দাম্পত্যজীবন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও পরিণাম (আল্লামা আবু তাহের মিসবাহ দা.বা.)

কিছু দিন আগে আমার এক প্রিয় তালিবে ইলম দেখা করতে এসে বললো, হুযূর, আগামী পরশু আমার বিবাহ। চমকে উঠেতাকালাম। বড় ‘বে-চারা’ মনে হলো। কারণ আমিও একদিন বড়অপ্রস্ত্তত অবস্থায় জেনেছিলাম, আগামীকাল আমার বিবাহ! ভিতরথেকে হামদরদি উথলে উঠলো। ইচ্ছে হলো তাকে কিছু বলি,যিন্দেগির এই নতুন রাস্তায় চলার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পাথেয়,আল্লাহর তাওফীকে তাকে দান করি। আল্লাহর তাওফীক ছাড়াআমরা কেই বা কী করতে পারি!

তো তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, বিবাহের জন্য কী প্রস্ত্ততি নিয়েছো?বড় ভোলাভালা নও জোয়ান! সরলভাবে বললো, আমার কিছুকরতে হয়নি, সব প্রস্ত্ততি আববা -আম্মাই নিয়েছেন। কেনা-কাটাপ্রায় হয়ে গেছে, শুধু বিয়ের শাড়ীটা বাকি।

অবাক হলাম না, তবে দুঃখিত হলাম, আমার এই প্রিয় তালিবেইলম এখন একজন যিম্মাদার আলিমে দ্বীন। দীর্ঘ কয়েক বছরআমাদের ছোহবতে ছিলো, তার কাছে বিবাহের প্রস্ত্ততি মানেহলো জিনিসপত্র এবং বিয়ের শাড়ী! তাহলে অন্যদের অবস্থা কী?!

বড় মায়া লাগলো; বললাম, দেখো, মানুষ যে কোন কাজ করতেচায়, প্রথমে সে ঐ বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করে। কাজটিরহাকীকত ও উদ্দেশ্য কী? কাজটি আঞ্জাম দেয়ার সঠিক পন্থা কী?শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী কী সমস্যা হতে পারে, সেগুলোরসমাধান কী? এগুলো জেনে নেয়। এজন্য দস্ত্তর মত আমাদেরশিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার আয়োজন আছে, এমনকি বাস্তবপ্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা আছে।

অথচ জীবনের সবচে’ কাঠিন ও জটিল অধ্যায়ে মানুষ প্রবেশকরে, বরং বলতে পারো ঝাঁপ দেয়, কিছু না শিখে, না জেনে এবংনা বুঝে একেবারে অপ্রস্ত্তত অবস্থায়। ফল কী হতে পারে?! কীহয়?! অন্যদের কথা থাক, চোখের সামনে আমার ক’জন ছাত্রেরঘর ভেঙ্গে গেলো! একজনের তো এমনকি দু’জন সন্তানসহ। কিংবাঘর হয়ত টিকে আছে, কিন্তু শান্তি নেই। স্বাভাবিক শান্তি হয়তবজায় আছে, কিন্তু বিবাহ যে দুনিয়ার বুকে মানবের জন্য আল্লাহরদেয়া এক জান্নাতি নেয়ামত, সুকূন ও সাকীনাহ, সে খবর তারাপায়নি, শুধু অজ্ঞতার কারণে, শুধু শিক্ষার অভাবে।

আশ্চর্য, মা-বাবা সন্তানকে কত বিষয়ে কত উপদেশ দান করেন;উস্তাদ কত কিছু শিক্ষা দেন, নছীহত করেন, কিন্তু জীবনের সবচে’কঠিন ও জটিল বিষয়টি কেন যেন তারা সযত্নে এড়িয়ে যান!

তাকে বললাম, যদিও তুমি এ উদ্দেশ্যে আসোনি তবু তোমাকেকিছু কথা বলতে চাই, যা ইনশাআল্লাহ আগামী জীবনে তোমারকাজে আসবে।

খুব জযবা ছিলো, অবেগের তোড় ছিলো, ‘দিল কো নিচোড় ক্যর’,বাংলায় যদি বলি তাহলে বলবো, হৃদয় নিংড়ে, কিন্তু দিল কোনিচোড়না-এর ভাব হৃদয় নিংড়ানোতে আসবে কোত্থেকে! যাক,বলছিলাম, হৃদয়টাকে নিংড়ে কিছু কথা তাকে বলেছিলাম। পরেআফসোস হলো যে, কথাগুলো তো সব হাওয়ায় উড়ে গেলো, যদিবাণীবদ্ধ করে রাখা যেতো কত ভালো হতো! হয়ত আল্লাহর বহুবান্দার উপকারে আসতো। শেষে বললাম, এককাজ করো, একথাগগুলোর খোলাছা কাগজে লিখে আমাকে দেখিও।

আগামী পরশুর বিয়ের খবর দিয়ে ছেলেটা সেই যে গেলো, তিনবছরে আর দেখা নেই! দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিভিন্নসময় দরসেও আমি অনেক কথা বলেছি। ‘সবচে’ বেশী বলেছিআমার নূরিয়ার জীবনের প্রিয় ছাত্র (বর্তমানের হাতিয়ার হুযূর)মাওলানা আশরাফ হালীমীকে, আশা করি তিনি সাক্ষ্য দেবেন,অনেকবার বলেছেন, আমার কথাগুলো তার জীবনে বে-হদউপকারে এসেছে। আরো অনেকে বলেছে, কিন্তু কথাগুলো কেউ‘কলমবন্দ’ করেনি।

তো এখন এই উপলক্ষকে কেন্দ্র করে তোমাদের মজলিসে ঐকথাগুলো আবার বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আফসোস, সেইআবেগ ও জযবা তো এখন নেই যা ঐ প্রিয় তালিবে ইলমকে বলারসময় ছিলো। আবেগভরা দিলের কথা তো রসভরা ইক্ষু, আর শুধুচিন্তা থেকে বলা কথা হলো রস নিংড়ে নেয়া ইক্ষুর ছোবা! তবু কিছুনা কিছু ফায়দা তো ইনশাআল্লাহ হবে।

আমি আমার প্রিয় ছাত্রটিকে বলেছিলাম, এখন তোমার জীবনেরএই যে নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে উর্দূতে এটাকে বলে ইযদিওয়াজীযিন্দেগী, বাংলায় বলে দাম্পত্য জীবন, অর্থাৎ এটা জীবন ওযিন্দেগির খুবই এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ, শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়,বরং অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এটা তোমাকে ঘাবড়ে দেয়ার জন্যবলছি না; প্রয়োজনীয় প্রস্ত্ততি গ্রহণ ও পাথেয় সংগ্রহ করার জন্যবলছি, যাতে পূর্ণ আস্থা ও সাহসের সঙ্গে তুমি তোমার এই নতুনজীবন শুরু করতে পারো। আল্লাহ যদি সাহায্য করেন তাহলে সবইসহজ।

এটা যে শুধু তোমার ক্ষেত্রে হচ্ছে তা নয়! আমার জীবনেও হয়েছে,আমার মা-বাবার জীবনেও হয়েছে! তোমার মা-বাবাও একদিন এজীবন শুরু করেছিলেন। যদি সহজ ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থাকে তাহলেতোমার মাকে, বাবাকে জিজ্ঞাসা করতে পারো, কীভাবে তারা এদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন? জীবনের শুরুতে তারা কীভেবেছিলেন, কী চেয়েছিলেন, কী পেয়েছেন?

কখন কী সমস্যা হয়েছে, সেগুলো কীভাবে সমাধান করেছেন। এইজীবনের শুরুতে তোমার প্রতি তাদের কী উপদেশ? এধরনেরসহজ আন্তরিক আলোচনায় সংসার জীবনের পথচলা অনেক সহজহয়ে যায়। অবশ্য সব মা-বাবার সঙ্গে সব সন্তানের এমন সহজসম্পর্ক থাকে না, তবে থাকা উচিত। জীবনের যে কোন সমস্যারসমাধানের জন্য সন্তান মা-বাবার কাছেই আসবে, মা-বাবাকেইনিরাপদ আশ্রয় মনে করবে, বন্ধুবান্ধবকে নয়। কঠিন সমস্যারমুখে একজন অপরিপক্ব বন্ধু কীভাবে সঠিক পথ দেখাতে পারে!কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই ঘটে। সন্তান মা-বাবাকে ভয় করে,হয়ত কোন জটিলতায় পড়েছে; তখন তাদের প্রথম চেষ্টা হয় যে,মা-বাবা যেন জানতে না পারে, কারণ তাদের কানে গেলেসর্বনাশ! ছেলে তার বন্ধুর শরণাপন্ন হয়, মেয়ে তার বান্ধবীর কাছেবলে, তারা তাদের মত করে পরামর্শ দেয়। ফলে অবস্থা আরোগুরুতর হয়।

অতীতে যাই ছিলো, এখন তো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, মা-বাবারজন্য সন্তানের বন্ধু হওয়া। বিপদে সমস্যায় সন্তানকে তিরস্কার পরেকরা, আগে তার পাশে দাঁড়ানো। তাহলে সন্তান আরো বড় অন্যায়করা থেকে এবং আরো গুরুতর অবস্থায় পড়া থেকে বেঁচে যায়।কিন্তু এখন অবস্থা হলো, সন্তান মা-বাবাকে ভয় করে, বন্ধুকেনিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে। আমার ছেলেকে আমি এটাবোঝাতে চেয়েছি এবং আশা করি, কিছুটা বোঝাতে পেরেছি।অনেক সমস্যা থেকে সে রক্ষা পেয়েছে, কারণ সবার আগে সেআমার কাছে এসেছে, আর আমি বলেছি, ভয় নেই, আমি তোমারপাশে আছি। আগে তাকে সাহায্য করেছি, তারপর প্রয়োজনেদরদের সঙ্গে তিরস্কার করেছি, বা শিক্ষা দিয়েছি। বন্ধুর কাছেআগে পাওয়া যায় সাহায্য, মা-বাবার কাছ থেকে আগে আসেতিরস্কার। তাই সন্তান সমস্যায় পড়ে মা-বাবার কাছে আসে না,বন্ধুর কাছে আসে। এভাবে নিজের কারণেই সবচে’ কাছের হয়েওমা-বাবা হয়ে যায় দূরের, আর দূরের হয়েও বন্ধু হয়ে যায় কাছের।সন্তানের সমস্যা বন্ধু জানে সবার আগে। মা-বাবা জানে সবারপরে, পানি যখন মাথার উপর দিয়ে চলে যায় তখন।

তো আমি আশা করছি, জীবনের অন্যসকল ক্ষেত্রে যেমন তেমনি,আল্লাহ না করুন দাম্পত্যজীবনে যদি কোন রকম সমস্যার সম্মুখীনহয় তাহলে সন্তান সবার আগে আমার কাছে আসবে, তার মায়েরকাছে আসবে, আমাদের উপদেশ, পরামর্শ নেবে।

আলহামদু লিল্লাহ, সেই রকমের সহজ অন্তরঙ্গ সম্পর্কই সন্তানেরসঙ্গে আমার, আমাদের।

আমার প্রিয় ছাত্রটিকে বললাম, কথা অন্য দিকে চলে গেছে, তোএই প্রসঙ্গে তোমাকে একটি আগাম নছীহত করি; আজ তোমরাস্বামী-স্ত্রী, দু’দিন পরেই হয়ে যাবে, মা এবং বাবা। সেটা তোজীবনের আরো কঠিন, আরো জটিল অধ্যায়। আমি প্রায় বলেথাকি, প্রাকৃতিক নিয়মে মা-বাবা হয়ে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তুআদর্শ মা-বাবা হওয়ার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ শিক্ষা ও দীক্ষা। তোতোমরা দু’জন জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করোযে, একটি মেয়ে কীভাবে একজন আদর্শ মা হতে পারে এবংএকটি ছেলে কীভাবে একজন আদর্শ বাবা হতে পারে! আগেবলেছিলাম একটি নছীহত, এখন বলছি দু’টি নছীহত।

সন্তানের সামনে কখনো তার মাকে অসম্মান করো না। তোমাকেমনে রাখতে হবে, সে তোমার স্ত্রী, কিন্তু তোমার সন্তানের মা,তোমার চেয়েও অধিক শ্রদ্ধার পাত্রী। সন্তান যেন কখনো, কখনোইমা-বাবাকে ঝগড়া-বিবাদ করতে না দেখে। এ নছীহত আমিতোমাকে করছি, আল্লাহর শোকর নিজে আমল করে। আমার বড়সন্তানের বয়স ত্রিশ বছর, এর মধ্যে কখনো সে আমাদের বিবাদকরতে এমনকি তর্ক করতেও দেখেনি। দ্বিতীয়ত তোমরা উভয়েসন্তানের বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করো, এমন বন্ধু যাকে নিজের মনেরকথা, সব কথা নিঃসঙ্কোচে জানাতে পারে।

আগের কথায় ফিরে আসি; আগামীপরশু তোমার বিবাহ। তারমানে, আজ তুমি নিছক একটি যুবক ছেলে, অথচ আগামী পরশুহয়ে যাচ্ছো, একজন দায়িত্ববান স্বামী। কত বিরাট পার্থক্য তোমারআজকের এবং আগামী পরশুর জীবনের মধ্যে। বিষয়টি তোমাকেবুঝতে হবে। কেন তুমি বিবাহ করছো? বিবাহের উদ্দেশ্য কী?দেখো, আমাদের দেশে পারিবারিক পর্যায়ে একটা নিন্দনীয়মানসিকতা হলো, সংসারের প্রয়োজনে, আরো খোলামেলা যদিবলি, কাজের মানুষের প্রয়োজনে ছেলেকে বিয়ে করানো। সবাইযে এমন করে তা নয়, তবে এটা প্রবলভাবে ছিলো, এখনো কিছুআছে। আমি নিজে সাক্ষী, আমার একজন মুহতারাম তাঁর মেয়েকেবিয়ে দিলেন, বিয়ে হওয়ামাত্র ছেলের বাবা স্বমূর্তি ধারণ করেবলতে লাগলেন, আর দেরী করা যাবে না, তাড়াতাড়ি মেয়ে বিদায়করেন। মেয়ের মা ও বাবা তো হতবাক!

মেয়ে বিদায় হলো। শশুরবাড়ীতে রাত পোহালো, আর পুত্রবধুরসামনে কাপড়ের স্ত্তপ নিক্ষেপ করে শাশুড়ী আদেশ করলেন,কাপড়ে সাবান লাগাও, দেখি, মায়ের বাড়ী থেকে কেমন কাজশিখে এসেছো!

আমার এক ছাত্রের কথা, বিয়ের প্রয়োজন। কেন? কারণ মা-বাবারখেদমত করার কেউ নেই।

এটা কিন্তু বিবাহের উদ্দেশ্য বা মাকছাদ হতে পারে না। মা-বাবারখেদমত মূলত তোমার দায়িত্ব। এখন সে যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবেতোমার সাথে এতে শরীক হয়, তবে সেটা তোমাদের উভয়েরজন্য সৌভাগ্যের কারণ হতে পারে। দেখো, আল্লাহ চাহে তোঅচিরেই আমাদেরও ঘরে পুত্রবধু আসবে। আমরা আমাদের নাদেখা সেই ছোট্ট মেয়েটির প্রতীক্ষায় আছি। কিন্তু আমি আমারপুত্রকে অবশ্যই বলবো, বিবাহের উদ্দেশ্য মা-বাবার খেদমত করাহতে পারে না।

আমি দু’আ করি, তোমার মা-বাবা তোমার যেমন, তেমনি তোমারস্ত্রীরও যেন মেহেরবান মা-বাবা হতে পারেন। আমার দুই মেয়েরশশুর, দু’জনই এখন জান্নাতবাসী (ইনশাআল্লাহ)। আল্লাহর কাছেআমার সাক্ষ্য এই যে, সত্যি সত্যি তারা আমার মেয়েদু’টির ‘বাবা’ছিলেন। আমার ছোট মেয়ের শশুর বড় আলিম ছিলেন, তাঁকেআমার একটি বই হাদিয়া দিয়েছিলাম এভাবে, ‘সাফফানারআববুর পক্ষ হতে সাফফানার আববাকে’। তিনি খুশী হয়ে অনেকদু’আ করেছিলেন, আর বলেছিলেন, ‘আপনি তো এই ছোট্ট একটিবাক্যে সম্পর্কের মহামূল্যবান এক দর্শন তুলে ধরেছেন!

আমার বড় মেয়ের অবস্থা হলো, মায়ের বাড়ী থেকে যাওয়ার সময়সে কাঁদে না, কাঁদে ‘আম্মার’ বাড়ী থেকে আসার সময়।

দুআ’ করি, আমার দেশের প্রতিটি মেয়ে যেন মা-বাবার ঘর থেকেএমন মা-বাবার ঘরে প্রবেশ করতে পারে। আর তুমি দু’আ করো,আমরা দু’জন যেন আমাদের অনাগত মেয়েটির জন্য তেমন মা-বাবাই হতে পারি।

তো বলছিলাম বিবাহের উদ্দেশ্যের কথা। বৈধ উপায়ে স্ত্রীপরিচয়েকাউকে ভোগ করা, এটাও বিবাহের উদ্দেশ্য বা মাকছাদ হতেপারে না।

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে বলা হয় শরীকে হায়াত, জীবনসঙ্গী এবংজীবনসঙ্গিনী। বস্ত্তত এই শব্দটির মধ্যেই দাম্পত্য জীবনেরসুমহান উদ্দেশ্যটি নিহিত রয়েছে। আর যদি কোরআনের ভাষায়বলি তাহলে বিবাহের উদ্দেশ্য হল,

هن لباس لكم وانتم لباس لهن

তুমি তো কোরআন বোঝো। ভেবে দেখো, দাম্পত্য-সম্পর্কের কীগভীর তাৎপর্য এখানে নিহিত!

পেয়ারা হাবীব ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বিবাহহচ্ছে আমার সুন্নত। আর বলেছেন, যে আমার সুন্নতের প্রতি বিমুখহবে সে আমার উম্মতভুক্ত নয়।

বিবাহ নবীর সুন্নত! সুতরাং সহজেই বোঝা যায়, বিরাট ও মহানকোন মাকছাদ রয়েছে এর পিছনে।

বিবাহের আসল মাকছাদ বা উদ্দেশ্য হলো স্বামী ও স্ত্রী- এইপরিচয়ে একটি নতুন পরিবার গঠন করা এবং মা ও বাবা- এইপরিচয়ে সন্তান লাভ করা। তারপর উত্তম লালন-পালন এবংআদর্শ শিক্ষা-দীক্ষা ও তারবিয়াতের মাধ্যমে নেক সন্তানরূপে গড়েতুলে দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করা, যাতে নস্লে ইনসানি বামানববংশ কেয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর পছন্দমত আগে বাড়তেথাকে।

এটাই হলো বিবাহের আসল উদ্দেশ্য; অন্য যা কিছু আছে তা সবপার্শ্ব-উদ্দেশ্য। তো এখনই তুমি নিয়ত ঠিক করে নাও যে, কেন কীউদ্দেশ্যে বিবাহ করবে। উদ্দেশ্য যদি ঠিক হয়ে যায় তাহলেদেখতে পাবে, আল্লাহ চাহে তো এখনই তোমার ভিতরে কত সুন্দরপরিবর্তন আসছে! কী আশ্চর্য এক পরিপূর্ণতা নিজের মধ্যে অনুভূতহচ্ছে! আগামী জীবনের সকল দায়দায়িত্ব পালন করার জন্য গায়বথেকে তুমি আত্মিক শক্তি লাভ করছো। আল্লাহ তাওফীক দানকরেন।

এবার আসো জীবনের

বাস্তবতার কথা বলি, এতদিন তোমার জীবনে ছিলেন শুধু তোমারমা, যিনি তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, প্রসববেদনা ভোগকরেছেন। নিজেকে তিলে তিলে ক্ষয় করে তোমাকে প্রতিপালনকরেছেন। এতদিন তোমার উপর ছিলো তাঁর অখন্ড অধিকার।হঠাৎ তিনি দেখছেন, তাঁর আদরের ধন, তাঁর অাঁচলের রত্ন পুত্রেরজীবনে স্ত্রীপরিচয়ে অন্য এক নারীর প্রবেশ (অনুপ্রবেশ?) ঘটেছে!এভাবে পুত্রের উপর তার অখন্ড অধিকার খন্ডিত হতে চলেছে।যে পুত্র ছিলো এতদিন তাঁর একক অবলম্বন, এখন সে হতেচলেছে অন্য এক নারীর অবলম্বন। এ বাস্তবতা না তিনি অস্বীকারকরতে পারছেন, না মেনে নিতে পারছেন। সংসারে প্রত্যেক মায়েরজীবনে এ কঠিন সময়টি আসে। এমন এক অর্ন্তজ্বালা শুরু হয় যাশুধু তিনি নিজেই ভোগ করেন, কাউকে বোঝাতে পারেন না,এমনকি এতদিনের আদরের ধন পুত্রকেও না। ফলে সামান্যসামান্য কারণে, এমনকি অকারণেও তিনি খুব সংবেদনশীল হয়েপড়েন; তাঁর অনুভূতি আহত হয়। এমন সময় ছেলে (এবং তার স্ত্রীঅজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা ও অপিরপক্বতার কারণে) যদি অসঙ্গত কিছুবলে বা করে বসে তাহলে তো মায়ের মনে কষ্টের শেষ থাকে না।প্রসববেদনা থেকে শুরু করে প্রতিপালনের সব কষ্ট একসঙ্গে মনেপড়ে যায়।

আম্মার কাছে শুনেছি, গ্রামের এক মা তার পুত্রবধুকে বলেছিলেন, ‘ততা ফানি আমি খাইছিলাম, না তুই খাইছিলি?’

তখনকার যুগে প্রসবপরবর্তী বেশ কিছু দিন মা ও শিশুর স্বাস্থ্যগতকল্যাণ চিন্তা করে মাকে গরম পানি খেতে দেয়া হতো, ঠান্ডা পানিদেয়া হতো না।

তো কথাটা কিন্তু নির্মম। আমার জন্য ‘তাতানো পানি’ আমার মাখেয়েছেন, আমার সব আবর্জনা আমার মা পরিস্কার করেছেন।নিজের জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে তিনি আমাকে বড় করেছেন,উপযুক্ত করেছেন। সেই সব কষ্টের সুফল হঠাৎ করে অন্য একটিমেয়ে এসে অধিকার করে বসেছে। তখন সব হারানোর একটাবেদনা তাকে কুরে কুরে খায়। তো তোমার মায়ের অন্তরেও এরকমঅনুভূতি হওয়া স্বাভাবিক। মায়ের মনের এই কষ্টের উপশম, এইবেদনার সান্ত্বনা তোমাকেই চিন্তা করতে হবে।

মায়ের পর দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে বাবার কথা, তারপর ভাই-বোনদের কথা। (এসম্পর্কেও ছাত্রটিকে বিশদভাবে বলেছিলাম।)

তৃতীয়ত তোমার স্ত্রী। যদিও তৃতীয় বলছি, কিন্তু বাস্তবে এটাই হলোসবচে’ গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচে’ নাযুক। তবে এটা থাকবে তোমারদিলে, তোমার অন্তরে। মা-বাবার সামনে মুখের কথায় বা আচরণেএটা প্রকাশ করা প্রজ্ঞার পরিচায়ক হবে না।

কেন বলছি স্ত্রীর বিষয়টি সবচে’ নাযুক? তার আগে আমার একটিপ্রশ্নের উত্তর দাও; কোন বিবাহে কোন ছেলেকে কাঁদতেদেখেছো?! কোন ছেলের মা-বাবাকে বিষণ্ণ দেখেছো?! দেখোনি; (হয়তো ব্যতিক্রম এক দুইটি ঘটনা থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণঅবস্থা এটিই, এদের কেউ কাঁদে না।) কেন? কারণ বিবাহেরমাধ্যমে ছেলে কিছু হারায় না, ছেলের মা-বাবা কিছু হারায় না,বরং অর্জন করে। তাই তাদের মুখে থাকে অর্জনের হাসি এবংপ্রাপ্তির তৃপ্তি।

বিবাহের আসরে কাঁদে শুধু মেয়ে, আর মেয়ের মা-বাবা। কেনকাঁদে একটি মেয়ে? কারণ তাকে সবকিছু হারাতে হয়, সবকিছুত্যাগ করতে হয়। মা-বাবাকে ছেড়ে আসতে হয়, শৈশবের সবস্মৃতি তাকে মুছে ফেলতে হয়। একটি ছোট্ট মেয়ের জীবনে এটিঅনেক বড় আঘাত। এ যেন একটি ছোট্ট গাছের চারাকে শিকড়শুদ্ধউপড়ে ফেলে বহু দূরে ভিন্ন পরিবেশে নতুন মাটিতে এনে রোপণকরা। বাকি জীবন তাকে এই মাটি থেকেই রস আহরণ করে বেঁচেথাকতে হবে।

হিন্দিতে বলে, ‘আওর‌্যত কী ডোলী যাহা উত্যরতী হ্যয়, উসকীআর্থী ওহীঁ সে উঠতি হ্যয়।’ অর্থাৎ মেয়েদের পালকি যেখানে গিয়েনামে, সেখান থেকেই তার জানাযা ওঠে।

কত বড় নির্মম সত্য! তো তোমার স্ত্রীরূপে তোমার ঘরে আসা এইছোট্ট মেয়েটির যখমি দিলে তাসাল্লির মরহম তোমাকেই রাখতেহবে। একমাটি থেকে উপড়ে এনে আরেক মাটিতে রোপণ করাএকটি চারাগাছ থেকে দু’দিন পরেই ফল দাবী করা কতটানিষ্ঠুরতা! ফল পেতে হলে তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে। চারা গাছটিরপরিচর্যা করতে হবে, সকাল-সন্ধ্যা তার গোড়ায় পানি দিতে হবে।ধীরে ধীরে শিকড় যখন মাটিতে বসবে এবং মাটি থেকে রস সংগ্রহকরার উপযুক্ত হবে, তখন তোমাকে ফল চাইতে হবে না; সজীববৃক্ষ নিজে থেকেই ফল দিতে শুরু করবে।

কত আফসোসের বিষয়, দাম্পত্য জীবনের শুরুতে যত আদেশ-উপদেশ সব ঐ ছোট্ট মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বর্ষিত হয়। প্রথমদিনেই তাকে শুনতে হয়, এখন থেকে তাকে স্বামীর মন জয়করতে হবে, শশুর-শাশুড়ি সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে, শশুর বাড়ীরসবার মন যুগিয়ে চলতে হবে। তার নিজের যেন কোন ‘মন’ নেই।সুতরাং সেটা জয় করারও কারো গরজ নেই।

তো মায়ের মন তোমাকেই রক্ষা করতে হবে, আবার স্ত্রীরমনোরঞ্জনও তোমাকেই করতে হবে। সবদিক তোমাকেই শামালদিয়ে চলতে হবে। কত কঠিন দায়িত্ব! অথচ না শিক্ষাঙ্গনে, নাগৃহপ্রাঙ্গণে, কোথাও এ সম্পর্কে শিক্ষার নূন্যতম কোন ব্যবস্থা নেই।সম্পূর্ণ অপ্রস্ত্তত অবস্থায় দু’টি অপরিপক্ব তরুণ-তরুণীকে যেনসংসার সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া! মেয়েটিও জানে না, আজ থেকে সেআর ছোট্ট মেয়েটি নেই। সে এখন স্ত্রী হয়ে একটি অপরিচিতমানুষের জীবনে প্রবেশ করছে, যার মা আছে, বাবা আছে,ভাইবোন আছে এবং তাদের প্রতি তার স্বামীর অনেক দায়-দায়িত্বআছে। সহানুভূতির সঙ্গে কোমলাতার সঙ্গে এই দায়িত্ববোধ কেউতার মধ্যে জাগ্রত করে দেয়নি। এ দোষ কার!

তো আমার প্রিয় ছাত্রটিকে বলেছিলাম, কথা দ্বারা আচরণ দ্বারাতোমার মাকে তুমি বোঝাবে, মা, আমি আপনারই ছিলাম, আছিএবং থাকবো। স্ত্রী হলো আমার জীবনের নতুন প্রয়োজন; আপনিআমার প্রাণ, আপনার সঙ্গে আমার নাড়ির টান।

অন্যদিকে স্ত্রীকে বোঝাতে হবে, এই সংসার সমুদ্রে তুমি একা নও;আমি তোমার পাশে আছি। নতুন জীবনে চলার পথে আমারওঅনেক কষ্ট হবে, তোমারও অনেক কষ্ট হবে। তবে সান্ত্বনা এই যে,তুমিও একা নও, আমিও একা নই। আমার পাশে তুমি আছো,তোমার পাশে আমি আছি। আমার কষ্টের সান্ত্বনা তুমি, তোমারকষ্টের সান্ত্বনা আমি। আমরা পরস্পরের কষ্ট হয়ত দূর করতেপারবো না, তবে অনুভব করতে পারবো এবং হয়ত কিছুটা লাঘবকরতে পারবো।

আল্লাহর কসম, এমন কোন নারিহৃদয় নেই যা এমন কোমলসান্ত্বনায় বিগলিত হবে না।

তোমার স্ত্রীকে তুমি এভাবে বলবে, আমাদের জীবন তো আলাদাছিলো। আমরা তো একে অপরকে চিনতামও না। আল্লাহআমাদের কেন একত্র করেছেন জানো?! একা একা জান্নাতেযাওয়া কঠিন। আল্লাহ আমাদের একত্র করেছেন একসঙ্গেজান্নাতের পথে চলার জন্য। আমি যদি পিছিয়ে পড়ি, তুমি আমাকেটেনে নিয়ে যাবে; তুমি যদি পিছিয়ে পড়ো, আমি তোমাকে টেনেনিয়ে যাবো। তুমি সতর্ক থাকবে, আমার দ্বারা যেন কারো হক নষ্টনা হয়; আমিও সতর্ক থাকবো, তোমার দ্বারা যেন কারো প্রতি যুলুমনা হয়।

প্রিয় ছাত্রটিকে আমি আরো বললাম, স্ত্রীকে বোঝানোর জন্য তারসন্তানকে সামনে আনতে হবে। অর্থাৎ তুমি তাকে বলবে, দেখো,জীবন কত গতিশীল! সবকিছু কত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে! দু’দিনআগে আমরা শুধু যুবক-যুবতী ছিলাম, আজ হয়ে গেছি স্বামী-স্ত্রী।দু’দিন পরেই হয়ে যাবো মা-বাবা। আমি বাবা, তুমি মা! আল্লাহরকাছে একজন মায়ের মর্যাদা কত! তোমার কদমের নীচে হবেতোমার সন্তানের জান্নাত! যেমন আমার মায়ের কদমের নীচেআমার জান্নাত। তো তোমার সন্তান কেমন হলে তুমি খুশী হবে?আমাকেও আমার মায়ের ঐরকম সন্তান হতে তুমি সাহায্য করো।আমি যদি ভুল করি, মায়ের কোন হক নষ্ট করি, মায়ের সামনে‘উফ’ করি, তুমি আমাকে সাবধান করো, আমাকে সংশোধনকরো। তাহলে ইনশাআল্লাহ তোমার সন্তানও তুমি যেমন চাওতেমন হবে।

প্রয়োজন হলে স্ত্রীকে মা-বাবার সামনে তিরস্কার করবে, তবে ঘরেএসে একটু আদর, একটু সোহাগ করে বোঝাতে হবে, কেন তুমিএটা করেছো?! বোঝানোর এই তরযগুলো শিখতে হবে, আর এটাদু’একদিনের বিষয় নয়, সারা জীবনের বিষয়। কিন্তু আমরা ক’জনএভাবে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করি?! হয় মাতৃভক্তিতে স্ত্রীরপ্রতি অবিচার করি, না হয়, স্ত্রীর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে মা-বাবারদিলে আঘাত দেই, আর দুনিয়া-আখেরাত বরবাদ হয়। আমারএকটা কথা মনে রেখো, মায়ের পক্ষ নিয়ে স্ত্রীর প্রতি অবিচার করামূলত মায়ের প্রতি যুলুম, তদ্রূপ স্ত্রীর পক্ষ নিয়ে মায়ের হক নষ্টকরা আসলে স্ত্রীর প্রতি যুলুম। আমার একথার উৎস হলো,

أنصر أخاك ظالما أو مظلوما

অবশ্য সবকিছু হতে হবে হিকমত ও প্রজ্ঞার সঙ্গে।

একটি ঘটনা তোমাকে বলি, তোমার মত আলিমে দ্বীন নয়,সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ আমাকে বলেছেন, একবারতার মা তাকে বললেন, তোর বউ আজ তোর এত আপন হয়েগেলো কীভাবে!

আমি বললাম, দেখো মা, তোমাকে আমি মা বলি; এই ‘মা’ডাকটুকু পাওয়ার জন্য তোমাকে কত কষ্ট করতে হয়েছে! অথচ‘পরের বাড়ীর মেয়েটি’র মুখ থেকে তুমি বিনা কষ্টে ‘মা’ ডাকশুনতে পাও! তোমাকে যে মা বলে ডাকে সে আমার আপন হবে নাকেন মা?

আরেকটা ঘটনা, এক মা তার মেয়ের শাশুড়ী সম্পর্কে বললেন,মানুষ না, মেয়েটাকে আনতে পাঠালাম, দু’টো পিঠে বানিয়েখাওয়াবো, দিলো না, ফেরত পাঠিয়ে দিলো!

দু’দিন আগে তিনিও একই কাজ করেছিলেন, ছেলের বউকে নিতেএসেছিলো মায়ের বাড়ী থেকে। তিনি বললেন, দু’দিন পরে আমারমেয়েরা আসবে এখন তুমি গেলে কীভাবে চলবে!

ভদ্রমহিলাকে বললাম, আপনার কাজটা কি ঠিক হয়েছিলো?আপনাকে কষ্ট দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়, সতর্ক করা উদ্দেশ্য।আল্লাহর কাছে যদি আটকা পড়েন তখন তো আপনিই বলবেন,তুমি তো হাদীছ-কোরআন পড়েছো, আমাকে সতর্ক করোনি কেন?

মোটকথা, মেয়েদেরকে তারবিয়াত করতে হবে যাতে তারা আদর্শস্ত্রী, আদর্শ মা এবং আদর্শ শাশুড়ীরূপে আদর্শ জীবন যাপন করতেপারে। পুরুষ হচ্ছে কাওয়াম ও পরিচালক। সুতরাং তারবিয়াত ওপরিচালনা করা পুরুষেরই দায়িত্ব। স্ত্রী, মা ও শাশুড়ী, জীবনের এইতিনটি গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন ধাপের জন্য ঘরে ঘরে আমরা যদিআমাদের মেয়েদের গড়ে তুলতে পারি, আদেশ দ্বারা, উপদেশ,সর্বোপরি নিজেদের আচরণ দ্বারা তাহলেই সংসার হতে পারেসুখের, শান্তির।

প্রিয় ছাত্রটিকে আরেকটি কথা বললাম, তোমার স্ত্রীর কোন আচরণতোমার অপছন্দ হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথমে তোমাকে ভাবতেহবে, তোমার সব আচরণ কি সুন্দর, তোমার স্ত্রীর পছন্দের?তাছাড়া তোমার স্ত্রীর ভালো দিক কি কিছু নেই। সেই ভালোদিকগুলোর জন্য শোকর করো, আর যা তোমার কাছে মন্দ লাগেতার উপর ছবর করো। আর যদি সংশোধন করতে চাও তাহলেভালো দিকগুলোর প্রশংসা করো, তারপর কোমল ভাষায় বলো,তোমার এই বিষয়টা যদি না থাকতো তাহলে তুমি আরো অনেকভালো হতে। তবে আল্লাহর পেয়ারা হাবীব ছাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামের সেই প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ মনে রাখতে হবে, একটুবাঁকা থাকবেই, এই বক্রতা, সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে নায,আন্দায, মান, অভিমান, লাস্যতা, এই বক্রতা নারীর সৌন্দর্য,নারীর শক্তি। এটাকে সেভাবেই গ্রহণ করে তার সঙ্গে জীবন যাপনকরতে হবে, পূর্ণ সোজা করতে চাইলে ভেঙ্গে যাবে, আর সৌন্দর্যনষ্ট হয়ে যাবে।

সত্যি সত্যি যদি তোমার স্ত্রীর গুরুতর কোন ত্রুটি থাকে তবে সেটাসংশোধনের দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্যই তোমার। তবে সেক্ষেত্রেওসংশোধনের জন্য অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে দিনের পর দিন চেষ্টা করেযেতে হবে। ধমক দিয়ে, জোর খাটিয়ে সংশোধন করা যায় না,ঘরে অশান্তি আনা যায়, ঘর ভাঙ্গা যায়, আর সন্তানদের জীবনেবিপর্যয় আনা যায়।

ইসলামপুরে আমার আববার দোকানের অপর দিকে একভদ্রলোকের দোকান ছিলো। অবস্থা ছিলো এই যে, দোকানে বসেইমদ খেতো। আববা তাকে দাওয়াত দিলেন, আর সে খুব দুর্ব্যবহারকরলো, কিন্তু আববা ধৈর্যের সঙ্গে দাওয়াত চালিয়ে গেলেন।দু’বছর পর তিনি মসজিদমুখী হলেন এবং এমন মুবাল্লিগ হলেনযে, বউকে তালাক দেবেন। কারণ সে দ্বীনের উপর আসছে না।

আববা তাকে এভাবে বুঝালেন, ‘আমার সঙ্গে আপনার আচরণ কিমনে আছে? আমি যদি ধৈর্যহারা হয়ে আপনাকে ত্যাগ করতাম!এই পুরো কথাটা যেহেনে রেখে স্ত্রীকে তালিম করতে থাকেন।ছবর করেন, ছবর করলে আমার প্রতি আপনার যুলুম আল্লাহ মাফকরবেন। আল্লাহ যদি প্রশ্ন করেন আমার বান্দা তোমাকে আমারঘরের দিকে ডেকেছে, তুমি তার প্রতি যুলুম করেছো কেন? তখনআপনি বলতে পারবেন, হে আল্লাহ, আমিও আপনার বান্দীরপিছনে ছবরের সঙ্গে মেহনত করেছি।’

সেই লোকের স্ত্রী কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরদানশীন হয়েছিলো।অথচ জোশের তোড়ে লোকটা তো ঘরই ভেঙ্গে ফেলছিলো।

আসলে দোষ আমাদের। আমরা তারবিয়াত করার তরীকাশিখিনি। বোঝানোর তরয আয়ত্ত্ব করিনি।

প্রিয় ছাত্রটিকে আরো অনেক কথা বলেছিলাম, প্রায় দু’ঘণ্টা সময়তার জন্য ব্যয় করেছিলাম। সবকথা এখন মনেও নেই।

তবে একটা কথা তাকে বলা হয়নি, এখন তোমাদের মজলিসেবলি, স্ত্রীর সঙ্গে আচরণ কেমন হবে, এ সম্পর্কে একজনকে যাবলতে শুনেছিলাম, তা ছিল খুবই মর্মান্তিক। তিনি বলেছিলেন, ‘মেয়েলোক যেন তোমার মাথায় চড়ে না বসে, তাই প্রথম দিনথেকেই তাকে শাসনের মধ্যে রাখবা। পূর্ণ ইতা‘আত ও আনুগত্যআদায় করে নিবা, গোরবা কুশতান দর শবে আওয়াল।’

এ প্রবাদ এমনই বিশ্ববিশ্রুত যে, আমাদের নিরীহ বাংলাভাষায়ওবলে, ‘বাসর রাতেই বেড়াল মারতে হবে’। কিন্তু জীবনেরসর্বক্ষেত্রের মত এক্ষেত্রেও আমাদের অনুসরণীয় হলো সুন্নাতেরাসুল, আর তিনি ইরশাদ করেছেন,

خيركم خيركم لأهله وأنا خيركم لأهلي

তো জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শরীয়তের সীমারেখায় থেকেস্ত্রীর সঙ্গে এমন আচরণই আমাকে করতে হবে, যাতে সে মনেকরে, আমি সর্বোত্তম স্বামী, আমার মতো উত্তম স্বামী হয় না, হতেপারে না।

স্ত্রীগণের সঙ্গে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ কীছিলো তা জানতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে। স্বামীর খেদমতকরার মাধ্যমে স্ত্রী অনেক আজর ও ছাওয়াবের অধিকারিণী হতেপারে, এটা আলাদা কথা। তবে আমাকে মনে রাখতে হবে যে,এটা স্ত্রীর মহত্ত্ব, স্বামীর অধিকার নয়। তারা যদি কখনো মায়েরবাড়ী যেতে চায়, আমরা প্রশ্ন করি, ‘আমার খাওয়া-দাওয়ার কীহবে?’ অথচ এটা তার বিবেচনার বিষয় হতে পারে, আমার প্রশ্নকরার বিষয় নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সামান্য কথা বলেই মজলিস শেষকরছি। সহবাস দাম্পত্য জীবনের একটি অপরিহার্য সত্য। এবিষয়ে আলোচনাকে হায়া-শরমের খেলাফ মনে করা হয়। ফলেবিষয়টি অজ্ঞতার মধ্যে থেকে যায়। একারণে এমনকি অনেকসময় দাম্পত্য জীবন বিষাক্ত হয়ে পড়ে।

স্ত্রী তোমার সারা জীবনের সম্পদ এবং সেরা সম্পদ।

متاع মানে সম্পত্তি নয়, ভোগের বস্ত্ত নয় متاع মানে সম্পদ,ঐশ্বর্য। বিষয়টি বুঝতে না পেরে আধুনিক বুদ্ধিজীবীরা হাদীছেরসমালোচনা করেন। আমরা হাদীছটির তরজমা ও ব্যাখ্যা এমনখন্ডিতভাবে করি যে, তারাও সুযোগ পেয়ে যায়।

তো স্ত্রী তোমার সম্পত্তি নয়, স্ত্রী হলো তোমার জীবনের সর্বোত্তমসম্পদ, যা যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে তোমাকে রাখতে হবে এবংব্যবহার করতে হবে।

প্রথমেই বর্বর ও পাশবিকরূপে নিজেকে স্ত্রীর সামনে তুলে ধরাবিরাট মুর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়। স্ত্রী স্বামীর ভোগের পাত্রী নয়,বরং স্বামী-স্ত্রী হলো পরস্পরকে উপভোগ করার জন্য। যত দিনলাগে, দীর্ঘ সাধনা করে প্রথমে হৃদয় জয় করো, মনের দুয়ারখোলো, অন্তরের গভীরে প্রবেশ করো।

যিন্দেগীর এই কঠিন মারহালা সম্পর্কে কত কিছু যে বলার আছে,কত কিছু যে শেখার আছে! দেখি, যদি আবার কখনো সুযোগ হয়।

[দাম্পত্যজীবন সুখময় হওয়ার জন্য শুধু পুরুষের প্রচেষ্টা ওসচেতনতাই যথেষ্ট নয়, নারীরও সদিচ্ছা ও সচেতনতা অতিপ্রয়োজন।
এ বিষয়ে তারও আছে অনেক দায়িত্ব। কিন্তু নারীর তালীম-তরবিয়তের ভারও তো পুরুষেরই উপর। বিয়ের আগে পিতামাতাতার তরবিয়ত করবেন, বিয়ের পর স্বামী। দাম্পত্যজীবনে নারীরদায়িত্ব কী কী, সেই সকল দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে সচেতন করারপদ্ধতি কী এবং তার তালীম-তরবিয়ত কীভাবে করতে হবে-এটিআলাদা একটি বিষয়।

আল্লাহ করুন, কোনো মজলিসে আমরা যেন হুজুরের কাছ থেকেএ বিষয়েও বিস্তারিত দিক-নির্দেশনা লাভ করি।

আলকাউসার জানুয়ারী ২০১৩ সংখ্যা থেকে সংগৃহিত।

Pin It on Pinterest

Share This