ভবিষ্যতে গোনাহ না করার প্রতিজ্ঞা – হযরত মাওলানা মুফতি তকী উছমানী

আলহামদু লিল্লাহি নাহমাদুহূ ওয়া       নাস্তাঈনুহূ ওয়া নাস্তাগফিরুহ …. ওয়াছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ‘আলা আলিহী ওয়া আছহাবিহী ওয়া বারাকা ও সাল্লামা তাসলীমান কাছীরা, আম্মা বা‘দ।

পরিপূর্ণ তাওবার হাকীকত

ওলামায়ে উম্মাত ও ছূফিয়ায়ে মিল্লাত এ বিষয়ে একমত যে, ইছলাহে নাফস ও আত্মার সংশোধনের প্রথম ধাপ হচ্ছে পরিপূর্ণ তাওবা করা। সুতরাং এটা আমাদের খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে যে, পরিপূর্ণ তাওবা কাকে বলে? কখন বলা যাবে যে, আমি ‘মুকাম্মাল’ তাওবা করেছি; আমার তাওবা এখন পূর্ণতা লাভ করেছে? সামনের মালফূযে হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহ) এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেই বলছেন

‘তাওবা করার সময় যদি ভবিষ্যতে গোনাহটি না করার প্রতিজ্ঞা না থাকে তাহলে অন্তত গোনাহ করার ইচ্ছাও যেন না থাকে, বরং গোনাহ করার ইচ্ছা থেকে তার যেহেন যেন খালি থাকে। এভাবে ‘যেহেনখালি’ অবস্থায় যদি তাওবা করে, আর পিছনের গোনাহের উপর লজ্জা ও অনুশোচনা থাকে তাহলে তার তাওবা ছহীহ হয়ে যাবে। (আনফাসে ঈসা)

মালফূযের ব্যাখ্যা

এই মালফূযে হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহ) বিরাট গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বয়ান করেছেন, যাতে আমাদের মত দুর্বল মনের মানুষের জন্য বড় আশ্বাস ও সান্ত্বনা রয়েছে। বস্তুত যিনি হাকীমুল উম্মত বা উম্মতের রূহানী চিকিৎসক হবেন, তাঁর প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও অন্তর্দৃষ্টি এমনই গভীর হওয়ার কথা। আল্লাহ তাআলা তাঁকে পুরা উম্মতের পক্ষ হতে উত্তম থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন, আমীন।

ছূফিয়ায়ে কেরাম ও ওলামায়ে উম্মত সকলেই একমত যে, তাওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত। প্রথমত যে গোনাহ হয়ে গেছে তার জন্য অন্তর থেকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া। দ্বিতীয়ত সঙ্গে সঙ্গে ঐ গোনাহ তরক করা। তৃতীয়ত এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা যে, ভবিষ্যতে কখনো এ গোনাহ করবো না। এ তিনটি বিষয় একত্র হলে তাওবা কামিল ও পূর্ণ হয়ে যায়।

প্রথম দু’টি বিষয় তেমন কঠিন নয়। অর্থাৎ শরমিন্দা হওয়া এবং গোনাহ তরক করা, এটা সহজেই হয়ে যায়। কিন্তু তৃতীয় শর্তটি সম্পর্কে মনে     দ্বিধা-সন্দেহ থাকে যে, ভবিষ্যতে গোনাহ না করার এই যে আমার প্রতিজ্ঞা, এটা সঠিক প্রতিজ্ঞা হলো কি না? এই     দ্বিধা-সন্দেহ অবশ্যই চিন্তার বিষয়। কারণ ভবিষ্যতে গোনাহ না করার প্রতিজ্ঞা হচ্ছে কামিল তাওবার জন্য লাযেমী শর্ত। তো তাতেই যখন সন্দেহ এসে গেলো তখন তাওবাও সন্দেহযুক্ত হয়ে গেলো। আর সন্দেহযুক্ত তাওবা দ্বারা গোনাহ মাফ হবে কীভাবে? আল্লাহ তো মাগফিরাতের ওয়াদা করেছেন খঁটি, বিশুদ্ধ, পরিপূর্ণ ও কামিল তাওবার উপর।

মোটকথা তাওবার এই তৃতীয় শর্তটি সম্পর্কে সাধারণত মানুষের মনে এধরনের দ্বিধা-সন্দেহ আসে।

তো হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহ) এ বিষয়ে আমাদের আশ্বস্ত করে বলছেন যে, প্রথমে তুমি চেষ্টা করো, ভবিষ্যতে গোনাহ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করার। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তাওবার পরিপূর্ণতার আরো ন্যূনতম স্তরও রয়েছে, আর তা এই যে, ভবিষ্যতে আবার গোনাহ করার ইচ্ছা ও চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। অর্থাৎ এমন ইচ্ছা ও সঙ্কল্প করো না যে, সুযোগ পেলে আবার তুমি এ গোনাহ করবে। ব্যস, এতটুকু হলেই তোমার তাওবা কামিল, পরিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে এবং দয়াময় আল্লাহ তোমার গোনাহ মাফ করে দেবেন।

রাত্রে শোয়ার আগে তাওবা করো

আমাদের হযরত বাবা নাজমে আহসান ছাহেব (রহ) তাওবার প্রতি খুব জোর দিতেন। একদিন আমি তাঁর দরবারে হাযির হলাম। এক যুবক কোন প্রয়োজনে আগে থেকেই সেখানে উপসি’ত ছিলো। তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দ্বীনদারির কোন ছাপ-চিহ্ন নেই। হযরত বাবা ছাহেবের তরীকা এই ছিলো যে, যে কেউ যে কোন প্রয়োজনে তাঁর কাছে আসুক, তিনি দ্বীনের কোন না কোন কথা, কোন না কোন উপদেশ ও নছীহত তার কানে দিয়ে দিতেন। তো ঐ যুবককেও বিদায়কালে তিনি বললেন

বাবা, যেতে যেতে একটা কথা শুনে যাও। মানুষ দ্বীনের উপর আমল করাকে খুব কঠিন মনে করে। না ভাই, কঠিন কিছু নয়। তুমি শুধু রাত্রে শোয়ার আগে সামান্য সময় বসে আল্লাহর কাছে তাওবা করে নিয়ো।

ঐ যুবকের তো না ছিলো নামায-রোযা, না অন্য কোন আমল- ইবাদত। কিন্তু বাবা হযরত না তাকে নামায-রোযার ওয়ায করলেন, না অন্য কোন আমল- ইবাদতের তাকিদ করলেন। কিছুই করলেন না, শুধু তাওবা করার কথাটি তার কানে দিয়ে দিলেন।

আল্লাহওয়ালাদের মানুষ কাছে আনার কৌশল

বিষয়টি কেমন হলো! এ দরবারের ‘আদা ও আন্দায’ এবং রীতি ও কর্মভঙ্গি সম্পর্কে অনবগত যারা তাদের মনে তো বিরাট প্রশ্ন দেখা দেবে যে, তিনি তো যুবকটিকে খোলা ছুট্টি দিয়ে দিলেন যে, তোমার চলা তুমি চলতে থাকো, যা ইচ্ছা করতে থাকো; ব্যস, শুধু রাত্রে একটু বসে তাওবা করে নিয়ো। এরকম খোলা ছাড়-ছুট্টি দেয়া কীভাবে জায়েয হলো?!

আসল কথা এই যে, এটা হলো আল্লাহওয়ালাদের মানুষকে নিকটে আনার, কাছে টানার বিশেষ কর্মকৌশল। আল্লাহ তা‘আলা তার খাছ বান্দাদেরকে দ্বীনের এমন সমঝ ও প্রজ্ঞা দান করেন যে, তারা বুঝতে পারেন, কাকে কীভাবে হিদায়াতের দিকে ডাকতে হয় এবং কাকে কোন্‌ কৌশলে দ্বীনের পথে আনতে হয়। দেখুন, ঐ যুবককে যদি বলা হতো যে, পাঁচওয়াক্ত নামায পড়ো, এই সব বেহুদা লেবাস ছেড়ে শরীয়তি লেবাস পরো, দাড়ি লম্বা করো তাহলে তো সে ঘাবড়ে যেতো, ভড়কে যেতো, আর কখনো এদিকে আসতো না। এজন্য হযরত তাকে শুধু এতটুকু কথা বলে দিলেন যে, রাত্রে নির্জনে বসে আল্লাহর কাছে একটু তাওবা করে নিয়ো।

আর জানা কথা যে, এমন সোজা সরল তাওবায় কার আপত্তি হবে?! কিন্তু ঐ যুবক যদি হযরতের নছীহতের উপর আমল শুরু করে; অর্থাৎ প্রতিদিন রাতে আল্লাহর কাছে তাওবা করা শুরু করে তাহলে তো আল্লাহর সঙ্গে তার ছিন্ন সম্পর্ক জোড়া লেগে যাবে। এত দিন সে আল্লাহর কাছ থেকে একেবারেই দূরে ছিলো, এখন সে একটু একটু করে আল্লাহর কাছে এসে যাবে। তাওবা হলো আল্লাহর বান্দার আল্লাহর কাছে ফিরে আসার দরজা। এত দিন সে গাফলাতের মধ্যে ছিলো, আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন ছিলো। তার দিলে কখনো ভুলেও হয়ত আল্লাহ-রাসূলের চিন্তা-খেয়াল আসতো না। কিন্তু এখন দীর্ঘ দিনের গাফলত দূর হওয়ার সুযোগ হয়ে গেলো। কারণ যখন সে তাওবা করবে তখন মুহূর্তের জন্য হলেও তার মনে আল্লাহর কথা চিন্তা হবে, আল্লাহর সঙ্গে একটা সম্পর্ক অনুভব করবে। এভাবে প্রতিদিন যখন সে তাওবার আমল করবে তখন অবশ্যই আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক মযবূত হতে থাকবে। এটা তো কিছুতেই সম্ভব না যে, এর পর আল্লাহ তাকে কাছে টেনে নেবেন না; অবশ্যই কাছে টেনে নেবেন। কেননা কোরআন শরীফে আল্লাহ তা‘আলার ইরশাদ হলো-

الله يجتبي إليه من يشـآء و يهدي إليه من ينيب

সাধারণভাবে আয়াতটির এ তরজমা করা হয় যে. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা করেন তাকে নিজের দিকে টেনে নেন এবং নির্বাচিত করেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যাকে হিদায়াত দান করার এবং নৈকট্য দান করার ইচ্ছা করেন তাকে নিজের দিকে টেনে নেন।

তবে আমাদের হযরত ডা. আব্দুল হাই ছাহেব (রহ) বলতেন, যারা আরবী জানে তাদের জিজ্ঞাসা করে দেখো যে, এ আয়াতের এমন তরজমাও হতে পারে, ‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তিকে নিজের দিকে টেনে নেন যে চায় যে, আমাকে টেনে নেয়া হোক এবং তিনি ঐ ব্যক্তিকে তাঁর দিকে পথপ্রদর্শন করেন যে তাঁর দিকে রুজু করে এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক জুড়ে নেয়।

(কারণ     يشآء           এর যামীর যেমন আল্লাহ লফযটির দিকে ফিরতে পারে, তেমনি তা ‘মান’-এর দিকেও ফিরতে পারে।)

অবশ্যই আল্লাহ কাছে টেনে নেবেন

আল্লাহর কালামে রাহমাত ও মাগফিরাতের যত আয়াত রয়েছে সেগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, কোন বান্দা যখন, হোক না সামান্য সময়ের জন্য, আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে সম্পর্ক জুড়ে নেয় এবং এভাবে নিবেদন করে যে, হে আল্লাহ, আমি তাওবা করছি; সুতরাং আপনি আমাকে মাফ করুন এবং আমাকে আপনার দিকে টেনে নিন। তো এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা নিজের দিকে অবশ্যই টেনে নেবেন।

মোটকথা বান্দার কাজ হলো, একটু আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং কাকুতি-মিনতি করে আল্লাহর কাছে এভাবে চাওয়া যে, হে আল্লাহ, আপনি ছাড়া কে আমাকে পানাহ দেবে?! অবুঝ বান্দা বলে আপনার রহমত থেকে আমি কি মাহরূম হবো হে আল্লাহ?! আমাকে আপনার কাছে টেনে নিন হে আল্লাহ! আপনার রহমতের কোলে আমাকে আশ্রয় দিন হে আল্লাহ! আমি তো জানি হে আল্লাহ, নৈকট্য লাভের গুণ ও যোগ্যতা আমার মধ্যে নেই, কিন্তু হে আল্লাহ সেগুলো আমার মধ্যে পয়দা করে দেয়ার কুদরত তো আপনার আছে! সুতরাং হে আল্লাহ, আপনার কাছে আসার এবং আপনার কাছে থাকার যাবতীয় গুণ ও যোগ্যতা আপনি আমার মধ্যে পয়দা করে দিন। এভাবে আল্লাহর দরবারে চাইতে থাকো।

এই যে চাওয়া ও তাওবা করা, এর মাধ্যমে একবার যখন আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক জুড়ে গেলো তখন ব্যস, জীবনে পরিবর্তনের সূচনা হয়ে গেলো।

মোটকথা এটা ছিলো আমাদের হযরত বাবা নাজমে আহসান ছাহেবের কৌশল ও প্রজ্ঞা যে, এমন যুবক যে গাফলাতের মধ্যে ডুবে আছে, যার দিলে না আছে আল্লাহ-রাসূলের খেয়াল, না আছে নামায-রোযা, দ্বীনদারি ও আখেরাতের চিন্তা, প্রথমেই তার উপর তিনি কঠিন বোঝা চাপিয়ে দেননি, বরং শুধু বলে দিয়েছেন যে, তুমি ভাই রাত্রে একটু সময় বসে আল্লাহর কাছে তাওবা করে নিয়ো।

আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে বলা যায়, ঐ যুবক যদি হযরতের নছীহতের উপর আমল করে থাকে তাহলে এটা কিছুতেই সম্ভব নয় যে, আল্লাহর কাছে সে ফিরে আসবে না এবং ধীরে ধীরে দ্বীনের উপর আমল শুরু করবে না।

মোটকথা আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া বান্দাদের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দেয়ার জন্য বুযুর্গানে দ্বীন বিভিন্ন প্রজ্ঞাপূর্ণ পথ ও পন্থা গ্রহণ করে থাকেন, যেমন হযরত বাবা নাজমে আহসান ছাহেব এই যুবকটির ক্ষেত্রে করেছেন যে, তার কানে শুধু তাওবার কথা ঢেলে দিলেন, আর সে চলে গেলো।

প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে আমার দিলের খটকা

হযরত বাবা নাজমে আহসান ছাহেব (রহ)-এর খেদমতে আমি আরয করেছিলাম যে, হযরত! তাওবা সম্পর্কে আমার দিলে এই খটকা আসে যে, তাওবা তো আমি করে নিলাম, কিন্তু কে জানে আমার তাওবা ছহীহ হলো কি না?! কারণ এটা বুঝতে পারি না যে, গোনাহ তরক করার যে প্রতিজ্ঞা করেছি তা সুদৃঢ় হয়েছে কি না! আল্লাহর দরবারে এই নিবেদন তো পেশ করে দিয়েছি যে, হে আল্লাহ, আমার গোনাহ হয়ে গেছে, এখন আমি মাফ চাই। আপনি আমাকে মাফ করে দিন। তারপর সাময়িকভাবে ঐ গোনাহ ছেড়েও দিয়েছি, কিন্তু ভবিষ্যতে কখনো ঐ গোনাহের কাছেও যাবো না, এই যে প্রতিজ্ঞা, এটা দৃঢ় হয়েছে কি না, এ বিষয়ে দিলে ইতমিনান আসে না। অথচ এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা হচ্ছে তাওবার পূর্ণতা ও কবুলিয়াতের তৃতীয় শর্ত। এই শর্তের উপস্থিতি যখন সন্দেহযুক্ত হয়ে গেলো তখন তো তাওবা ছহীহ হলো কি না তাও সন্দেহযুক্ত হয়ে গেলো।

আমার কথা শুনে হযরত বাবা নাজমে আহসান ছাহেব (রহ) বললেন, আরে ভাই! তুমি তো দেখছি দিলে দিলে ‘প্রতিজ্ঞা’-এর বড় লম্বা-চওড়া অর্থ ধরে নিয়েছো। প্রতিজ্ঞা মানে তো শুধু এই যে, নিজের পক্ষ হতে এরাদা করে নাও যে, এ গোনাহ আমি আর করবো না। তারপরে যদি দিলের মধ্যে ওয়াসওয়াসা ও খটকা আসে যে, কে জানে এই প্রতিজ্ঞার উপর অবিচল থাকতে পারবো কি না? তো এটা প্রতিজ্ঞার বিশুদ্ধতার বিপরীত নয়। উদাহরণস্বরূপ এই প্রতিজ্ঞা করলে যে, ভবিষ্যতে আর মিথ্যা বলবো না, গীবত করবো না, চোখের গোনাহ করবো না, ইত্যাদি। এখন এই প্রতিজ্ঞার পর দিলে ওয়াসওয়াসা আসছে যে, জানি না এ প্রতিজ্ঞার উপর অটল থাকতে পারবো কি না। তো এমন ওয়াসওয়াসা আসলে আসতে দাও। তোমার প্রতিজ্ঞার তাতে ক্ষতি নেই। তাওবার জন্য জরুরি যে প্রতিজ্ঞা, সেটা পূর্ণ হয়ে গেছে।

আল্লাহর কাছে অবিচলতা চাও

নিজের পক্ষ হতে ভবিষ্যতে গোনাহ না করার প্রতিজ্ঞা করার পর, দিলের ওয়াসওয়াসাকে আর গুরুত্ব দিয়ো না, বরং আল্লাহর কাছে এভাবে দু‘আ করো, হে আল্লাহ! প্রতিজ্ঞা করার ছিলো, তা আমি করেছি, কিন্তু আমার জানা নেই, প্রতিজ্ঞার উপর কীভাবে অবিচল থাকবো! আমি তো দুর্বল। শয়তান ও নফসের উপর আমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনার তো কুদরত আছে হে আল্লাহ! সুতরাং আপনি আমার প্রতিজ্ঞা বহাল রাখুন এবং অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন। ব্যস, তাওবা পূর্ণ হয়ে গেলো। এখন বান্দার দিলে এই ইতমিনান থাকা উচিত যে, আল্লাহ আমার তাওবা কবুল করেছেন। কারণ প্রতিজ্ঞার অর্থ হলো নিজের পক্ষ হতে ইচ্ছা ও এরাদা করে ফেলা। এখন তার উপর কত দূর অবিচল থাকতে পারবো, বা পারবো না, এ ভবিষ্যদ্বাণী তো কেউ করতে পারে না। এটা তো কারো সাধ্যের মধ্যে নেই। আর যেহেতু এটা মানুষের সাধ্যের বাইরে সেহেতু মানুষের কাছে আল্লাহর পক্ষ হতে এটার দাবীও নেই। মানুষের দায়দায়িত্ব তো তার সাধ্যের ভিতরের বিষয়ে, বাইরের বিষয়ে নয়। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি তো জানেন, মানুষের সাধ্য কতটুকু এবং কোথায় কোথায় তার দুর্বলতা!

মোটকথা হযরত বাবা নাজমে আহসান ছাহেব (রহ) এমন আশ্চর্যরকমের আশ্বাসপূর্ণ কথা বললেন যে, আলহামদু লিল্লাহ দিলের সমস্ত খটকা-ওয়াসওয়াসা দূর হয়ে গেলো এবং পূর্ণ ইতমিনান ও সান্ত্বনা হয়ে গেলো।

গোনাহ করার সঙ্কল্প যেন না হয়

পরে একসময় হযরত থানবী (রহ)-এর এই মালফূযটি দেখতে পেলাম, যাতে হুবহু এই কথাগুলোই রয়েছে। দেখুন

‘তাওবা করার সময় যদি ভবিষ্যতে গোনাহ না করার প্রতিজ্ঞা না থাকে, তবে গোনাহ করার প্রতিজ্ঞাও যেন না থাকে, বরং তার চিন্তা যেন প্রতিজ্ঞা থেকে মুক্ত থাকে। যদি এভাবে চিন্তামুক্ত অবস্থায় লজ্জা ও অনুতাপের সঙ্গে তাওবা করা হয় তাহলে তাওবা ছহী হয়ে যাবে।’

অর্থাৎ তাওবার সর্বোচ্চ স্তর তো এই প্রতিজ্ঞা থাকা যে, ভবিষ্যতে কখনো কোনভাবেই এ গোনাহ আর করবো না। কিন্তু যদি কোন কারণে এ প্রতিজ্ঞা চিন্তায় উপস্থিত না থাকে, তাহলে কমপক্ষে ভবিষ্যতে এই গোনাহ করার ইচ্ছা যেন পোষণ না করা হয়, বরং গোনাহ করার প্রতিজ্ঞা থেকে যেন যেহেনটা মুক্ত থাকে। অর্থাৎ গোনাহটি ভবিষ্যতে না করার চিন্তা যেমন থাকবে না তেমনি করার চিন্তাও থাকবে না। তার মন্তদিল যদি উভয় প্রতিজ্ঞা ও সঙ্কল্প থেকে মুক্ত থাকে তাহলেও তাওবা ছহীহ হয়ে যাবে।

কেন? কারণ-

লজ্জা ও অনুতাপই আসল তাওবা

হযরত থানবী (রহ) হলেন হাকীমুল উম্মত। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে শরীয়তের পূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন। তিনি নিজের পক্ষ হতে, নিজের চিন্তায় কোন কথা বলতেন না; যা বলতেন, শরীয়তের দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতেই বলতেন। তাঁর প্রতিটি বক্তব্যের পিছনে রয়েছে শরীয়তের মযবূত দলীল। এখানেও তিনি দলীলরূপে হুযূর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদীছটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন্ত الندم توبـة

‘অনুতাপই তাওবা’।

অর্থাৎ তাওবার মূল উপাদান, যা দ্বারা তাওবা অসি-ত্বে এসে যায় সেটা হচ্ছে গোনাহ করার পর ভিতরে লজ্জা ও অনুতাপ পয়দা হওয়া এবং আল্লাহর সামনে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া। আর এটা তো পরিষ্কার যে, গোনাহের কারণে যে ব্যক্তি লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে তার দিলে অবশ্যই এ অনুভূতিও থাকবে যে, হে আল্লাহ! আমি চাই না যে, এ গোনাহ আমার দ্বারা দ্বিতীয়বার হোক। ব্যস, এই লজ্জা ও অনুতাপের কারণেই তার তাওবা ছহীহ হয়ে যাবে। আর তাওবা ছহীহ হয়ে গেলে ইনশাআল্লাহ গোনাহও মাফ হয়ে যাবে। এখন আর এ ওয়াসওয়াসায় পড়ো না যে, আমার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হয়েছে কি না?! দিলের মধ্যে এ ওয়াসওয়াসা শয়তান পয়দা করে, যাতে বান্দা তাওবা করতে না পারে, তারপর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়। সুতরাং শয়তানকে সুযোগ দিয়ো না।

তাওবাপরবর্তী দু‘আ

তবে প্রত্যেক তাওবার পর এ দু‘আ অবশ্যই করবে যে, হে আল্লাহ! তাওবা তো করেছি, কিন্তু আপনি তাওফীক না দিলে তো তাওবার উপর অবিচল থাকা সম্ভব না। সুতরাং হে আল্লাহ! রহম করে, দয়া করে আমাকে তাওবার উপর অবিচল রাখুন।

ধরো, এমন তাওবা করার পর এবং এমনভাবে দু‘আ করার পর আবার ভুল হয়ে গেলো, আবার পদস্খলন ঘটলো, তাহলে ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না এবং নিরাশ হয়ো না, বরং আবার তাওবা করো, আবার তাওবা করো এবং আবার তাওবা করো। যত বার ভুল হবে এবং গোনাহ হয়ে যাবে, ভয় নেই; লজ্জিত হও, অনুতপ্ত হও এবং তাওবা করো। কারণ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। যতক্ষণ মৃত্যুযন্ত্রণা ও সাকারাতুল মওত শুরু না হবে ততক্ষণ তাওবার দরজা খোলা হবে। সুতরাং যতবারই ভুল হবে, তুমি আল্লাহরই কাছে ফিরে আসবে, আল্লাহর রহমতের কাছেই পানাহ চাইবে।

তাওবার ভরসায় গোনাহ করা

শয়তান মানুষের বড় খবীছ দুশমন। শয়তানের চক্রান্তেরও কোন শেষ নেই। একবার সে চেষ্টা করে মানুষকে তাওবা থেকে দূরে রাখতে, আবার চেষ্টা করে তাওবার প্রতি অতিভরসার মাধ্যমে তাকে গোমরাহ করতে যে, গোনাহ করতে থাকো, চিন্তা কী, আল্লাহ তো গাফূরুর রাহীম! তাওবা করলেই মাফ করে দেবেন। তো শয়তানের প্রথম ধোকা থেকে যেমন সাবধান থাকতে হবে, তেমনি এই দ্বিতীয় ধোকাটি থেকেও সাবধান থাকতে হবে। এটা যেন কেউ মনে না করে যে, ব্যস, তাওবার দরজা যেহেতু খোলা সেহেতু গোনাহ করতে থাকো, আর তাওবা করতে থাকো। তাওবার ভরসায় গোনাহ করার আস্পর্ধা ও দুঃসাহস দেখানো, এটা ঠিক নয়, এটা খুব ভয়ঙ্কর গোমরাহী। এমন মানুষের উপর আল্লাহর নারাযি ও গযব নেমে আসে; এমনকি তার তাওবা করাই নছীব হয় না।

সঠিক বিষয় তো এই যে, নিজের দিক থেকে পুরাপুরি ইহতিমাম করবে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার, তারপরো যদি গোনাহ হয়ে যায় তখন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে নেবে। পরে তাওবা করে নেবো এ ভরসায় গোনাহ করা, এটা শয়তানের খুবই ভয়ঙ্কর চাল। এটা তো হাতের কাছে প্রতিষেধক আছে, এ ভরসায় বিষ পান করার মত হলো।

বিষয়টি বোঝানোর জন্য আমার আব্বাজান হযরত মুফতী মুহম্মদ শফী ছাহেব (রহ) তাঁর দেওবন্দি জীবনের একটি ঘটনা বলতেন। দেওবন্দে সাপ-বিচ্ছুর উপদ্রব ছিলো খুব। প্রতিদিনই মানুষ আক্রান্ত হতো। তাই স্বাভাবিক কারণেই সেখানে সাপ-বিচ্ছুর তদবীরেরও খুব প্রচলন ছিলো। অনেকেই তদবীর জানতো এবং ঝাড়ফুঁক দ্বারা রোগীর চিকিৎসা করতো। তদবীরে বিষ নেমে যেতো এবং রোগী ভালো হতো। আব্বাজানও বিচ্ছুর দংশনের তদবীর জানতেন। আক্রান্ত ব্যক্তিকে দম করামাত্র বিষ-ব্যথা চলে যেতো। তাঁর দম-তদবীরের এমনই শোহরত ছিলো যে, বহু দূরের বস্তি থেকেও মানুষ রোগী নিয়ে আসতো।

একবারের ঘটনা। তখন বিদ্যুৎ ছিলো না। আব্বাজান কুপির আলোতে লেখাপড়া করছিলেন। আম্মাজান ‘স্টোররূমে’ যাওয়ার জন্য একটু সময়ের জন্য কুপিটা চাইলেন। কিন্তু কর্মনিমগ্নতার কারণে আব্বাজান বললেন, সামান্য কাজ, কুপি ছাড়াই চলে যাও। আম্মাজান বললেন, যদি বিচ্ছু থাকে! আব্বাজান হেসে বললেন, ঘাবড়াও কেন, দম করে দেবো, ইনশাআল্লাহ ভালো হয়ে যাবে।

আল্লাহর কী ইচ্ছা, আম্মাজানের আশঙ্কাই সত্য হলো, বিচ্ছু দংশন করলো।

আব্বাজান বলেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেলাম এবং সেই পুরোনো আমল শুরু করলাম, যা দ্বারা এমন বহু রোগী আরোগ্য লাভ করেছে। কিন্তু আজ কোন কাজ হলো না। শেষ পর্যন্ত অন্যের চিকিৎসা নিতে হলো এবং বহু ভোগান্তি হলো।

আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছুই হয় না

এ ঘটনা শুনিয়ে আব্বাজান বলতেন, দেখো, আমল ও তদবীরের ভরসায় আমি বিচ্ছু থেকে সতর্ক হইনি, বরং ভেবেছি, দংশন যদি করেই তো কী হবে?! আমার কাছে তদবীরের চিকিৎসা তো আছেই! দম করবো, আর বিষ নেমে যাবে। কিন্তু কী হলো! বিষ কিছুতেই নামলো না! এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা প্রথমত এ শিক্ষা দান করলেন যে, দুনিয়াতে যত চিকিৎসা আছে, হোক অষুধি চিকিৎসা, কিংবা আমল-তদবীরের চিকিৎসা, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর হুকুম না হবে, কোন কাজ হবে না । তাই দেখা যায়, এক অষুধে এক রোগীর ফায়দা হয়, অন্য রোগীর ক্ষতি হয়, অথচ দু’জনের একই রোগ।

অষুধ আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করে

আব্বাজানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. হাশেমী ছাহেবের বয়স হয়েছিলো আশি বছর। তিনি বলতেন, আমার সারা জীবনের ডাক্তারির অভিজ্ঞতা এই যে, অষুধ গলা দিয়ে নামার সময় আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করে যে, হে আল্লাহ, আমি কি উপকার করবো, না ক্ষতি করবো? যেমন হুকুম হয় তেমন কাজ হয়।

যাই হোক, আব্বাজান বলতেন, এ ঘটনা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা একটি শিক্ষা তো এই দিলেন যে, মনে রেখো, তুমি যে আমল ও তদবীরের উপর ভরসা করে বসে আছো, তাতে আসলে কিছু নেই। কোন তাবীয-তদবীর ততক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর হবে না, যতক্ষণ না আমার হুকুম হবে। সুতরাং চিকিৎসার উপর যেন তোমার ভরসা ও বিশ্বাস না হয়। তদবীর ও চিকিৎসা হবে চেষ্টা হিসাবে, বাকি বিশ্বাস ও ভরসা হবে আমার যাত ও কুদরতের উপর।

অষুধের ভরসায় রোগ ডেকে এনো না

আব্বাজান বলতেন, এ ঘটনার দ্বিতীয় শিক্ষা এই যে, তোমার কাছে যত উন্নত চিকিৎসা এবং যত অব্যর্থ অষুধই থাকুক, অষুধ ও চিকিৎসার ভরসায় রোগ ডেকে এনো না, বরং সর্বপ্রকার রোগ-ব্যাধি থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চেয়ে দু‘আ করো যে, হে আল্লাহ! রোগ-শোক বরদাশত করার শক্তি আমার নেই। সুতরাং সমস্ত রোগ-শোক থেকে আপনি আমাদের   হিফাযত করুন।

যাই হোক বিচ্ছুর ঘটনাটি আব্বাজান (রহ) আসলে এই মযমূন বয়ান করার জন্য শোনাতেন যে, তাওবার দুয়ার খোলা আছে, এ ভরসায় গোনাহ করা অতিবড় দুঃসাহসের কাজ, যেমন অষুধ, চিকিৎসা ও তদবীরের ভরসায় রোগ ডেকে আনা এবং বিচ্ছু থেকে সতর্ক না থাকা অতি বড় নির্বুদ্ধিতার কাজ। আরে, কে জানে বিচ্ছুর দংশনের পর তাবীয-তদবীর ব্যবহার করার সুযোগ হবে কি না! গোনাহ করার পর তাওবা করার সুযোগ হবে কি না! তাবীয-তদবীরের সুযোগ হয়ও যদি, তা কার্যকর হবে কি না! তাওবা করার সুযোগ হয়ও যদি, তা কবুল হবে     কি না!

তাওবার ভরসা ও তাওবা থেকে মাহরূমি

বহু ঘটনা এমনও দেখা গেছে যে, মানুষ গোনাহের মধ্যে লিপ্ত অবস্থায় হঠাৎ মারা গেছে। নাচে গানে মগ্ন, শরাবের নেশায় মত্ত, এমন সময় হঠাৎ মওতের ফিরেশতা এসে বলে, চলো তোমার সময় শেষ! বেচারা তো ভেবেছিলো, রাতভর আনন্দ-উল্লাস করবো, তারপর সকালে তাওবা করে পাকছাফ হয়ে যাবো।

তো তুমি যে তাওবার ভরসায় গোনাহে লিপ্ত হতে চলেছো, কী নিশ্চিয়তা আছে যে, তাওবার সুযোগ তুমি পাবে। কে জানে মৃত্যুর ফিরেশতা তখন থাবা দেয়ার জন্য তৈয়ার হয়ে আছেন কি না!

ধরে নিলাম, গোনাহ করার পর তৎক্ষণাৎ মওত এলো না, বরং তাওবার সুযোগ পাওয়া গেলো, কিন্তু আমার ভাই! তারপরো কথা আছে। তাওবার ভরসায় যারা গোনাহ করে সাধারণত সারা জীবনেও তাদের তাওবার তাওফীক হয় না। তাওবার উপর ভরসা করার কারণে আল্লাহ তাকে তাওবার নেয়ামত থেকে মাহরূম করে দেন। ফলে দীর্ঘ সময় ও সুযোগ পাওয়ার পরো তাওবা ছাড়াই মরতে হয়। আসলে গোনাহের মধ্যে এমন নহূসত ও খাবাছাত এবং এমন অকল্যাণ ও অভিশাপ রয়েছে যে, মানুষের ভিতরে গাফলত ও উদাসীনতা এসে যায়। গোনাহের ঘোরে মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় এবং ধীরে ধীরে নফস ও শয়তানের খপ্পরে চলে যায়। গোনাহের মউজ-মস্তি ও নেশা- লয্‌যতে সে এমনই ডুবে যায় যে, তাওবা করার কথা ভুলেও মনে পড়ে না।

তাছাড়া আরেকটি বড় খারাবি এই যে, গোনাহ গোনাহকে টেনে আনে। মানুষ যতক্ষণ গোনাহ থেকে দূরে থাকে, তার মধ্যে একটা স্বাভাবিক লজ্জা ও স্বভাব সংকোচ বিদ্যমান থাকে। এই লজ্জা ও সংকোচ হলো তার ও গোনাহের মাঝখানে একটি শক্ত বাঁধ। তাওবার ভরসায় বান্দা একবার যখন গোনাহ করে ফেলে তখন লজ্জা ও সংকোচের সেই বাঁধ ভেঙ্গে যায় এবং গোনাহের ব্যাপারে সে নির্ভয় ও নির্লজ্জ হয়ে পড়ে। তখন নির্দ্বিধায় একটার পর একটা গোনাহ করতে থাকে। এভাবে গোনাহের এমন এক সিলসিলা       শুরু হয় যার কোন শেষ নাই। হতে হতে একসময় মানুষের রুচি ও স্বভাব বিগড়ে যায়। তখন যা খারাপ তার কাছে তা ভালো লাগে;               যা ভালো, তার কাছে তা খারাপ লাগে। নেক আমল তিতা লাগে,       বদআমল মিঠা লাগে। তো রুচি ও যাওক যখন নষ্ট হয়ে যায়, স্বভাব ও তবিয়ত যখন বিগড়ে যায় এবং দিল ও কলব যখন মুরদা হয়ে যায়, তখন আর কিসের লজ্জা, কিসের তাওবা! তখন তো সে বদআমল ও পাপাচারের ময়লা-আবর্জনা ও গান্দা পানিতে ডুবে যেতে থাকে। সুতরাং তাওবার     ভরসায় কখনোই কোন গোনাহ করো না, বরং যে কোন মূল্যে ছোট         বড় সমস্ত গোনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করো।               আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিফাযত করুন, আমীন।

মৃত্যু পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা আছে

আগের কথায় ফিরে আসি। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার সমস্ত চেষ্টার পরো যদি নফস ও শয়তানের ধোঁকায়     পড়ে তোমার পা পিছলে যায়, আর গোনাহ হয়ে যায় তখন কিন্তু     আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। এটা শয়তানের বড় চাল যে,       প্রথমে সে গোনাহ করায়, তারপর তাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে দেয় যে, তুমি এত বড় গোনাহ করেছো যে, তোমার তাওবা কবুল হওয়ার কোন আশা নেই। না, এটা শয়তানের ধোকা। আল্লাহ তো এত মেহেরবান যে, প্রত্যেক বান্দার জন্য তিনি তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন এবং মওতের গরগরা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা থাকবে। যখন ইচ্ছা তুমি ফিরে এসো এবং অনুতপ্ত মনে আল্লাহর কাছে তাওবা করো। রহমত ও মাগফিরাতের আয়াত ও হাদীছগুলো স্মরণ করো এবং তাওবার রজ্জু আকড়ে ধরো। গোনাহ তোমার যত বড় হোক আল্লাহ মাফ করে দেবেন। কাদের তাওবা কবুল হয় না, আল্লাহ তা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন্ত

و ليست التوبة للذين يعملون السيآت، حتى إذا حضر أحدهم الموت قال إني تبت الآن

তাওবা ঐ লোকদের জন্য নয় যারা বদআমল করতে থাকে, এমনকি যখন তাদের কারো কাছে মওত হাযির হয়ে যায় তখন বলে ওঠে, আমি এখন তাওবা করলাম।

যারা ‘তাওবা করে ফেলবো’ এ ভরসায় গোনাহ করে এবং করতে থাকে, আর যখন মওতের গরগরা শুরু হয়ে যায় তখন তাওবা করে তাদের তাওবা কবুল হয় না। এমন তাওবা তো ফেরআউন করেছিলো, নিলদরিয়ায় ডুবতে ডুবতে। তখন সে বলেছিলো-

آمنت أنه لا إله إلا الذي آمنت به بنو إسرآئيل، و أنا من المسلمين.

 

অর্থাৎ আমি ঐ সত্তার প্রতি ঈমান আনছি যার উপর বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে, আর আমি মুসলিম হয়ে গেলাম।

জবাবে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন্ত

آلئن و قد عصيت من قبل و كنت من المفسدين

ঈমান আনছো এখন, সময় পার হয়ে যাওয়ার পর! অথচ এর আগে তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের দলে!

এমন লোকদের তাওবা কবুল হয় না। তাওবা কবুল হয় তাদের, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন্ত

إنما التوبة على الذين يعملون السوء بجهالة ثم يتوبون من قريب فاولئك يتوب الله عليهم

অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ঐ লোকদের তাওবা কবুল করেন যারা ‘নাদানি’ করে গোনাহ করে ফেলে, কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরে আসে এবং তাওবা করে ফেলে। অর্থাৎ তাওবা করতে তারা দেরী করে না যে, সময় তো আছে,         তাওবার দরজা তো খোলা আছে এবং মওতের আগ পর্যন্ত খোলা থাকবে। পরে তাওবা করে নেবো।         এমন গোমরাহি চিন্তা তারা করে না, বরং গোনাহ হওয়া মাত্র           তাওবা করে ফেলে, তাদের তাওবা অবশ্যই আল্লাহ কবুল করেন।

তাওবা ভেঙ্গে গেলে আবার তাওবা করো

যারা তাওবা করে, কিন্তু বারবার   তাওবা ভেঙ্গে যায়, তারাও          যেন ভয় ও দুশ্চিন্তায় পড়ে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না             হয়ে যায় যে, আমাদের কী         উপায় হবে, আমাদের           তাওবা তো বারবার ভেঙ্গে যায়!

লজ্জিত হওয়া তো ভালো,       অনুতপ্ত তো হতেই হবে। লজ্জায়, অনুতাপে যদি কান্না আসে, চোখ থেকে অশ্রু ঝরে তাহলে তো আরো ভালো। কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে না, বরং যতবার তাওবা ভাঙ্গবে ততবার তাওবা করবে, তাওবা করতেই থাকবে। কথা শুধু এই যে,       তাওবার ভরসায় কেউ যেন গোনাহ করার দুঃসাহস না করে। হাতের     কাছে প্রতিষেধক আছে, এই       ভরসায় কেউ যেন বিষ পান না করে।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের       সবাইকে সমস্ত গোনাহ থেকে খাঁটি   মনে ও সাচ্চা দিলে তাওবা করার তাওফীক দান করুন, আমীন।

و آخـر دعوانـا أن الحمـد للـه رب العلمين

 

 

ভাষান্তর : আমাতুল্লাহ তাসনীম সাফফানা

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.