদান ও পাঠ্যক্রমে অমুসলিম কবি-সাহিত্যিক ও নাস্তিক্যবাদীদের লেখাপত্র রয়েছে।

২. সাধারণত আলিয়া মাদ্রাসায় হেফজখানা, এতীমখানা ও গোরাবা ফান্ড থাকে না। অন্যদিকে প্রতিটি কওমী মাদ্রাসায় তা বিদ্যমান। তাই কওমী মাদ্রাসা না থাকলে দেশে হাফেজদের সংখ্যা, এতীম ও দরিদ্রদের পড়াশোনার হার অনেক কমে যেতো।

৩. কওমী মাদ্রাসার পড়াশোনা সাধারণত আলিয়া মাদ্রাসার চেয়ে অনেক আন্তরিক পরিবেশ ও অধিক গুরুত্ব সহকারে হয়। তাছাড়া কওমী মাদ্রাসা থাকায় অনেক দীনদার মুসলমান দান-সদকা ও জাকাত-ফিতরা দেওয়ার কাজটি অনেক সহজ ভাবে করতে পারছে।

৪. কওমী মাদ্রাসায় অবৈধ আয়ের অনৈসলামী সরকার থেকে অনুদান আসে না। এগুলো সাধারণত শুধুমাত্র ধর্মপ্রাণ জনসাধারণের স্বেচ্ছায় প্রদত্ত অনুদান ও জাকাত-ফিতরার টাকায় পরিচালিত হয়। অনেক কওমী মাদ্রাসার মাহফিলের দাওয়াত নামায় হারাম আয় থেকে মাদ্রাসায় দান না করার নির্দেশ লেখা থাকে। তো এ হিসেবে কওমী মাদ্রাসা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে উত্তম এবং কওমী শিক্ষকদের বেতনের উৎস সরকারী হারাম ইনকাম সোর্সের বিপরীতে হালাল উৎস থেকেই আসে।

হ্যা! তবে কোনো কওমী মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যদি জানে, কোনো দাতা ব্যক্তির ইনকাম অকাট্য হারাম, তাহলে তার অনুদান গ্রহণ করা তাদের জন্য জায়েয হবে না। অন্যদিকে কোনো কওমী মাদ্রাসার মুহতামিম বা শিক্ষক যদি মাদ্রাসার নামে চাঁদা তুলে প্রাপকদের পিছনে খরচ না করে নিজে ভোগবিলাস করে, তাহলে সেটিও নিঃসন্দেহে হারাম ও অন্যায় কাজ। তবে এর জন্য ওই লোকের রক্তমাংস দায়ী; কওমী শিক্ষাপদ্ধতি নয়।

মুহতামিম সাহেবের জ্ঞানগর্ভ কথা শোনে প্রভাষক ও অধ্যাপক সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না এবং ‘ঠিক আছে’ বলে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন৷

মহান রব আমাদেরকে তাঁর ঈমানদার বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করুন।

আবুল হুসাইন আলেগাজী

০৬.০২.২০১৮, চট্টগ্রাম।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.